Sea Temperature Rising

বছরভরই চলবে তাপপ্রবাহ! বিশ্বের ১৯টি সমুদ্রে ‘চিরস্থায়ী’ বিপদ দেখছেন বিজ্ঞানীরা, ধ্বংস হতে পারে বাস্তুতন্ত্র

নতুন গবেষণায় দাবি, বিশ্বের অন্তত ১৯টি সমুদ্রে চিরস্থায়ী তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বছরের বেশিরভাগ সময় ধরেই সেই জলে তাপপ্রবাহ চলবে। কমবে না উষ্ণতা!

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২১ মে ২০২৬ ০৮:৫৮
সমুদ্রগুলিতে তাপের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেছেন বিজ্ঞানীরা।

সমুদ্রগুলিতে তাপের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। —ফাইল চিত্র।

পারিপার্শ্বিকের তাপমাত্রার সাপেক্ষে সমুদ্রের জল উষ্ণ হয়। তাপ বাড়তে বাড়তে তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি তৈরি হয় জলেও। তবে প্রকৃতির নিয়ম মেনেই নির্দিষ্ট সময়ের পর সেই সমুদ্র ফের শীতল হয়ে আসে। পৃথিবীর জলাশয়গুলির এই উষ্ণ-শীতল ধারায় এ বার বিপদ দেখছেন বিজ্ঞানীরা। নতুন গবেষণায় দাবি, বিশ্বের অন্তত ১৯টি সমুদ্রে চিরস্থায়ী তাপপ্রবাহের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। বছরের বেশিরভাগ সময় ধরেই সেই জলে তাপপ্রবাহ চলবে। কমবে না উষ্ণতা! তাপ হ্রাসের সুযোগই তৈরি হবে না!

Advertisement

ভূমধ্য সাগর, বাল্টিক সাগর, মেক্সিকো উপসাগর, লোহিত সাগরের মতো স্থলবেষ্টিত সমুদ্রগুলিতে তাপের পরিস্থিতি খতিয়ে দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। ‌স্থলভাগ দিয়ে ঘেরা লবণাক্ত জলের বিস্তীর্ণ অঞ্চল এই সমস্ত সমুদ্র। উন্মুক্ত মহাসাগরীয় অববাহিকাগুলির তুলনায় এরা ছোট ও অগভীর। ভৌগোলিক এই গঠন এবং অবস্থানের কারণেই সমুদ্রগুলিতে স্থায়ী তাপপ্রবাহের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা। সমুদ্রে তাপপ্রবাহ স্থায়ী হয়ে যাওয়ার অর্থ জলের স্রোতে তাপ আবদ্ধ হয়ে পড়া। অর্থাৎ, স্বাভাবিক নিয়মে সেখানে তাপপ্রবাহ হবে। কিন্তু তার পর জল ঠান্ডা হয়ে আবার আগের অবস্থায় ফেরার প্রক্রিয়াটি বন্ধ থাকবে। বিজ্ঞানীদের দাবি, কিছু কিছু সমুদ্রে বছরে ৩৩০ দিন পর্যন্ত তাপপ্রবাহ চলতে পারে। এটি কোনও অস্থায়ী চরম অবস্থা নয়, বরং আবহাওয়ার নতুন স্থায়ী পরিস্থিতি!

জার্মানির লাইবনিজ় ইনস্টিটিউট ফর বাল্টিক সি রিসার্চ ওয়ারনেমুন্ডে-র সমুদ্রবিশেষজ্ঞ ম্যাথিয়াস গ্রোগারের নেতৃত্বে সমুদ্রের জলের উষ্ণতা নিয়ে গবেষণা করেছেন এক দল বিজ্ঞানী। বিশ্বের নানা প্রান্তে ১৯টি আবদ্ধ সমুদ্রে জলবায়ু মডেল প্রকল্প চালিয়েছেন তাঁরা। তাঁদের গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ‘কমিউনিকেশন্‌স আর্থ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট’ পত্রিকায়। গবেষকদের দাবি, ভূখণ্ড দ্বারা বেষ্টিত হওয়ার কারণে তাপ এই সমস্ত সমুদ্রে আবদ্ধ হয়ে পড়়ছে। প্রশান্ত বা অতলান্তিক মহাসাগরের মতো বিশাল জলরাশিতে যে তাপ ছড়িয়ে পড়ার কথা, তা সঙ্কীর্ণ জলভাগে আটকে পড়ায় তাপপ্রবাহ স্থায়ী হতে শুরু করেছে। এই তাপ বেরোনোর কোনও পথ পাচ্ছে না। সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ প্রকৃতিগত ভাবেই স্বল্পস্থায়ী হয়। ৯০ শতাংশ ক্ষেত্রে টানা পাঁচ দিনের বেশি তাপপ্রবাহ থাকে না সমুদ্রে। স্থায়ী তাপের সম্ভাবনায় তাই বিপদের আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের দাবি, সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র এর ফলে ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।

সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধির বড় কারণ বিশ্ব উষ্ণায়ন। চারদিকে শিল্পের প্রসার, কলকারাখানার শ্রীবৃদ্ধি বাতাসের সঙ্গে সঙ্গে দূষিত করে চলেছে জলকেও। প্রচুর পরিমাণে দূষিত জলকণা (এরোসল) কারখানা থেকে বাতাসে মিশছে। বিজ্ঞানীদের দাবি, ২০০০ সালের আশপাশে কলকারখানার এই সমস্ত দূষণের কারণে আবদ্ধ সমুদ্রের জল উন্মুক্ত মহাসাগরের চেয়ে দ্রুত গতিতে উষ্ণ হতে শুরু করেছিল।

বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র এবং জ্বালানি তেল থেকে নির্গত সালফেটের দূষণ সূর্যালোককে মহাকাশে প্রতিফলিত করে পৃথিবীর সমুদ্রগুলিকে ছায়াচ্ছন্ন করে রেখেছিল কয়েক দশক ধরে। অনেক পরে মানুষের উদ্যোগে বায়ুমণ্ডল কিছুটা দূষণমুক্ত হয়। দূষণের ছায়া সরে যাওয়ার পরপরই সমুদ্রগুলি উষ্ণ হতে শুরু করেছিল। আবদ্ধ সমুদ্রে এই তাপের প্রভাব ছিল অনেক বেশি।

বিজ্ঞানীদের দাবি, বর্তমানে পৃথিবীতে যে হারে দূষণ হচ্ছে, তার পরিমাণ যদি আর না-ও বাড়ে, তা হলেও ২১০০ সালের আগে বিশ্বের ১৯টি সমুদ্রের মধ্যে অন্তত ১৫টি প্রায় স্থায়ী তাপপ্রবাহের কবলে পড়তে পারে। পরিসংখ্যান তুলে ধরে দেখানো হয়েছে, লোহিত সাগর, তাইল্যান্ড উপসাগরের মতো জলভাগে উষ্ণায়নের প্রবণতা আগামী ৩০ বছরের পূর্বাভাসের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ বেশি। এমনটা চলতে থাকলে চলতি শতকের শেষে এই ধরনের সমুদ্রগুলির তাপমাত্রা অনেকটা বেড়ে যেতে পারে। তার ফলে সামুদ্রিক অঞ্চলের জীববৈচিত্র্য ৭০ শতাংশ বিপন্ন হতে পারে।

প্যারিসে বিভিন্ন দেশের মধ্যে বিশ্ব উষ্ণায়নের মোকাবিলা সংক্রান্ত একটি চুক্তি হয়েছিল। সেখানে মানবজাতির জন্য জলবায়ুর কিছু লক্ষ্যমাত্রা স্থির করে দেওয়া হয়েছিল। প্যারিস চুক্তিতে বলা হয়েছিল, শিল্পবিপ্লবের পূর্ববর্তী অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে বিশ্বের উষ্ণতাকে। তার জন্য যা যা প্রয়োজন, করতে সম্মত হয়েছিল চুক্তি স্বাক্ষরকারী দেশগুলি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, মানুষ যদি এই চুক্তির শর্তগুলি পূরণ করে লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছেও যায়, তার পরেও পূর্ব ভূমধ্যসাগর, হা়ডসন উপসাগর তাপপ্রবাহের সীমা অতিক্রম করবে। তবে আলোচনাধীন বাকি সমুদ্রগুলি অবশ্য সে ক্ষেত্রে আর তাপপ্রবাহের কবলে পড়বে না।

গবেষকদের পর্যবেক্ষণ, ১৯টি সমুদ্রের মধ্যে ১৩টির তাপমাত্রা এখনও শিল্পবিপ্লব পূর্ববর্তী সময়ের চেয়ে ১.৮ ডিগ্রি ফারেনহাইটেরও বেশি বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ এই সমস্ত সমুদ্রের মোট ৬০ শতাংশ এলাকা বছরের বেশিরভাগ সময় তাপপ্রবাহের কবলে থাকবে। সবচেয়ে বিপজ্জনক অবস্থানে রয়েছে হাডসন উপসাগর, রাশিয়া ও নরওয়ের সীমান্তে অবস্থিত ব্যারেন্টস সমুদ্র, কারা সমুদ্র এবং সাইবেরিয়ার সীমান্তে ল্যাপটেভ সমুদ্র। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, বিশ্বের গড় বৃদ্ধির তুলনায় আর্কটিক অঞ্চলের উষ্ণতা চার গুণ বেশি দ্রুত বাড়ছে। জলেও তার প্রভাব পড়ছে। সেই তুলনায় ক্রান্তীয় অঞ্চলের সমুদ্রগুলি খাতায়কলমে ভাল জায়গায় রয়েছে। কারণ, সেখানে তাপমাত্রা বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম। সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র রক্ষার জন্য অবিলম্বে এই পরিস্থিতির মোকাবিলার উপায় সন্ধান প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

Advertisement
আরও পড়ুন