Severe Heatwave in Earth

তাপপ্রবাহ ও খরার জোড়া আঘাত পাঁচ গুণ বাড়বে এই শতকের শেষেই! বিশ্বের কোন অংশে সবচেয়ে বেশি বিপদসঙ্কেত

২০৯০-এর দশকে তাপপ্রবাহ এবং খরার সম্মিলিত আঘাত পাঁচ গুণ বেড়ে যেতে পারে। বিশ্বের একটি বড় অংশে আবহাওয়ার সেই চরম পরিস্থিতি প্রবল খরা ডেকে আনবে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৪ এপ্রিল ২০২৬ ০৮:৫৮
তাপমাত্রা বাড়ছে, আরও উষ্ণ হচ্ছে ধরিত্রী।

তাপমাত্রা বাড়ছে, আরও উষ্ণ হচ্ছে ধরিত্রী। ছবি: শাটারস্টক।

যত দিন যাচ্ছে, উষ্ণ হচ্ছে পৃথিবী। দাবদাহের দাপট বাড়ছে। বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ে নানা গবেষণা, পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন বিজ্ঞানীরা। ভবিষ্যতের শঙ্কার আগাম আভাস পাওয়ার তাগিদ যেমন রয়েছে, তেমনই বিপদ থেকে মুক্তির উপায়েরও খোঁজ চলছে। এই সংক্রান্ত একটি গবেষণায় সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে পৃথিবীর বুকে তাপপ্রবাহ এবং খরার জোড়া আঘাত পাঁচ গুণ বেড়ে যেতে পারে। চলতি শতকের শেষ দিকে তার ফলে প্রভাবিত হবেন সারা বিশ্বের প্রায় ৩০ শতাংশ মানুষ!

Advertisement

জার্মানি এবং চিনের বিজ্ঞানীদের এই গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে জিয়োফিজ়িক্যাল রিসার্চ লেটার্‌স-এ। তাঁদের দাবি, ২০৯০-এর দশকে তাপপ্রবাহ এবং খরার সম্মিলিত আঘাত পাঁচ গুণ বেড়ে যেতে পারে। বিশ্বের একটি বড় অংশে আবহাওয়ার সেই চরম পরিস্থিতি প্রবল খরা ডেকে আনবে। একই সময়ে, একই জায়গায় খরার সঙ্গে চলবে তাপপ্রবাহ। পানীয় জলের আকালে হাহাকার পড়ে যাবে সর্বত্র। বহু মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কাও রয়েছে ওই পর্যায়ে। এই পরিস্থিতির মোকাবিলার জন্য এখন থেকে পরিবেশ বিজ্ঞানের নানা মহলে সক্রিয় উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।

গবেষণালব্ধ তথ্য এবং বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দূষিত ধোঁয়ার (কলকারখানা, গাড়ি কিংবা অন্যান্য জ্বালানির দহন) পরিসংখ্যান বলছে, তাপপ্রবাহ এবং খরার চরম পরিস্থিতি বিশ্বের ২৬০ থেকে ৩০০ কোটি মানুষকে প্রভাবিত করতে পারে। সাধারণ খরা কিংবা সাধারণ তাপপ্রবাহে যে ক্ষতি হয়, চরম পরিস্থিতিতে সেই ক্ষতির পরিমাণও দ্বিগুণ বেড়ে যাবে। শুধু গরমে মৃত্যু নয়, বাড়বে দাবানলের সম্ভাবনা। কৃষিজাত ফসলের বিপুল ক্ষতি হতে পারে। সঙ্গে সামাজিক এবং অর্থনৈতিক স্তরে একটি চূড়ান্ত অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি হবে বলে গবেষকদের আশঙ্কা। এ প্রসঙ্গে চিনের ওশান বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিদ ডি কাই বলেছেন, ‘‘তাপ এবং খরা একে অপরের প্রভাবকে বাড়িয়ে তোলে। চরম উষ্ণ ও শুষ্ক আবহাওয়ার ফলে জলের সঙ্কট অবধারিত। তা ছাড়া, খাদ্যপণ্যের দামও হু-হু করে বেড়ে যাবে পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে। শ্রমিকশ্রেণির মানুষজন, যাঁরা মূলত বাড়ির বাইরে বেরিয়ে কাজ করেন, তাঁদের পক্ষে এই পরিস্থিতি বিপজ্জনক।’’

আটটি ভিন্ন মডেলের উপর ভিত্তি করে তৈরি ১৫২টি কৃত্রিম জলবায়ু পরিস্থিতির তথ্য একত্রিত করেছেন গবেষকেরা। জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের পূর্বাভাসের জন্য এগুলি ব্যবহার করা হয়েছিল আন্তঃসরকারি জলবায়ু পরিবর্তন প্যানেলের (আইপিসিসি) মূল্যায়নে। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকদের দাবি, বর্তমানে বিভিন্ন দেশে সরকার যে নীতি গ্রহণ করেছে, তাতে ২১০০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বের তাপমাত্রা সার্বিক ভাবে ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়তে চলেছে। তাপপ্রবাহ এবং খরার চরম পরিস্থিতি বর্তমানে যতটা স্থায়ী হয়, আগামী দিনে তার চেয়ে তিন গুণ বেশি সময় পর্যন্ত স্থায়ী হবে বলেও দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা।

এখন প্রশ্ন, কোথায় এই চরম উষ্ণতার প্রভাব বেশি পড়বে? বিজ্ঞানীদের ধারণা, অঞ্চলভেদে তাপবৃদ্ধির প্রভাবে কোনও ভারসাম্য থাকবে না। কোথাও প্রভাব হবে মারাত্মক, কোথাও সামান্য। মূলত ক্রান্তীয় অঞ্চল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বেশি বিপদের আশঙ্কা রয়েছে সেখানেই। কৌতূহলের বিষয় হল, যে সমস্ত দেশ বিশ্ব উষ্ণায়নে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে কম অবদান রেখেছে, সেই স্বল্প আয়ের তুলনামূলক দরিদ্র দেশগুলিই দাবদাহের চরম ভুক্তভোগী হতে চলেছে বলে বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা। প্রাণহানির সংখ্যাও এই দেশগুলিতেই বেশি হবে। কাই বলেছেন, ‘‘স্বল্প আয়ের দেশগুলির উপর চরম অবিচার হতে চলেছে। সেখানে বাতানুকূল যন্ত্রের ব্যবস্থা করা কঠিন। স্বাস্থ্যক্ষেত্রে খরচ, উন্নত চিকিৎসাও অমিল। যদি জল ফুরিয়ে যায়, তার কোনও বিকল্প ব্যবস্থা এই দেশগুলিতে নেই। ফলে শুধু পরিবেশই প্রভাবিত হবে না, এই দেশগুলিতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন ছারখার হয়ে যেতে পারে।’’

গবেষণা বলছে, মনুষ্যসৃষ্ট গ্রিনহাউস গ্যাসগুলিই শতাব্দীর শেষের এই চরম পরিস্থিতির জন্য অনেকাংশে দায়ী থাকবে। তারাই পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমশ বাড়িয়ে চলেছে। তবে এখন থেকে পরিকল্পিত কিছু পদক্ষেপ করলে আগামী দিনে ব্যাপক ক্ষতি কিছুটা হলেও এড়ানো যেতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, শুধু ধোঁয়া নির্গমন নীতিতে সামান্য পরিবর্তনই অনেক প্রাণ বাঁচাতে পারে। গবেষকেরা জানিয়েছেন, ২০১৫ সালে প্যারিস সমঝোতায় পরিবেশ সংক্রান্ত যে শপথ গ্রহণ করা হয়েছিল, সেগুলির বাস্তবায়ন প্রয়োজন। যদি সেগুলি সম্পূর্ণ বাস্তবায়িত হয়, তাপপ্রবাহ এবং খরার সেই চরম আঘাতের হাত থেকে বাঁচতে পারেন অন্তত ১০ শতাংশ মানুষ। বর্তমানের পূর্বাভাস বলছে, সারা বিশ্বের ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ মানুষ শতাব্দীর শেষে ওই চরম পরিস্থিতির শিকার হবেন। কিন্তু প্যারিস সমঝোতার শপথ বাস্তবায়িত হলে প্রভাবিত মানুষের পরিমাণ ১৮ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এর অর্থ, অন্তত ৯০ কোটি মানুষ বিপদের গ্রাস থেকে বাঁচতে পারবেন। পৃথিবীর সকল দেশের নাগরিক এবং সরকারের কাছে পরিবেশ বাঁচাতে সচেতন উদ্যোগের আহ্বান জানিয়েছেন গবেষকেরা।

Advertisement
আরও পড়ুন