গ্রাফিক: এআই সহায়তায় প্রণীত।
পৃথিবীর ‘ইতিহাসে’ সবচেয়ে বড় স্থলচর প্রাণী ছিল ওরা। সেই লম্বা গলার ডাইনোসরদের ঘিরেই আবর্তিত হত জুরাসিক যুগের খাদ্যশৃঙ্খল। ওদের খেয়েই বেঁচে থাকত সমসাময়িক শিকারি ডাইনোসরদের বেশ কিছু প্রজাতি। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এমনটাই আভাস মিলেছে।
আজ থেকে প্রায় ২০ কোটি বছর আগের কথা। আনুমানিক ওই সময় থেকেই পৃথিবীতে শুরু হয় জুরাসিক যুগ। চলে প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি বছর আগে পর্যন্ত। তখন পৃথিবী জুড়ে ঘুরে বেড়াত বিভিন্ন প্রজাতির ডাইনোসর। কেউ শিকার, কেউ বা শিকারি। ছিল বিভিন্ন গোত্রের ডাইনোসর। যেমন ছিল পিছনের দু’পায়ে ভর দিয়ে চলা থেরোপড গোত্রের ডাইনোসরেরা, তেমনই ছিল চারপেয়ে সরোপডেরাও।
থেরোপডেরা ছিল হিংস্র শিকারি, যাদের মধ্যে অন্যতম টির্যাইনোসরাস-রেক্স বা টি-রেক্স। নিজেদের সময়ের সবচেয়ে হিংস্র এক শিকারি প্রজাতি। অন্য দিকে সরোপডেরা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের। এরা ছিল তৃণভোজী। এই গোত্রের সকল ডাইনোসরেরাই ছিল বিশাল চেহারার। লম্বা গলা। লেজও লম্বা। মাথা এবং পা তুলনায় অনেক ছোট। তৃণভোজী এই ডাইনোসরদের মধ্যে অ্যাপাটোসরাস, ব্র্যাকিওসরাস, ডিপ্লোডোকাস, টাইটানোসরাস বা আর্জেন্টিনোসরাসের মতো বিভিন্ন প্রজাতি ছিল।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, জুরাসিক যুগের শেষ পর্বে খাদ্য-খাদক শৃঙ্খলে সরোপড শাবকেরাই ছিল হিংস্র ডাইনোসরদের প্রধান শিকার। শিকারি ডাইনোসরদের টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল শাবক এবং অপ্রাপ্তবয়স্ক সরোপডেরা। যে ডাইনোসরেরা ব়ড় হয়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্থলচর প্রাণী হয়ে উঠত, সেই ডাইনোসরদেরই শৈশব ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যে কোনও মুহূর্তে কোনও হিংস্র শিকারির পেটে চালান হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকত।
ব্রিটেনের ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের আর্থ সায়েন্সের বিভাগের জীবাশ্মবিদ ক্যাসিয়াস মরিসন এবং তাঁর সঙ্গীরা ডাইনোসরদের উপরে এই গবেষণাটি করেন। তাঁরা এই গবেষণার জন্য বেছে নেন আমেরিকার কলোরাডো অঞ্চল। এই এলাকা থেকে অতীতে বিভিন্ন ডাইনোসরের জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছে। এখান থেকে খুঁজে পাওয়া বিভিন্ন প্রজাতির জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে দেখেন গবেষকেরা। জীবাশ্মগুলি প্রায় ১৫ কোটি বছরের পুরানো, যা ছিল জুরাসিক যুগের একেবারে শেষের দিকের অধ্যায়। সম্প্রতি নিউ মেক্সিকো মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি অ্যান্ড সায়েন্স-এর বুলেটিনে গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।
গবেষণার মূল উদ্দেশ্য ছিল ওই সময়ের খাদ্য-খাদক শৃঙ্খল কেমন ছিল, তা বোঝা। গাছপালা, তৃণভোজী এবং মাংসাশী ডাইনোসরদের মধ্যে কেমন শৃঙ্খল ছিল, তা বিশ্লেষণ করার উদ্দেশ্যে গবেষণা শুরু করেন মরিসন এবং তাঁর সঙ্গীরা। মরিসনের কথায়, “ডিপ্লোডোকাস এবং ব্র্যাকিওসরাসের মতো প্রাপ্তবয়স্ক সরোপডেরা নীল তিমির চেয়েও লম্বা ছিল। যখন তারা হাঁটত, তখন মাটি কেঁপে উঠত। কিন্তু ওদের ডিমগুলির ব্যাস ছিল মাত্র এক ফুট (১২ ইঞ্চি)। ডিম ফোটার পরে এই সরোপডের শাবকদের বড় হতে অনেক বছর সময় লেগে যেত।”
গবেষকদলের প্রধান মরিসনের মতে, বিশালাকার সরোপডদের পক্ষে এই ছোট ডিমগুলির যত্ন নেওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়ত। তাই ডিমের প্রতি খুব বেশি খেয়াল রাখত না সরোপডেরা। ফলে এই শাবকেরা একপ্রকার অবহেলাতেই বড় হত। তিনি বলেন, “এটি এমন একটি বাস্তুতন্ত্র ছিল, যেখানে জীবনের কোনও দামই ছিল না। অ্যালোসরাসের মতো শিকারি ডাইনোসরেরা সম্ভবত এই শাবকদের খেয়েই বেঁচে থাকত।”
কলোরাডোর এই অঞ্চল থেকে অতীতে ছয় ধরনের ভিন্ন ভিন্ন সরোপড প্রজাতির জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছে। ফলে, কে কাকে শিকার করত, তা বোঝার জন্য গবেষকেরা এখানে একসঙ্গে অনেকগুলি উদাহরণ পেয়েছেন। জীবাশ্মগুলির আকার, দাঁতের ক্ষয়ের ধরণ বা জীবাশ্মের মধ্যে পাওয়া আইসোটোপ বিশ্লেষণ করে দেখেন তাঁরা। জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া পাকস্থলীর তথ্যও বিশ্লেষণ করে দেখা হয়। তাতে দেখা যায়, জুরাসিক যুগের ওই শেষ পর্বে বাস্তুতন্ত্রের একেবারে মাঝখানে ছিল সরোপডেরা। গাছপালা থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করত সরোপড। সরোপডদের খেয়ে পুষ্টি সংগ্রহ করত শিকারি ডাইনোসরেরা।
ওই সময়ে সরোপডের পাশাপাশি আরও অনেক তৃণভোজী গোত্রের ডাইনোসর ছিল। যেমন অর্নিথিস্কিয়ান। এই গোত্রের অন্যতম হল পিঠে মোটা চামড়ার কাঁটা কাঁটা বর্মযুক্ত স্টেগোসরাস। এই প্রজাতি-সহ সকল অর্নিথিস্কিয়ানই সরোপডদের চেয়ে আকারে অনেক ছোট। ফলে এদেরও শিকারিদের পেটে চালান হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকত। কিন্তু জীবাশ্ম গবেষণায় উঠে এসেছে, এদের চেয়ে সরোপড শাবকেরাই বেশি শিকার হত। খাদ্যশৃঙ্খলে উদ্ভিদ এবং শিকারি ডাইনোসরদের মাঝে সবচেয়ে বেশি যোগসূত্র তৈরি করত এই সরোপডেরাই।