WOH G64 Star

৩৩৭ কোটি সূর্যের সমান আয়তন! মৃত্যুমুখে ব্রহ্মাণ্ডের বৃহত্তম নক্ষত্রগুলির একটি, বিস্ময়ে দেখছেন বিজ্ঞানীরা

গ্রিসের এথেন্স শহরের ল্যাবরেটরিতে বসে এক দল বিজ্ঞানী গবেষণা করেছেন ডব্লিউওএইচ জি৬৪ নিয়ে। এটি এখনও পর্যন্ত ব্রহ্মাণ্ডে আবিষ্কৃত বৃহত্তম নক্ষত্রগুলির মধ্যে অন্যতম।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৫
Massive star is set to explode in space

ধ্বংসের পথে ব্রহ্মাণ্ডের অন্যতম বৃহৎ নক্ষত্র ডব্লিউওএইচ জি৬৪। ছবি: সংগৃহীত।

ব্রহ্মাণ্ডের যত নক্ষত্র এখনও পর্যন্ত পৃথিবীতে বসে আবিষ্কার করতে পেরেছেন বিজ্ঞানীরা, তার মধ্যে অন্যতম বৃহৎ নক্ষত্রটি ধ্বংসের মুখোমুখি। আমাদের পৃথিবী যে ছায়াপথে রয়েছে, সেই আকাশগঙ্গার চারপাশে ঘুরছে ছোট্ট আর একটি ছায়াপথ, নাম লার্জ ম্যাজেলান্টিক ক্লাউড। এই ছায়াপথেই রয়েছে ডব্লিউওএইচ জি৬৪, যা এখনও পর্যন্ত আবিষ্কৃত বৃহত্তম নক্ষত্রদের মধ্যে অন্যতম। ১৯৭০-এর দশকে প্রথম এই নক্ষত্রের হদিস পান বিজ্ঞানীরা। সম্প্রতি একাধিক পর্যবেক্ষণে এই নক্ষত্রের ধ্বংসের ইঙ্গিত মিলেছে। মনে করা হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতেই মহাকাশে তীব্র বিস্ফোরণের মাধ্যমে ‘মৃত্যু’ হবে ডব্লিউওএইচ জি৬৪-এর। আপাতত চলছে সেই ধ্বংসের প্রস্তুতি!

Advertisement

গ্রিসের এথেন্স শহরের ল্যাবরেটরিতে বসে গন্‌জ়ালো মুনিয়োস-সাঞ্চেসের নেতৃত্বাধীন বিজ্ঞানীদল ডব্লিউওএইচ জি৬৪-কে নিয়ে গবেষণা করেছেন। তাঁরা ‘নেচার অ্যাস্ট্রোনমি’ পত্রিকায় নিজেদের মতামত প্রকাশ করেছেন। সেখানেই বলা হয়েছে, অতীতে লাল রঙের ‘সুপারজায়েন্ট’ ছিল এই নক্ষত্র। ক্রমে তা হলুদ রঙের ‘হাইপারজায়েন্ট’-এ পরিণত হয়েছে। এটি নক্ষত্রের মৃত্যু-বিস্ফোরণের (সুপারনোভা) প্রস্তুতির অন্যতম বড় প্রমাণ। এখনও পর্যন্ত যে তথ্য মিলেছে, তাতে গবেষকেরা একপ্রকার নিশ্চিত যে, আগামী দিনে প্রকাণ্ড এই নক্ষত্রের সঙ্কোচন এবং সুপারনোভার সাক্ষী থাকতে চলেছে পৃথিবী।

আবিষ্কারের পর থেকেই বিজ্ঞানীদের নজরে ছিল ডব্লিউওএইচ জি৬৪। প্রথম থেকেই এটি ‘অস্বাভাবিক’ রকম উজ্জ্বল। ফলে আলাদা করে তা নজরও কে়ড়েছিল। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, আমাদের সূর্যের ব্যাসার্ধের চেয়ে এই নক্ষত্রের ব্যাসার্ধ ১৫০০ গুণ বেশি। সেই হিসাবে তার আয়তন ৩৩৭ কোটি সূর্যের সমান! আমাদের সৌরজগতের মাঝে বসালে এই নক্ষত্র সৌরজগতের বৃহত্তম গ্রহ বৃহস্পতির সমগ্র কক্ষপথটিতে গিলে নিতে পারে।

২০২৪ সালে ডব্লিউওএইচ জি৬৪-এর প্রথম স্পষ্ট ছবি তোলা হয় উত্তর চিলিতে অবস্থিত ‘ভেরি লার্জ টেলিস্কোপ ইন্টারফেরোমিটার’ দিয়ে। আমাদের ছায়াপথের বাইরের কোনও নক্ষত্রের সেটাই প্রথম ছবি। দেখা গিয়েছিল, নক্ষত্রটির একেবারে কেন্দ্রে রেশমের গুটির মতো ধুলোময় একটি অংশ রয়েছে। বিজ্ঞানীদের একাংশ জানিয়েছিলেন, ডব্লিউওএইচ জি৬৪ যে ভর হারাচ্ছে, তার এর চেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ আর হতে পারে না। জল্পনায় সিলমোহর দিয়ে দিয়েছিল ওই নিখুঁত ছবি।

বিজ্ঞানীরা জানতে পেরেছেন, ডব্লিউওএইচ জি৬৪-এর মধ্যে বড়সড় পরিবর্তন ঘটে যায় ২০১৪ সালে। তখনই ‘সুপারজায়েন্ট’ থেকে ‘হাইপারজায়েন্ট’-এ তার উত্থান। নক্ষত্রটির বয়স বেশি নয়। আমাদের সূর্যের বর্তমান বয়স প্রায় ৪৬০ কোটি বছর। ডব্লিউওএইচ জি৬৪-এর বয়স ৫০ লক্ষ বছরেরও কম! তবে সূর্য এবং ডব্লিউওএইচ জি৬৪-এর ধাত আলাদা। ডব্লিউওএইচ জি৬৪-এর আয়ু কম। এই ধরনের নক্ষত্র ‘যৌবনেই’ মৃত্যুবরণ করে থাকে। এ ক্ষেত্রেও তা-ই হচ্ছে।

মহাশূন্যে গ্যাস এবং ধুলোর বিস্ফোরণে ‘প্রকাণ্ড’ আকার নিয়েই জন্মেছিল ডব্লিউওএইচ জি৬৪। প্রথম দিকে তা আমাদের সূর্যের মতো পারমাণবিক সংমিশ্রণে নিজের কেন্দ্রে হাইড্রোজ়েন পোড়াত। পরে এটি আরও প্রশস্ত হয় এবং হাইড্রোজ়েনের পরিবর্তে হিলিয়াম পোড়াতে শুরু করে। পরিণত হয় লাল ‘সুপারজায়েন্ট’-এ। সব ‘সুপারজায়েন্ট’ কিন্তু ‘হাইপারজায়েন্ট’ হয় না। বিজ্ঞানীদের ধারণা, খুব বড় নক্ষত্র দ্রুত পুড়ে গেলে এবং তার মধ্যেকার হাইড্রোজ়েন জ্বলন্ত অবস্থা থেকে হিলিয়ামে বিবর্তিত হলে তৈরি হয় ‘হাইপারজায়েন্ট’। এই বিবর্তনের সময় নক্ষত্র তার বাইরের দিকের স্তরগুলি হারিয়ে ফেলে। সঙ্কুচিত হতে শুরু করে নক্ষত্রের কেন্দ্রস্থল। এক বার কোনও নক্ষত্র ‘হাইপারজায়েন্ট’ হয়ে গেলে তা দ্রুত ‘সুপারনোভা’র দিকে এগিয়ে যায়। প্রকাণ্ড বিস্ফোরণে কোনও নক্ষত্র ফেটে চৌচির হয়ে গেলে তাকেই বলে ‘সুপারনোভা’।

ডব্লিউওএইচ জি৬৪-এর সঙ্গে ২০১৪ সালে ঠিক কী হয়েছিল? নতুন গবেষণা বলছে, মূল নক্ষত্রের পৃষ্ঠ থেকে বড় একটি অংশ ওই সময় খসে পড়ে গিয়েছিল। আশপাশের অন্য কোনও নক্ষত্রের সঙ্গে সংযোগের ফলে তা হয়ে থাকতে পারে। ডব্লিউওএইচ জি৬৪-এর পাশে অন্য নক্ষত্র যে রয়েছে, তা আগেই বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত করেছেন।

বিজ্ঞানীরা নিশ্চিত, মৃত্যুর দিকে এগিয়ে চলেছে ডব্লিউওএইচ জি৬৪। তবে তা কোন সময়ে হবে, আর কত দিন লাগবে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। একাংশের মতে, এখন ডব্লিউওএইচ জি৬৪-এর সুপারনোভা পূর্ববর্তী ‘সুপারউইন্ড’ পর্ব চলছে। নক্ষত্রের মূল অংশের জ্বালানি দ্রুত ক্ষয়ে যাওয়ায় তীব্র অভ্যন্তরীণ স্পন্দনের কারণে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকে। আমাদের জীবৎকালে এই নক্ষত্রকে ধ্বংস হতে দেখা যাবে কি না, তা-ও স্পষ্ট করে বলতে পারছেন না কেউ। ব্রহ্মাণ্ডের নক্ষত্রগুলির কোনওটি লক্ষ লক্ষ বছর, কোনওটি কোটি কোটি বছর বেঁচে থাকে। প্রযুক্তির আশীর্বাদ নক্ষত্রের ধ্বংসের এত খুঁটিনাটি আমাদের জানার সুযোগ দিয়েছে। এখন আকাশগঙ্গার দ্বারপ্রান্তে প্রকাণ্ড তারার ‘মৃত্যু’ দেখার অপেক্ষায় বিজ্ঞানীরা। চোখ রয়েছে টেলিস্কোপে।

Advertisement
আরও পড়ুন