Y Chromosome in Male Body

বয়স হলে ওয়াই ক্রোমোজ়োম কমে পুরুষের দেহকোষে! নতুন গবেষণা বলছে, তার ফলে বাসা বাঁধে রোগও

পিতার কাছ থেকে পাওয়া ওয়াই ক্রোমোজ়োম পুরুষের লিঙ্গনির্ধারক। তবে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পুরুষের দেহকোষ থেকে এই ক্রোমোজ়োম উধাও হয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৯
বয়স হলে পুুরুষের শরীরে ওয়াই ক্রোমোজ়োম কমে যায়।

বয়স হলে পুুরুষের শরীরে ওয়াই ক্রোমোজ়োম কমে যায়। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

পিতার থেকে পাওয়া ওয়াই ক্রোমোজ়োম বিলুপ্তির পথে, সেই আঁচ আগেই পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। পুরুষদের দেহকোষ থেকে একটা সময়ের পর ওয়াই ক্রোমোজ়োম গায়েব হয়ে যায়, তা-ও অজানা নয়। কিন্তু এত দিন বিজ্ঞানীরা মনে করতেন, ওয়াই ক্রোমোজ়োমের অনুপস্থিতিতে কিছু যায়-আসে না। তা আদৌ পুরুষ-শরীরে তেমন কোনও প্রভাব ফেলতে পারে না। নতুন গবেষণায় সেই ধারণা ধাক্কা খেল। বিজ্ঞানীদের একাংশ বলছেন, ওয়াই ক্রোমোজ়োমের অনুপস্থিতির সঙ্গে জুড়ে আছে পুরুষের একাধিক রোগব্যাধির শিকড়!

Advertisement

পিতার কাছ থেকে পাওয়া ওয়াই ক্রোমোজ়োম পুরুষের লিঙ্গনির্ধারক। তবে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে পুরুষের দেহকোষ থেকে এই ক্রোমোজ়োম উধাও হয়ে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হয়। পরিসংখ্যান বলছে, ৬০ বছর বয়সি ৪০ শতাংশ পুরুষের দেহে ওয়াই ক্রোমোজ়োম অনুপস্থিত। আবার, ৯০ বছর বয়সি বৃদ্ধদের মধ্যে এই হার ৫৭ শতাংশ। ধূমপান, বিভিন্ন রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকা বিষয়টিকে আরও বেশি প্রভাবিত করে, মত একাংশের।

বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, দেহের কিছু কিছু কোষ থেকে ওয়াই ক্রোমোজ়োম বিলুপ্ত হয়। সব কোষ থেকে নয়। যে কোষ থেকে এক বার ওয়াই ক্রোমোজ়োম বিদায় নেয়, সেখানে আর তা ফেরে না। এর ফলে শরীরে ওয়াই ক্রোমোজ়োম-সহ কোষ এবং ওয়াই ক্রোমোজ়োমবিহীন কোষের সংমিশ্রণ তৈরি হয়। ওয়াই-বিহীন কোষগুলির বৃদ্ধির হার অন্যান্য কোষের চেয়ে বেশি। ফলে শারীরিক বৃদ্ধির ক্ষেত্রে তারা বাড়তি সুবিধা পায়।

মানবদেহের অন্যান্য ক্রোমোজ়োমে যেখানে হাজার হাজার প্রোটিন-কোডিং জিন থাকে, সেখানে ওয়াই ক্রোমোজ়োমে থাকে মাত্র ৫১টি। এত দিন মনে করা হত, এগুলি কেবল লিঙ্গ নির্ধারণ এবং শুক্রাণুর কার্যকারিতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, ওয়াই ক্রোমোজ়োমই মানবদেহের একমাত্র ক্রোমোজ়োম, যা না মরে কোষ থেকে স্রেফ হারিয়ে যেতে পারে। ফলে আরও স্পষ্ট হয়েছিল, দৈহিক বৃদ্ধি এবং কোষের কার্যকারিতায় এই ক্রোমোজ়োমের কোনও ভূমিকা নেই। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ সঠিক নয়। বিজ্ঞানীদের একাংশ নতুন গবেষণায় শরীরের উপর ওয়াই ক্রোমোজ়োমের বাড়তি প্রভাব চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছেন। তাঁদের দাবি, আপাত ভাবে শরীরে ওয়াই ক্রোমোজ়োমের তেমন কোনও কাজ না থাকলেও এই ক্রোমোজ়োমের অনুপস্থিতির সঙ্গে গুরুতর কয়েকটি অসুখ জড়িয়ে রয়েছে।

ওয়াই ক্রোমোজ়োম নিয়ে একটি নয়, বিভিন্ন সময় বিভিন্ন রকম গবেষণা হয়েছে। দেখা গিয়েছে, কিডনির কোষে ওয়াই ক্রোমোজ়োম কমে গেলে কিডনির রোগের সম্ভাবনা বাড়ে। তা ছাড়া, ওই ক্রোমোজ়োমের অনুপস্থিতির সঙ্গে কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট বা হৃদ্‌রোগের সম্পর্কের প্রমাণও মিলেছে। একটি জার্মান সমীক্ষা বলছে, ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধদের মধ্যে যাঁরা ওয়াই ক্রোমোজ়োম হারিয়েছেন, তাঁদের হৃদ্‌রোগের ঝুঁকি বেড়েছে। কোভিডে মৃত্যুর কারণ হিসাবেও অনেকে ওয়াই ক্রোমোজ়োমের অভাবকে দায়ী করছেন। দেখা গিয়েছে, যাঁরা অ্যালঝাইমার্স বা স্মৃতিভ্রংশ রোগে ভুগছেন, তাঁদের দেহকোষ থেকেও ওয়াই ক্রোমোজ়োম গায়েব হয়ে গিয়েছে।

পুরুষদেহে ক্যানসারের সঙ্গেও কেউ কেউ ওয়াই ক্রোমোজ়োমের ভূমিকাকে জুড়তে চেয়েছেন। ক্যানসার আক্রান্ত কোষ থেকে ওয়াই ক্রোমোজ়োম চলে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। কিন্তু বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, দেহকোষ থেকে ওয়াই ক্রোমোজ়োম বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ায় ক্যানসার আক্রান্ত শরীর চিকিৎসায় তুলনামূলক কম সাড়া দেয়। এই ধরনের অসুস্থতাগুলির সঙ্গে ওয়াই ক্রোমোজ়োমের কী সম্পর্ক, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কেউ কেউ বলেন, এর নেপথ্যে তৃতীয় কোনও ‘ফ্যাক্টর’ কাজ করে। তা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

ওয়াই ক্রোমোজ়োমের প্রভাব সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হতে ওয়াই-বিহীন রক্তকণিকা ইঁদুরের শরীরে প্রয়োগ করে দেখেছেন বিজ্ঞানীরা। ওই সমস্ত ইঁদুরের মধ্যে বার্ধক্যজনিত একাধিক রোগের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। তাদের হৃদ্‌যন্ত্রের কার্যকারিতা হ্রাস পেয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে অনেক ইঁদুর হৃদ্‌রোগেও আক্রান্ত হয়েছে।

ওয়াই ক্রোমোজ়োমের মধ্যে থাকা লিঙ্গনির্ধারক জিনটি পুরুষদেহে ব্যাপক ভাবে প্রভাব বিস্তার করে। কিন্তু মস্তিষ্কে এর কোনও ভূমিকা নেই। একমাত্র পারকিনসন্স রোগের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে ওয়াই ক্রোমোজ়োমের প্রভাব বোঝা যায়। শুক্রাণু তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় ওয়াই ক্রোমোজ়োমের চারটি জিন শুধু অণ্ডকোষে সক্রিয়। দেহের বাকি কোথাও তাদের ভূমিকা নেই। বাকি ৪৬টি জিনের অনেকগুলিই শরীরে ব্যাপক ভাবে প্রকাশিত। কয়েকটিকে আবার ক্যানসার প্রতিরোধকারী বলেও চিহ্নিত করেছেন বিজ্ঞানীরা। তবে এই নির্দিষ্ট জিনগুলি এক্স ক্রোমোজ়োমেও থাকে। ফলে পুরুষের পাশাপাশি নারীশরীরেও জিনগুলি একই প্রভাব ফেলে।

Advertisement
আরও পড়ুন