— প্রতীকী চিত্র।
ওদের মগজ শুধু মাথাতেই নয়, ছড়িয়ে রয়েছে শরীরের অন্যত্রও। গোটা দেহে মোট ৯টি মগজ। কথা হচ্ছে অক্টোপাসদের নিয়ে। বুদ্ধিমত্তার জন্য ওদের পরিচিতি অনেক আগে থেকেই। তবে সেই বুদ্ধিমত্তার প্রসার কতটা, তা নিয়ে রহস্য রয়েই গিয়েছে। এ বার সেই ‘রহস্যময়’ বুদ্ধিমত্তার আরও নমুনা দেখা গেল। জানা গেল, আয়না দেখে শিকার ধরতে পারে এই প্রাণীরা।
অক্টোপাসদের বুদ্ধিমত্তার একটি উল্লেখযোগ্য পরিচয় মিলেছিল ২০১৬ সালে। নিউ জ়িল্যান্ডের ন্যাশনাল অ্যাকোয়ারিয়াম থেকে পালিয়েছিল এক পুরুষ অক্টোপাস, নাম ‘ইঙ্কি’। যে ট্যাঙ্কে ‘ইঙ্কি’ ছিল, তার ঢাকনার একটি সামান্য অংশ ভুলবশত খোলা রয়ে গিয়েছিল। সেই ফাঁক গলে বেরিয়ে মেঝেতে নেমে আসে সে (শরীরে হাড় না থাকায় নিজেদের দেহকে সংকুচিত করে সহজেই খুব ছোট জায়গা দিয়ে যাতায়াত করতে পারে এরা)। তার পরে ট্যাঙ্ক থেকে প্রায় ৫ মিটার দূরে একটি ড্রেন পাইপে ঢুকে পড়ে। সেই ড্রেন পাইপ দিয়ে সোজা চলে যায় প্রশান্ত মহাসাগরে।
এ বার নতুন এক গবেষণায় জানা গেল— আয়নায় প্রতিবিম্ব দেখে শিকার ধরার কৌশলও আয়ত্ত করতে পারে অক্টোপাসেরা। বিজ্ঞান বিষয়ক জার্নাল ‘কারেন্ট বায়োলজি’-তে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণাটি করেছেন আমেরিকার ডার্টমাউথের গবেষকেরা। এই গবেষণাটি অক্টোপাসদের বুদ্ধিমত্তার রহস্য উন্মোচনের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষকদের দাবি, এত দিন যা মনে করা হত, অক্টোপাসদের বুদ্ধিমত্তা তার চেয়েও বেশি। আয়নায় প্রতিবিম্ব দেখে খাবার খুঁজে বের করতে শেখা— এই দক্ষতা এতদিন কোনও অমেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে দেখা যায়নি। এর আগে শুধু কিছু স্তন্যপায়ী প্রাণী এবং পাখির মধ্যেই এই দক্ষতা সীমিত ছিল। কিন্তু নতুন গবেষণা দেখিয়ে দিল, প্রায় ৭৩ শতাংশ ক্ষেত্রেই আয়নায় প্রতিবিম্ব দেখে খাবার সঠিক ভাবে খুঁজে বের করতে পারে অক্টোপাসেরা। গবেষণায় আভাস, আয়নায় প্রতিবিম্ব দেখে ‘ভয় পাওয়া’ বা ‘আগ্রাসী’ বা অন্য কোনও প্রতিক্রিয়া দেখানোর বদলে অক্টোপাসেরা আয়নাকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করার কৌশল রপ্ত করতে পারে।
এই গবেষণার নেতৃত্বে ছিলেন ডার্টমাউথের সাইকোলজিক্যাল অ্যান্ড ব্রেন সায়েন্সেস বিভাগের গবেষক মেরি কিসেলার। তিনি বর্তমানে সুইজ়ারল্যান্ডের ফ্রিবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত। কিসেলারের কথায়, “আমাদের গবেষণাই প্রথম প্রমাণ করেছে যে অমেরুদণ্ডী প্রাণীরাও শিকার খোঁজার জন্য নিজেদের আশপাশের পরিবেশ বুঝতে আয়না ব্যবহার করতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “এটি এমন একটি দক্ষতা যা এর আগে শুধুমাত্র মেরুদণ্ডী প্রাণীদের মধ্যেই দেখা গিয়েছিল।”
কিসেলারের নেতৃত্বে ওই গবেষকদল ডার্টমাউথের অক্টোপাস ল্যাবে রাখা তিনটি ক্যালিফোর্নিয়া টু-স্পট অক্টোপাসের উপর গবেষণা চালান। অক্টোপাসদের নজরের আড়ালে থাকা কোনও খাবার তারা আয়না দিয়ে শনাক্ত করতে পারে কি না, তা নির্ধারণ করাই ছিল এই গবেষণার মূল লক্ষ্য। গবেষকেরা প্রথমে ল্যাবরেটরিতে অক্টোপাসদের থাকার জায়গায় একটি আয়না রেখে দিয়েছিলেন, যাতে সেটির সঙ্গে অক্টোপাসেরা পরিচিত হতে পারে। এর পরে প্রতিবিম্ব এবং বাস্তব জগতের মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে অক্টোপাসদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এর জন্য তাঁরা কাঁচের জারের মধ্যে জ্যান্ত কাঁকড়া রেখে দেন। জারটি এমন জায়গায় রাখা ছিল যাতে সেটি একমাত্র আয়নার মাধ্যমেই দেখতে পারে অক্টোপাসেরা।
গবেষকদলের অন্যতম সদস্য তথা স্নায়ুবিজ্ঞানী পিটার সি-র কথায়, “আমরা কেউ-ই আয়না ব্যবহার করতে শিখে নিয়ে পৃথিবীতে আসি না। বরং আমরা পৃথিবীতে আসার পরে আয়নার ব্যবহার শিখি।” তাঁর মতে, কোনও নতুন গাড়িচালক যে ভাবে অন্য গাড়ির অবস্থান বুঝতে ‘রিয়ারভিউ মিরর’ ব্যবহার করতে শেখে, তেমনই অক্টোপাসেরাও তা রপ্ত করতে পারে।
গবেষণায় দেখা গিয়েছে প্রায় ৭৩ শতাংশ ক্ষেত্রেই অক্টোপাসেরা আয়নার মাধ্যমে সঠিক ভাবে খাবার চিহ্নিত করতে পেরেছে। তবে সব ক্ষেত্রে যে অক্টোপাসগুলি সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত পথ বেছে নিয়েছিল, এমন নয়। তবে গবেষণা যত এগিয়েছে, তত দ্রুত খাবার চিহ্নিত করতে পেরেছে অক্টোপাসেরা। যদিও অক্টোপাসেরা সব ক্ষেত্রেই এই ধরনের প্রবণতা দেখায় কি না, সে বিষয়ে আরও বিশদে পরীক্ষানিরিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন গবেষকেরা।