ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।
কার্বন নিঃসরণ এবং বিশ্ব উষ্ণায়নের জেরে ধীরে ধীরে ‘বরফশূন্য’ হচ্ছে পৃথিবী। বহু হিমবাহ ইতিমধ্যে হারিয়ে গিয়েছে পৃথিবী থেকে। এ বার আরও এক উদ্বেগের বিষয় উঠে এল নতুন গবেষণায়। উষ্ণায়ন এবং হিমবাহ গলন বিরূপ প্রভাব ফেলছে হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলির উপরেও। বিভিন্ন নদীর গতিপথ দ্রুত বদলে যাচ্ছে, এমন আভাস মিলেছে সাম্প্রতিক এক গবেষণায়।
হিমালয় পর্বতমালা গোটা এশিয়া মহাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নদীর উৎস। ভারত, চিন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, নেপাল, ভুটানের বিভিন্ন নদীর উৎসস্থল হিমালয়ে। এই নদীগুলিই এশিয়ার সমভূমিতে বসবাসকারী প্রায় ২০০ কোটি মানুষের জীবনধারণে সাহায্য করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দাবি করা হচ্ছে, জলবায়ু উষ্ণ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হিমবাহিত জলে পুষ্ট এই নদীগুলিতেও পরিবর্তন আসে। এই গবেষণার জন্য চার দশক থেকে তোলা বিভিন্ন উপগ্রহচিত্র বিশ্লেষণ করে দেখা হয়। তাতে দেখা যায়, হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে হিমালয়ের নদীগুলি আরও দ্রুত গতিপথ পরিবর্তন করছে। এর ফলে নদীগুলির প্রকৃতি কেমন হবে, তা-ও অনিশ্চিত হয়ে পড়ছে। একই সঙ্গে বন্যা, ভূমিক্ষয়ের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেতে পারে বলে আশঙ্কা গবেষকদের।
বেজিঙের ‘চায়না ইউনিভার্সিটি অফ জিওসায়েন্সেস’-এর অধ্যাপক চেংশান ওয়াঙের নেতৃত্বে এই গবেষণাটি হয়। গবেষণায় তাঁকে সাহায্য করেন ওই প্রতিষ্ঠানেরই গবেষক ঝংপেন হান এবং সিচুয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক লিন ঝিপেং। জলবায়ু পরিবর্তন এবং হিমবাহের গলন কী ভাবে হিমালয়ের প্রধান নদী অববাহিকাগুলিকে প্রভাবিত করে, তা বিশ্লেষণ করে দেখেন তাঁরা। গত ১৪ মে ‘সায়েন্স’ জার্নালে এই গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।
চেংশান এবং তাঁর সহযোগীরা মোট ৪০ বছরের পরিবর্তনকে বিশ্লেষণ করেন। ১৯৮০ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত পাওয়া বিভিন্ন উপগ্রহচিত্র ব্যবহার করেন তাঁরা। বিভিন্ন নদী অববাহিকা সরেজমিন পর্যবেক্ষণও করা হয়। গবেষণায় উঠে আসে, ১৯৮০-এর দশক থেকে বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা বৃদ্ধির গড় হার যা ছিল, হিমালয়ে ছিল তার দ্বিগুণ। গবেষণায় এ-ও দেখা যায়, হিমালয় পর্বতমালার মধ্যে দিয়ে জল এবং পলির স্তর কী ভাবে প্রবাহিত হবে, তাতে পরিবর্তন আনার ক্ষমতা রাখে উষ্ণায়ন। বরফগলা অতিরিক্ত জল নদীগুলিতে আরও ‘শক্তির’ জোগান দেয়। উল্লেখ্য, এখানে ‘ফ্রোজ়েন গ্রাউন্ড’ বা হিমায়িত মাটি (মাটিতে মিশে থাকা জল বরফ হয়ে গেলে, সেই মাটি জমাট বেঁধে শক্ত হয়ে যায়। তাকে হিমায়িত মাটি বলে)-ও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে। হিমায়িত মাটি গলে গেলে নদীর পাড় দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
গবেষণার জন্য তাঁরা বিভিন্ন নদীখাতের ১,৫৮২ কিলোমিটার দীর্ঘ অংশ বিশ্লেষণ করে দেখেন। এতে মোট ১,০৭৯টি নদীবাঁকের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন তাঁরা। এর মধ্যে অনেকগুলি নদীবাঁকই সহজে গতিপথ বদলে ফেলার মতো পরিস্থিতিতে রয়েছে। কারণ, সেখানে নদীর প্রবাহকে বাধা দেওয়ার মতো কিছু নেই। গবেষণায় কোথাও দেখা গিয়েছে নদীর গতিপথে ‘কাট অফ’ হয়েছে। অর্থাৎ, নদী পুরনো গতিপথ ছেড়ে তুলনামূলক সংক্ষিপ্ত পথে প্রবাহিত হয়েছে। আবার কোথাও গতিপথে ‘অ্যাভলশন’ হয়েছে। অর্থাৎ, কোনও নদী আচমকাই পুরনো গতিপথ ছেড়ে নতুন গতিপথ ধরেছে। গবেষকদের দাবি, গত ৪০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গিয়েছে ওই সময়কালে নদীর গতিপথে যথেষ্ট নাড়াচাড়া পড়েছে। সামগ্রিক ভাবে ১৯৮০-২০২০ সালের মধ্যে হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলির গতিপথে ৩৩ শতাংশ বেশি বদল হয়েছে। বাধাহীন নদীবাঁকগুলিতে এই বৃদ্ধির হার প্রায় ৯৭ শতাংশ।
গবেষকদের দাবি, হিমালয় জুড়ে তাপমাত্রার ক্রমাগত বৃদ্ধি, হিমবাহ ও হিমায়িত মাটি গলে যাওয়ার ফলেই এই পরিবর্তনগুলি হচ্ছে। জলবায়ু উষ্ণ হয়ে গেলে নদীগুলিতে আরও বেশি জল এবং পলির স্তর নেমে আসছে। এই সব অনুঘটকগুলি মিলেই নদীকে তার গতিপথ সহজে বদলে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি করে দিচ্ছে বলে মনে করছেন তাঁরা।
বিশ্বব্যাপী শিল্পের ব্যাপক প্রসার হওয়ার পর থেকেই উষ্ণায়নের হার বৃদ্ধি পেয়েছে। জলবায়ু বিজ্ঞানীদের মতে, এই ব্যাপক প্রসার হয়েছিল ১৮৫০-১৯০০ সালের মধ্যে। এর আগের সময়কালকেই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের হারকে একটি আদর্শ মাপকাঠি হিসাবে ধরেন জলবায়ু বিজ্ঞানীরা। ওই সময়ে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের হার ছিল ১.৫-২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এখন তা অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। ১০ বছর আগে, ২০১৫ সালে বিশ্ব উষ্ণায়নের মোকাবিলা করতে প্যারিস চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। তাতে স্থির হয়, বিশ্ব উষ্ণায়নের হারকে ফের ১.৫ ডিগ্রিতে নামিয়ে আনতে উদ্যোগী হবে দেশগুলি। না-হলে অন্তত ২ ডিগ্রির নীচে নামিয়ে আনার চেষ্টা করা হবে। এক দশক পেরিয়েও প্যারিস চুক্তির সেই লক্ষ্যপূরণ হয়নি। বর্তমানে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যে পথে এগোচ্ছে, তাতে চলতি শতাব্দীতে উষ্ণায়নের হার ২.৭ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।