Sharks of Pre Dinosaur Era

সাড়ে ৩২ কোটি বছর আগেও হাঙরেরা ঘুরে বেড়াত! খোঁজ মিলল ‘অদৃশ্য’ সমুদ্রে গুহার ভিতরে, দেখতে কেমন ছিল?

পৃথিবীতে ডাইনোসরদের আবির্ভাব হয়েছিল আজ থেকে আনুমানিক ২৪ কোটি বছর আগে। এই সামুদ্রিক শিকারিরা তারও আগে থেকে ঘুরে বেড়াচ্ছে। যে সময়ে এই হাঙরেরা সমুদ্রে ঘুরে বেড়াত, তখন পৃথিবীর স্থলভাগ আজকের মতো ছিল না।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৭
৩২ কোটি ৫০ লক্ষ বছর আগেও পৃথিবীতে ছিল হাঙরদের অস্তিত্ব।

৩২ কোটি ৫০ লক্ষ বছর আগেও পৃথিবীতে ছিল হাঙরদের অস্তিত্ব। ছবি: এআই সহায়তায় প্রণীত।

তখনও পৃথিবীতে ডাইনোসরদের আবির্ভাব হয়নি। আজ থেকে প্রায় ৩২ কোটি ৫০ লক্ষ বছর আগের কথা। সেই সময়েও সমুদ্রে ঘুরে বেড়াত সামুদ্রিক শিকারিরা। পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাওয়া এমন দুই সামুদ্রিক শিকারির ‘সন্ধান’ পেয়েছেন জীবাশ্মবিদেরা। পাওয়া গিয়েছে হাঙরের মতো দেখতে দুই প্রজাতির জীবাশ্ম।

Advertisement

আমেরিকার কেন্টাকি প্রদেশের ম্যামথ গুহা। কেন্টাকি শহর থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দক্ষিণ পশ্চিমে অবস্থিত এই গুহাটি বিশ্বের দীর্ঘতম। গুহার ভিতরের অনেক পথ এখনও আবিষ্কৃতই হয়নি। সেই গুহার ভিতরেই মিলেছে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া দুই সামুদ্রিক প্রাণীর জীবাশ্ম। দেখতে অনেকটা হাঙরের মতোই। তীক্ষ্ণ দাঁত। দাঁতের গড়ন এমন যে শিকারকে অনায়াসে পিষে দু’টুকরো করে দিতে পারে। লম্বায় ১০-১২ ফুট। এখন সমুদ্রে যে হোয়াইট টিপ হাঙর ঘুরে বেড়ায়, এদের আকারও তেমনই।

৬৭৫ কিলোমিটার জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এই গুহা এখনও এক গোলকধাঁধাঁর মতো। কার্বনিফেরাস যুগে (আজ থেকে প্রায় ৩৫-৩০ কোটি বছর আগে) এই গুহার পুরোটাই ছিল জলের তলায়। শুধু এই গুহাই নয়, কেন্টাকি প্রদেশ-সহ উত্তর আমেরিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছিল সমুদ্রের তলায়। সেই সময়েই এই হাঙরেরা ঘুরে বেড়াত সমুদ্রগর্ভের গুহার মধ্যে। পরবর্তী সময়ে ভূগর্ভস্থ টেকটনিক প্লেট সরতে শুরু করলে এই সমুদ্রও হারিয়ে যায়। রয়ে যায় পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া বিভিন্ন প্রাণীর জীবাশ্ম।

গত কয়েক দশকে এই গুহার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের প্রাচীন সামুদ্রিক প্রাণীর জীবাশ্ম মিলেছে। তালিকায় রয়েছে কিছু প্রাচীন প্রবালও। এখনও পর্যন্ত ৭০টিরও বেশি প্রাচীন সামুদ্রিক প্রজাতির সন্ধান মিলেছে এই গুহায়। সম্প্রতি ম্যামথ গুহায় অভিযান চলাকালীন হাঙরের মতো দেখতে দুই প্রজাতির সন্ধান পান জীবাশ্মবিদেরা। জীবাশ্মগুলির বয়স ৩২ কোটি ৫০ লক্ষ বছর।

পৃথিবীতে ডাইনোসরদের আবির্ভাব হয়েছিল আজ থেকে আনুমানিক ২৪ কোটি বছর আগে। অর্থাৎ, এই সামুদ্রিক শিকারিরা ডাইনোসরদেরও আগে থেকে পৃথিবীতে ঘুরে বেড়াত। কয়েক বছর আগে আমেরিকার ‘মেরিল্যান্ড-ন্যাশনাল ক্যাপিটাল পার্কস অ্যান্ড প্ল্যানিং কমিশন’-এর হাঙর বিশেষজ্ঞ জন-পল হডনেট এবং একদল জীবাশ্মবিদ এই গুহায় অভিযান চালান। তাঁরাই খুঁজে পান জীবাশ্মগুলি। গবেষকদের দাবি, এরাই হল আধুনিক হাঙরদের পূর্বসূরি। তাঁরা বিলুপ্ত দুই হাঙর প্রজাতির নামকরণ করেছেন— ট্রোগ্লোক্ল্যাডোডাস ট্রিম্বলি এবং গ্লিকম্যানিয়াস কেয়ারফোরাম।

এই জীবাশ্মগুলির আবিষ্কার গবেষকদের কাছে যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, গ্লিকম্যানিয়াস কেয়ারফোরাম হল হেসলেরোডিডা গোত্রের হাঙর। এই গোত্রের হাঙর যে এত প্রাচীন কালে পৃথিবীতে থাকত, তা এত দিন অজানাই ছিল জীবাশ্মবিদদের কাছে। আগে এদের অস্তিত্বের বিষয়ে যা প্রমাণ ছিল, নতুন জীবাশ্মটি তার চেয়েও পাঁচ কোটি বছরের পুরানো। ম্যামথ গুহায় খুঁজে পাওয়া এই জীবাশ্মটিই হেসলেরোডিডা গোত্রের প্রাচীনতম উদাহরণ।

যে সময়ে এই হাঙরেরা সমুদ্রে ঘুরে বেড়াত, তখন পৃথিবীর স্থলভাগ আজকের মতো ছিল না। উত্তর আমেরিকা মহাদেশেরই অস্তিত্ব ছিল না। সব মহাদেশগুলিকে একসঙ্গে যুক্ত ছিল। ছিল একটিই বিশাল ভূখণ্ড। সেই সময়ে এই হাঙরেরা ঘুরে বেড়াত সমুদ্রে। আরও পরে, আজ থেকে আনুমানিক ৩০-২০ কোটি বছর আগে ভূখণ্ড ভেঙে তৈরি হয় সুপার কন্টিনেন্ট প্যানজিয়া। পরবর্তী সময়ে এর থেকেই ভেঙে তৈরি হয় উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা, আফ্রিকার মতো মহাদেশগুলি।

ট্রোগ্লোক্ল্যাডোডাস ট্রিম্বলি এবং গ্লিকম্যানিয়াস কেয়ারফোরাম— উভয়েই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে পৃথিবী থেকে। জীবাশ্ম গবেষণায় উঠে এসেছে, ট্রিম্বলির গড় দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় সাড়ে ১১ ফুটের কাছাকাছি। দাঁত ছিল তীক্ষ্ন, যা নরম দেহের শিকার অনায়াসেই ধরতে পারে। শারীরিক গঠন ছিল দ্রুত আক্রমণের জন্য উপযুক্ত। অন্য দিকে কেয়ারফোরাম প্রজাতির হাঙরদের দৈর্ঘ্য ছিল আনুমানিক ১০-১২ ফুট। কিছু কিছু হাঙর আকারে আরও বড় হত বলে অনুমান করা হচ্ছে। শারীরিক গড়ন বিশ্লেষণ করে জীবাশ্মবিদদের অনুমান, ট্রিম্বলির তুলনায় এরা অনেক বেশি আক্রমণাত্মক ছিল। জীবাশ্মের গড়ন দেখে অন্তত তেমনই অনুমান করছেন বিজ্ঞানীরা।

সাধারণত হাঙরের জীবাশ্ম খুবই বিরল। অতীতে হাঙরের যে সব জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছে, তার বেশির ভাগই টুকরো টুকরো অবস্থায় মিলেছে। কারণ, হাঙরের কঙ্কাল বেশির ভাগই তৈরি তরুণাস্থি দিয়ে, যা সহজেই ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। দাঁত টিকে থাকলেও দেহের হাড়গোড় সে ভাবে টিকে থাকে না। তবে ম্যামথ গুহায় যে জীবাশ্মগুলি পাওয়া গিয়েছে, তা ছিল প্রায় সম্পূর্ণ দেহের জীবাশ্ম। জীবাশ্মগুলি এতটাই ভাল ভাবে সংরক্ষিত ছিল যে ত্বকের ছাপও স্পষ্ট ধরা পড়েছে তাতে।

Advertisement
আরও পড়ুন