Sand Import

বড় বড় মরুভূমির দেশ! তারপরেও কেন প্রতি বছর লক্ষ লক্ষ টন বালি আমদানি করে সৌদি আরব

গত ৫০ বছর ধরে প্রতি বছর এর চাহিদা বাড়ছে ৩.২ শতাংশ। এত দিন যত বালি ব্যবহার হয়েছে, তা দিয়ে গোটা পৃথিবীর চার পাশে ২৭ মিটার লম্বা এবং ২৭ মিটার পুরু প্রাচীর তৈরি করা যেত।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬ ০৮:৫৮
Saudi Arabia imports sand despite dominated by desert

কেন অন্য দেশ থেকে বালি আনাতে হয় সৌদিকে? ছবি: সংগৃহীত।

সমুদ্র সৈকত থেকে মরুভূমি— বালি রয়েছে সর্বত্র। তার পরেও কেন বালি আমদানি করতে হয় মরুভূমি অধ্যুষিত সৌদি আরবের মতো দেশকেও? কেন পৃথিবী জুড়ে এত দৌড়াত্ম্য বালি মাফিয়াদের? নেপথ্যে রয়েছে বালির গঠন।

Advertisement

২০২৩ সালে অস্ট্রেলিয়া থেকে এক লক্ষ ৪০ হাজার ডলারের বালি আমদানি করেছিল সৌদি আরব। ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১.৩৩ কোটি টাকা। নির্মাণের জন্য ওই দামে প্রায় লক্ষ লক্ষ টন বালি আমদানি করেছিল সৌদি। সেখানে রয়েছে পৃথিবীর বৃহত্তম মরুভূমির কয়েকটি। তার পরেও কেন অন্য দেশ থেকে বালি আনতে হয় সৌদিকে? আকারের কারণে সৌদির মরুভূমির বালি নির্মাণকাজে ব্যবহার করা যায় না। হাজার হাজার বছর ধরে বায়ুপ্রবাহের দ্বারা ক্ষয় হয়ে, ঘর্ষণের ফলে সেখানকার বালি মসৃণ কণায় পরিণত হয়েছে। নির্মাণের জন্য সিমেন্টের সঙ্গে বালি মাখতে হয়। কিন্তু মসৃণ বালি সিমেন্টের সঙ্গে মাখা যায় না। মেশানোর চেষ্টা করা হল তা আলাদা হয়ে যায়।

তা হলে নির্মাণের জন্য কোন বালি প্রয়োজন? ভাঙা, অমসৃণ বালির কণা ছাড়া নির্মাণ সম্ভব নয়। সিমেন্টের সঙ্গে একমাত্র সেই ভাঙা, অমসৃণ বালিই মাখা যায়, যা মেলে নদী, হ্রদের খাত থেকে। ওই সব এলাকায় নদীর স্রোতের ধাক্কায় পাথর ভেঙে বালি তৈরি হয়, যার আকার গোল হয় না। পৃষ্ঠ অমসৃণ হয়। এ বার সৌদি মরুভূমির বুকে নতুন শহর নিয়োম তৈরি করছে। সেই কাজে তাদের প্রচুর বালির প্রয়োজন, যা আমদানি করা হচ্ছে বিদেশ থেকে।

কেন মরুভূমির বালি নির্মাণে ব্যবহার হয় না?

বিজ্ঞানীরা বলছেন, বালির দানার আকার বিভিন্ন রকম হয়। সেই আকার নির্ভর করে তার উৎপত্তির উপরে। নদীবাহিত পলি, বালির ঘর্ষণ হয় হিমবাহের সঙ্গে। স্রোতের আঘাত লাগে। সে কারণে তা অসমৃণ হয়। যখন সিমেন্টের সঙ্গে মাখা হয়, তখন তা পরস্পরের সঙ্গে এঁটে থাকে। মরুভূমিতে যে বালি থাকে, তা উড়িয়ে আনে বাতাস। ঘর্ষণ হয়। হাজার হাজার বছর ধরে চলে সেই প্রক্রিয়া। এর ফলে সেই বালি মসৃণ হয়। প্রতিটি কণার আকারও হয় একই রকম। সেগুলি সিমেন্টের সঙ্গে মাখা হলে জমাট বাঁধে না। আলগা হয়ে যায়। এক কিলোমিটার দীর্ঘ সেতু বা ২০ তলা উঁচু বিল্ডিং তৈরি করা ওই বালি দিয়ে সম্ভবই নয়।

সে কারণেই বালি আমদানি করে সৌদির মতো মরুভূমি অধ্যুষিত দেশগুলিও। সৌদি, আরব আমিরশাহি, পশ্চিম এশিয়ার অনেক দেশ সবচেয়ে বেশি বালি আমদানি করে অস্ট্রেলিয়া থেকে। অস্ট্রেলিয়ার রয়েছে প্রচুর ছোটবড় নদী। তাদের খাত জমা হয় বালি। হিমবাহ বাহিত বালি জমে তৈরি হয়েছে বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি। সেখান থেকেই বালি তুলে রফতানি করে অস্ট্রেলিয়া।

রাষ্ট্রপুঞ্জের কিছু গবেষণার সূত্র ধরে গালফ গুজ নিউজ জানিয়েছিল, দুবাইয়ে বু্র্জ খলিফা তৈরি করতে ৩,৩০,০০০ কিউবিক মিটার কংক্রিটের প্রয়োজন হয়েছিল। বেশিরভাগই ছিল বালি। আর সেই বালির বেশিরভাগটাই আমদানি করা হয়েছিল অস্ট্রেলিয়া থেকে। কৃত্রিম দ্বীপ পাম জুমেরা তৈরি করতে ৯ কোটি ৪০ লক্ষ কিউবিক মিটার কংক্রিটের প্রয়োজন পড়েছিল।

রাষ্ট্রপুঞ্জের এনভায়রমেন্ট প্রোগ্রাম রিপোর্টর স্যান্ড অ্যান্ড সাসটেনেবিলিটি: অ্যান এসেনশিয়াল রিসোর্স ফর নেচার অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট বলছে, প্রতি বছর ৫০০০ কোটি টন বালি নদীখাত থেকে উত্তোলিত হয়। ১৯৭৬ সাল থেকে এই পরিমাণ বেড়ে পাঁচগুণ হয়েছে। জলের পরে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি যে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার হয়, তা হল বালি। গত ৫০ বছর ধরে প্রতি বছর এর চাহিদা বাড়ছে ৩.২ শতাংশ। এত দিন যত বালি ব্যবহার হয়েছে, তা দিয়ে গোটা পৃথিবীর চার পাশে ২৭ মিটার লম্বা এবং ২৭ মিটার পুরু প্রাচীর তৈরি করা যেত।

যেখানে চাহিদা এত, সেখানে বালির জোগান কিন্তু সীমিত। তাই বেআইনি ভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নদীখাত থেকে বালি উত্তোলন চলছে। তার প্রভাব পড়ছে নদীর বাস্তুতন্ত্রে। বন্যা আসছে। সেতু ভেঙে পড়ছে। ছোট ছোট দ্বীপ উধাও হয়ে যাচ্ছে। তার পরেও নদী খনন করে বন্ধ হচ্ছে না বালি উত্তোলন। কিন্তু প্রশ্ন, নদীখাতের বালির বিকল্প কী হতে পারে? কিছু দেশ পাথর ভাঙা বালি নির্মাণ কাজে ব্যবহার করছে। কিছু দেশে আবার পুরনো পরিকাঠামোর ভগ্নাংশ গুঁড়িয়ে নতুন নির্মাণে ব্যবহার করা যায় কি না, তা নিয়ে চলছে গবেষণা। যত দিন না তা হচ্ছে, তত দিন কিন্তু চোরাচালান বন্ধ হবে না বলে আশঙ্কা পরিবেশবিদদের। তার ফল ভুগবে পরিবেশ, নদীর বাসিন্দারা।

Advertisement
আরও পড়ুন