পাকিস্তানের লারকানা জেলায় মহেঞ্জোদারোর ধ্বংসস্তূপে নতুন করে খননকার্য চলে। — প্রতীকী চিত্র।
মহেঞ্জোদারো। ব্রোঞ্জ যুগের অন্যতম উৎকর্ষ শহর। সিন্ধু নদের অববাহিকায় হারিয়ে যাওয়া এই শহরকে আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর আগে আবিষ্কার করেছিলেন বাঙালি প্রত্নতাত্ত্বিক রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায়। সিন্ধু সভ্যতার অন্যতম বড় এই নগরীকে নিয়ে এ বার উঠে এল আরও নতুন তথ্য। এত দিন যা মনে করা হত, তার চেয়েও পুরনো মহেঞ্জোদারোর ‘শিকড়’। সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এমনটাই ইঙ্গিত মিলেছে। গবেষকদের অনুমান, সিন্ধু সভ্যতার এই প্রাচীন শহরের অস্তিত্ব ছিল ৩৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেও।
মহেঞ্জোদারো কেন হারিয়ে যায়, তা নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে। কেউ দাবি করেন প্রাকৃতিক বিপর্যয়, সিন্ধু নদের গতিপথ বদলের ফলে জনপদটি ধ্বংস হয়ে যায়। আবার কেউ মনে করেন, এর নেপথ্যে রয়েছে শত্রুর আক্রমণ। তবে এই নগর ব্যবস্থা কোন সময়ে গড়ে উঠেছিল, তা নিয়ে এত দিন বিশেষ কোনও দ্বিমত ছিল না। এত দিনের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী, মহেঞ্জোদারোর নগর ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল আনুমানিক ২৬০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে। ওই সময় থেকে ১৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত এক উন্নত শহর ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল এখানে। তার পরে কোনও এক কারণে মহেঞ্জোদারোর শহর ব্যবস্থা হারিয়ে যায়।
এ বার সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, মহেঞ্জোদারোর নগরব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল আরও আগে। আনুমানিক ২৬০০-৩৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেও মহেঞ্জোদারোয় নগরব্যবস্থার অস্তিত্ব ছিল। সাম্প্রতিক কিছু খননকার্য এবং তার রেডিয়োকার্বন ডেটিং থেকে এমনটাই আভাস মিলেছে।
পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশের লারকানা জেলায় এই প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষে সম্প্রতি নতুন করে খননকার্য চলে। পাকিস্তান এবং আমেরিকার গবেষকদলের যৌথ উদ্যোগে এই খননকার্যটি করা হয়। তারা মহেঞ্জোদারোর সেই স্তূপের পশ্চিমে সমতল ভূমিতে খোঁড়াখুঁড়ি করেন। এখানে আগেই, ১৯৫০ সালে একটি প্রাচীরের মতো গঠন আবিষ্কার করেছিলেন প্রত্নতাত্ত্বিক মার্টিমার হুইলার। তাঁর ধারণায়, এগুলি ছিল নদীবাঁধ। বন্যার জল আটকানোর জন্য এগুলি তৈরি করা হয়েছিল বলে মনে করেছিলেন হুইলার। তবে ওই অঞ্চলে খননকার্যের পরে নতুন গবেষণায় দাবি করা হচ্ছে, সেগুলি কোনও নদীবাঁধ নয়। সেগুলি আসলে সীমানা প্রাচীর। রেডিয়োকার্বন ডেটিং করে ওই সীমানা প্রাচীরগুলির বয়সও নির্ধারণ করেছেন গবেষকেরা।
পাকিস্তানের ‘ন্যাশনাল ফান্ড ফর মহেঞ্জোদারো’ (এনএফএম)-র তত্ত্বাবধানে এই অনুসন্ধানটি চলে। সিন্ধু প্রদেশের ‘ডিরেক্টরেট জেনারেল অফ আর্কিওলজি অ্যান্ড অ্যান্টিকুইটিস’ এবং পাকিস্তানের ‘সিন্ধ এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড অ্যাডভেঞ্চার সোসাইটি’ যৌথ ভাবে এই খননকার্যটি করে। গবেষকদলের নেতৃত্বে ছিলেন পাকিস্তানি প্রত্নতাত্ত্বিক আসমা ইব্রাহিম এবং আলি লশারি। তাঁদের এই গবেষকদলে ছিলেন আমেরিকার উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোনাথন মার্ক কেনয়ারও। নতুন এই গবেষণাপত্রটি আনুষ্ঠানিক ভাবে এখনও প্রকাশিত হয়নি। তবে পাকিস্তানি সংবাদমাধ্যম ডন সে দেশের এনএফএম-এর টেকনিক্যাল কনস্টালেটিভ কমিটির সঙ্গে কথা বলে জানায়, আনুমানিক ২৬০০-৩৩০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেও মহেঞ্জোদারোয় বসতির অস্তিত্ব ছিল।
স্তূপের পশ্চিম দিকে ওই প্রাচীরের সময়কাল সঠিক ভাবে নির্ধারণ করাই এই গবেষণার মূল লক্ষ্য ছিল। এ বিষয়ে গবেষকদলের অন্যতম সদস্য আসমার সঙ্গে যোগাযোগ করে ডন। তিনিও এই সময়কালের কথা নিশ্চিত করেন। খননকার্যের সময়ে তিনি মহেঞ্জোদারোতেই ছিলেন। আসমা বলেন, “পাকিস্তানে রেডিয়োকার্বন ডেটিংয়ের সুবিধা নেই। তাই আমেরিকায় এই পরীক্ষাগুলি করা হয়েছে।”
লারকানা জেলায় সিন্ধু নদের তীরে ৬২০ একরেরও বেশি এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে মহেঞ্জোদারোর হারিয়ে যাওয়া নগরব্যবস্থা। নতুন এই গবেষণালব্ধ ফল সত্য প্রমাণিত হলে মহেঞ্জোদারোর সময়কাল নতুন করে লেখা হতে পারে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত ভাবে কিছু দাবি করার আগে গবেষণাটি পিয়ার রিভিউ (সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের অন্য বিশেষজ্ঞদের দ্বারা যাচাই করানো) এবং প্রকাশ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।