— প্রতীকী চিত্র।
আকারে বড়। তবে সেই তুলনায় ভর খুবই কম। চেহারায় দানবাকার হলেও আসলে ‘ফাঁপা’। এমনই দুই ‘বিরল’ গ্রহের সন্ধান পেলেন মহাকাশবিজ্ঞানীরা। এদের এক একটির আকার প্রায় বৃহস্পতির (আমাদের সৌরমণ্ডলের সবচেয়ে বড় গ্রহ, যার ব্যাস পৃথিবীর ১১ গুণ) মতো। অথচ প্রতি ঘন সেন্টিমিটারে এদের ঘনত্ব তুলোর চেয়েও কম।
এই ধরনের বিশাল চেহারার ফাঁপা গ্রহের সন্ধান আগেও মিলেছে। তবে এদের সংখ্যা খুবই কম। এখনও পর্যন্ত মাত্র চারটি নক্ষত্রমণ্ডলে এই ধরনের কিছু গ্রহের অস্তিত্বের হদিশ মিলেছে। মহাকাশবিজ্ঞানীরা এগুলিকে বলেন ‘সুপার পাফ’ গ্রহ। সম্প্রতি এমনই দু’টি গ্রহের সন্ধান মিলেছে। বিজ্ঞানীরা এগুলির নাম রেখেছেন ‘টিওআই-৭৯১ বি’ এবং ‘টিওআই-৭৯১ সি’। দু’টি গ্রহই আকারে আর বৃহস্পতির সমান। তবে নিজেদের আকারের তুলনায় দুই-ই উল্লেখযোগ্য ভাবে হালকা।
প্রতি ঘনসেন্টিমিটারে পৃথিবীর গড় ঘনত্ব প্রায় ৫.৫১ গ্রাম। সেখানে ‘টিওআই-৭৯১ বি’-এর ঘনত্ব প্রতি ঘনসেন্টিমিটারে ০.০৩৮ গ্রাম। ‘টিওআই-৭৯১ সি’-এর প্রতি ঘনসেন্টিমিটারে ০.০৪৭ গ্রাম। যা তুলোর চেয়েও হালকা। সাধারণত প্রতি ঘনসেন্টিমিটারে তুলোর ঘনত্ব ১.৫২-১.৫৬ গ্রামের আশপাশে ঘোরাফেরা করে। এমনকি রাস্তাঘাটে যে হাওয়াই মিঠাই বিক্রি হয়, তার চেয়েও এই গ্রহগুলির ঘনত্ব কম। হাওয়াই মিঠাইয়ের ঘনত্ব সাধারণত প্রতি ঘনসেন্টিমিটারে প্রায় ০.০৫ গ্রাম হয়ে থাকে। আকারে বৃহস্পতির প্রায় সমান হলেও বৃহস্পতির ঘনত্ব এই দুই ‘সুপার পাফ’ গ্রহের ঘনত্বের প্রায় ২৮-৩৫ গুণ।
এখনও পর্যন্ত মহাবিশ্বে যতগুলি দানবাকার অথচ ফাঁপা গ্রহ আবিষ্কার হয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম এই দু’টি। এ নিয়ে অনুসন্ধানকারী আন্তর্জাতিক এই গবেষকদলের নেতৃত্বে ছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় বিজ্ঞানীরা। তাঁদের সহযোগিতা করেন ইউনিভার্সিটি কোৎ দা’জুর এবং বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরাও। সম্প্রতি ‘মান্থলি নোটিসেস অফ রয়্যাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি’ এই গবেষণাটি প্রকাশ করে।
সদ্য নিশ্চিত হওয়া দুই ফাঁপা গ্রহ ‘টিওআই-৭৯১ বি’ এবং ‘টিওআই-৭৯১ সি’ রয়েছে ভোলান্স নক্ষত্রপুঞ্জে। পৃথিবী থেকে যার দূরত্ব প্রায় ১,১১০ আলোকবর্ষ (আলো এক সেকেন্ডে প্রায় তিন লক্ষ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে। এক বছরে আলো যত দূরত্ব অতিক্রম করে, তাকেই বলে আলোকবর্ষ)। সেখানে একটি বামন নক্ষত্রের চারপাশে ঘুরছে এই ফাঁপা গ্রহ দু’টি।
বিজ্ঞানীদের অনুমান, বামন নক্ষত্রটির একই গ্যাসীয় ডিস্ক থেকে দু’টি গ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল। এরা ৫:৩ অনুপাতে নক্ষত্রটিকে প্রদক্ষিণ করে। ভিতরের কক্ষপথের গ্রহটি যতক্ষণে নক্ষত্রকে পাঁচ বার প্রদক্ষিণ করে, সেই সময়ে বাইরের কক্ষপথের গ্রহটি ঘোরে তিন বার। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক তথা গবেষকদলের প্রধান জর্জ ড্রান্সফিল্ডের কথায়, “এই ধরনের ‘সুপার পাফ’ গ্রহের সম্পর্কে খুব কমই জানা গিয়েছে। আর একই সৌরমণ্ডলে এই ধরনের দু’টি গ্রহ পাওয়া তো আরও বিরল। এদের ঘনত্ব অত্যন্ত কম হওয়ায়, সৌরমণ্ডল কী ভাবে গঠিত ও বিবর্তিত হয়—তা বোঝার জন্য এগুলো গবেষণার অত্যন্ত আকর্ষণীয় বিষয় হয়ে উঠতে পারে।”
এই দু’টি গ্রহের খোঁজ মিলেছিল বেশ কয়েক বছর আগে। ২০১৯ সালে সন্ধান মেলে ‘টিওআই-৭৯১ বি’-এর। ২০২৩ সালে জানা যায় ‘টিওআই-৭৯১ সি’-এর কথা। মহাকাশ সম্পর্কে কৌতূহলী একটি দলের গ্রহ-অনুসন্ধান প্রজেক্টে এই দু’টি প্রথম ধরা পড়ে। তবে সেগুলি যে গ্রহই ছিল, তা নিশ্চিত হতে পারেননি তাঁরা। গ্রহ-অনুসন্ধানীরা সেগুলিকে সম্ভাব্য গ্রহ বলে চিহ্নিত করেন। সম্প্রতি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে একদল গবেষক নিশ্চিত করেন, ওই দু’টি গ্রহই। বিশাল চেহারার দু’টি ফাঁপা গ্রহ।
এই ‘সুপার পাফ’ গ্রহগুলি কী ভাবে গঠিত হয়, তা এখন বোঝার চেষ্টা করছেন বিজ্ঞানীরা। গবেষকদের ধারণা, এই গ্রহগুলিতে বায়ুমণ্ডল রয়েছে। সেখানে মূলত হাইড্রোজন এবং হিলিয়াম গ্যাস রয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। বিজ্ঞানীরা মনে করছেন, গ্রহগুলির মোট ভরের একটি উল্লেখযোগ্য অংশই রয়েছে এর বায়ুমণ্ডলে। গবেষকদলের অন্যতম সদস্য তথা বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আমাউরি ট্রিয়াউডের কথায়, “এই ‘সুপার-পাফ’ গ্রহগুলো কী ভাবে গঠিত হয়, তা বোঝার জন্য একটি দুর্দান্ত মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে ওই নক্ষত্রমণ্ডলটি।”