উসমান খোয়াজা। ছবি: এক্স।
অ্যাশেজ় সিরিজ়ের পঞ্চম টেস্ট শুরুর আগে অবসর ঘোষণা করলেন উসমান খোয়াজা। আগামী রবিবার সিডনিতে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে শেষ টেস্টেই অস্ট্রেলিয়ার হয়ে শেষ বার মাঠে নামবেন ওপেনিং ব্যাটার। অবসর ঘোষণার সময় ক্রিকেটজীবনে বর্ণবিদ্বেষের শিকার হওয়া নিয়েও মুখ খুলেছেন পাক বংশোদ্ভূত ক্রিকেটার।
সিডনিতেই প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল খোয়াজার। সেই মাঠকেই অবসরের জন্য বেছে নিলেন তিনি। বেশ কিছু দিন ধরে চেনা ফর্মে ছিলেন না খোয়াজা। তাঁর নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছিল। সেই বিতর্কের মাঝেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটজীবনে দাঁড়ি টেনে দিলেন খোয়াজা। স্ত্রী র্যাচেল এবং দুই সন্তানকে পাশে নিয়ে অবসর ঘোষণার সময় আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন খোয়াজা। তিনি বলেছেন, ‘‘অবসরের ভাবনাটা কিছু দিন ধরেই মাথায় ঘুরছিল। অ্যাশেজ় শুরুর সময়ও ভেবেছি, এটাই হয়তো আমার শেষ সিরিজ়।’’ খোয়াজা জানিয়েছেন, অ্যাশেজ় সিরিজ়ের দ্বিতীয় টেস্টে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম একাদশে সুযোগ না পাওয়ার পরই বুঝে যান, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় হয়ে গিয়েছে। অস্ট্রেলীয় ব্যাটার বলেছেন, ‘‘দ্বিতীয় টেস্টের দলে জায়গা না পাওয়া আমার কাছে একটা ইঙ্গিত ছিল। তখনই মনে হয়েছিল, এ বার সামনে এগোনোর সময়।’’
আগামী বছর ভারত সফরে আসবে অস্ট্রেলিয়া। পাঁচ টেস্টের সিরিজ়ে মুখোমুখি হবে দু’দল। শুভমন গিলদের বিরুদ্ধে খেলার ইচ্ছা ছিল খোয়াজার। তার আগেই অবসরজীবনে পা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। এ নিয়ে খোয়াজা বলেছেন, ‘‘আগামী ভারত সফর নিয়ে স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করেছি। মনে হয়েছিল, ওই সফরটা আমার জন্য বড় সুযোগ হতে পারে। কোচের সঙ্গেও এ নিয়ে কয়েক দিন আগে কথা বলি। ভারত সফরের দলে আমাকে রাখা নিয়ে আলোচনাও হচ্ছিল। কিন্তু একটা সময় থামতেই হয়।’’ তিনি আরও বলেছেন, ‘‘সিডনি আমার প্রিয় মাঠ। সেখানেই স্বেচ্ছায় মর্যাদার সঙ্গে ক্রিকেটকে বিদায় জানাতে পারছি। তাই বেশ ভাল লাগছে।’’ উল্লেখ্য, সিডনিতেই টেস্ট এবং আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে অভিষেক হয় খোয়াজার।
অবসর ঘোষণার সময় বর্ণবিদ্বেষের শিকার হওয়া নিয়েও মুখ খুলেছেন খোয়াজা। সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ডের ‘প্রেস সেন্টার’-এ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেছেন, ‘‘আমি পাকিস্তান থেকে আসা ভিন্ন বর্ণের এক জন মানুষ। আমার ধর্ম নিয়েও আমি গর্বিত। যাকে প্রথমেই বলা হয়েছিল, কখনও অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলতে পারবে না। অথচ এখন আমাকে দেখলে বুঝতে পারবেন, চেষ্টা করলে সকলেই এই জায়গায় পৌঁছোতে পারে।’’ প্রাক্তনদের সমালোচনা নিয়ে খোয়াজা বলেছেন, ‘‘সংবাদমাধ্যম এবং প্রাক্তনদের একাংশ যে ভাবে আমাকে আক্রমণ করেছিল, সেটা হয়তো আরও কিছু দিন সহ্য করতে পারতাম। কিন্তু পাঁচ দিন ধরে চলল ব্যাপারটা। আমার প্রস্তুতি নিয়েও নানা মন্তব্য করা হয়েছে। বলা হয়েছে, আমি দলের প্রতি দায়বদ্ধ নই। শুধু নিজের কথা ভেবে ক্রিকেট খেলি। কঠোর অনুশীলন করি না। গল্ফ খেলি। অলস। স্বার্থপর। এগুলো বর্ণবিদ্বেষী মন্তব্যের মতোই। একটা সময় ভাবতাম, এই সব বিষয়গুলোকে আমরা পিছনে ফেলে এসেছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এখনও আমাদের মধ্যে ওই রকম মানসিকতা খানিকটা রয়ে গিয়েছে। আমার আগে অস্ট্রেলিয়া দলের আর কোনও ক্রিকেটারকে এমন ধরনের আক্রমণ করা হয়নি।’’
ভারতের বিরুদ্ধে গত টেস্ট সিরিজ়ের আগেই অবসর নেওয়ার কথা ভেবেছিলেন খোয়াজা। তা নিয়ে বলেছেন, ‘‘বেশ কিছু দিন ধরে আমার সমালোচনা হচ্ছে। তা নিয়ে কোচ অ্যান্ড্রু ম্যাকডোনাল্ডের সঙ্গে কথাও বলেছিলেন। খোয়াজা তা নিয়ে বলেছেন, ‘‘কোচকে বলেছিলাম, যখন মনে হবে অবসর নেওয়া উচিত, তখনই জানিয়ে দেব। কোনও কিছু আঁকড়ে থাকতে চাই না। এটা আমার খুব বিরক্তিকর লাগে। আমার মনে হচ্ছিল, খেলা চালিয়ে যাওয়ার জন্যই নানা আক্রমণের শিকার হচ্ছি। আমাকে স্বার্থপর বলা হচ্ছে। কিন্তু আমি কখনও নিজের কথা ভেবে খেলিনি। আমার অবসরের ভাবনার কথা শুনে কোচ সরাসরি ‘না’ বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, শ্রীলঙ্কা সফর এবং বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে আমাকে দরকার। খেলা চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। তাই এখনও খেলছি।’’
বেশ কিছু দিন ধরেই খোয়াজাকে নিয়ে বিতর্ক চলছিল। অ্যাশেজ় সিরিজ় শুরুর আগে গল্ফ খেলতে গিয়ে পিঠে চোট পেয়েছিলেন খোয়াজা। সে কারণে পার্থে ওপেন করতে পারেননি। সে জন্য সমালোচিত হন। তা ছাড়া অ্যাশেজের তিন টেস্টের পাঁচ ইনিংসে করেছেন ১৫৩ রান। পিঠের চোট নিয়ে বেশ কিছু দিন ধরেই ভুগছেন। অ্যাশেজ়ের তৃতীয় টেস্টের প্রাথমিক দলেও ছিলেন না খোয়াজা। স্টিভ স্মিথ অসুস্থ হয়ে পড়ায় অ্যাডিলেডে খেলার সুযোগ পান।
২০১১ সালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধেই টেস্ট অভিষেক হয়েছিল খোয়াজার। এখনও পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৮৭টি টেস্ট খেলে ৪৩.৩৯ গড়ে খোয়াজা করেছেন ৬২০৬ রান। ১৬টি শতরান এবং ২৮টি অর্ধশতরান রয়েছে তাঁর। সর্বোচ্চ ২৩২। এ ছাড়াও অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৪০টি এক দিনের ম্যাচে ১৫৫৪ রান এবং ন’টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ২৪১ রান করেছেন। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নিলেও কুইন্সল্যান্ডের হয়ে শেফিল্ড শিল্ডে খেলবেন বলে জানিয়েছেন। ব্রিসবেন হিটের হয়ে বিগ ব্যাশ লিগেও খেলবেন খোয়াজা।
ছোট বয়সে বাবা-মা’র সঙ্গে ইসলামাবাদ থেকে অস্ট্রেলিয়ায় যান খোয়াজা। একসময় তিনিই ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে একমাত্র এশীয় ক্রিকেটার।