(বাঁ দিকে) রোহিত শর্মা ও রবীন্দ্র জাডেজা (ডান দিকে)। —ফাইল চিত্র।
“এই হারের জ্বালা সহজে কমবে না।” রবিবার খেলা শেষে বললেন আকাশ চোপড়া। একমত ইরফান পঠানও। নিউ জ়িল্যান্ডের কাছে এ বার ঘরের মাঠে এক দিনের সিরিজ়ও হারল ভারত। কিন্তু তার থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হল, হারের পরেই প্রশ্ন উঠে গিয়েছে দুই তারকার এক দিনের ক্রিকেটের ভবিষ্যৎ নিয়ে। রোহিত শর্মা ও রবীন্দ্র জাডেজা। আবার কি সেই নিউ জ়িল্যান্ডের জন্যই কেরিয়ার শেষ হয়ে যাবে দুই সিনিয়র ক্রিকেটারের?
দেড় বছরের মধ্যে এই নিয়ে ভারতে এসে দু’বার তাদের লজ্জায় ফেলেছে নিউ জ়িল্যান্ড। ২০২৪ সালে টম লাথামের দল তিন টেস্টের সিরিজ়ে চুনকাম করেছিল ভারতকে। তার পরেই বদলের আলোচনা শুরু হয়েছিল। রোহিত, বিরাট কোহলি ও রবিচন্দ্রন অশ্বিনের অবসরের জল্পনা শুরু হয়েছিল। কয়েক মাসের মধ্যে লাল বলের ক্রিকেট থেকে অবসরও নেন তাঁরা। অস্ট্রেলিয়া সিরিজ়ের মাঝে অশ্বিন এবং সিরিজ়ের পর রোহিত-কোহলি অবসর নিলেও কিউয়িদের কাছে হারের ধাক্কাই যে তাঁদের সেই সিদ্ধান্তের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় কারণ তা বলাই বাহুল্য।
১৪ মাস পর নিউ জ়িল্যান্ডের কাছে এক দিনের সিরিজ়ে হারের পর এ বার ৫০ ওভারের ক্রিকেটেও বদলের আলোচনা শুরু হয়েছে। মাইকেল ব্রেসওয়েল যে দল নিয়ে এসেছিলেন তাকে চোখ বন্ধ করে নিউ জ়িল্যান্ডের ‘বি’ দল বলা যেতে পারে। সেই দলের কাছেও হেরেছে ভারত। ফলে অস্বস্তি শুরু হয়েছে দলের অন্দরে। প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হচ্ছেন গৌতম গম্ভীর, অজিত আগরকরেরা। কিন্তু অতীতেও দেখা গিয়েছে, হারের দায় পড়ে দলের ক্রিকেটারদের উপর (বলা ভাল সিনিয়রদের উপর)। এ বারও হয়তো তার ব্যতিক্রম হবে না।
ইতিমধ্যেই ফিসফাস শুরু হয়েছে, এ বার কে? ভারত আবার ছ’মাস পর এক দিনের ক্রিকেট খেলবে। অর্থাৎ, মাঝে লম্বা বিরতি রয়েছে। ছ’মাস পর থেকে শুরু হয়ে যাবে ২০২৭ সালের এক দিনের বিশ্বকাপের প্রস্তুতি। তাই যদি কোনও বদল প্রয়োজন হয়, তা হলে তা এই সময়ের মধ্যেই হবে। সেই সিনিয়র ক্রিকেটারদের উপরেই পড়েছে আলো। কে কেমন খেললেন, কার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত তা নিয়ে জোর আলোচনা চলছে।
এক দিনের ক্রিকেটে অবশ্য কোহলির মাথায় খাঁড়া ধরার সুযোগ নেই। দক্ষিণ আফ্রিকা ও নিউ জ়িল্যান্ড, পর পর দুই সিরিজ়ে ভারতের সেরা ব্যাটার তিনি। দুই সিরিজ়ে ছয় ম্যাচে তিনটি শতরান ও দু’টি অর্ধশতরান করেছেন। খেলার ধরন বদলে ফেলেছেন তিনি। তাঁকে কোহলি ২.০ বলা যেতে পারে। এই ফর্মের কোহলিকে নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোনও জায়গা নেই। খুব অঘটন না ঘটলে ২০২৭ সালের বিশ্বকাপের দলে নিজের জায়গা তিনি প্রায় পাকা করে ফেলেছেন।
রোহিত এই সিরিজ়ে ব্যর্থ হলেও এর আগে অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে ভাল খেলেছেন। তাই আগের দুই সিরিজ় বিবেচনা করে রোহিতের এই ব্যর্থতাকে সাময়িক ধরে নেওয়া যেতে পারে। আরও অন্তত এক-দু’টি সিরিজ়ে সুযোগ পাবেন তিনি।
যাঁর এক দিনের কেরিয়ার নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠছে তিনি হলেন জাডেজা। আকাশ বলছেন, “জাডেজাই সবচেয়ে চিন্তার জায়গা। ও পারছে না। দেখে মনে হচ্ছে, ওর মধ্যে আর ক্রিকেট নেই। এই হার ওকে সবচেয়ে সমস্যায় ফেলবে।” ইতিমধ্যেই অনেকে বলতে শুরু করেছেন, এক দিনের ক্রিকেটে নিজের শেষ ম্যাচ খেলে ফেলেছেন জাডেজা।
ভারতের এই দলে ৩৬ বছর বা তার বেশি বয়সি তিন জন ক্রিকেটারই রয়েছেন। রোহিত, কোহলি ও জাডেজা। পরের বার বিশ্বকাপের সময় তাঁদের বয়স আরও বাড়বে। তাই আতশকাচ তাঁদের উপরেই থাকছে।
সিরিজ়ের তিন ম্যাচ মিলিয়ে মাত্র ৪১ রান করেছেন জাডেজা। তৃতীয় ম্যাচে কোহলির সঙ্গে জুটি গড়ে দলকে জয়ের পথে নিয়ে যেতে পারতেন তিনি। কিন্তু তিনি যে ভাবে আউট হয়েছেন, তাতে মনে হয়েছে, মাথা কাজ করছিল না তাঁর। জাডেজার তুলনায় হর্ষিত রানা ব্যাট হাতে অনেক বেশি ভরসা দিয়েছেন। পাশাপাশি তিন ম্যাচে একটিও উইকেট পাননি জাডেজা। ২০১৭ সালের পর প্রথম বার পর পর তিনটি এক দিনের ম্যাচে তাঁর উইকেটের খাতা খোলেনি।
যে বিষয়ে জাডেজার দিকে কোনও দিন আঙুল তোলা যেত না, তাঁর সেই ফিল্ডিং নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। দ্বিতীয় ম্যাচে পায়ের ফাঁক দিয়ে বল গলিয়েছেন। তৃতীয় ম্যাচে ক্যাচ ফস্কেছেন। বলের গতি বুঝতে পারেননি তিনি। এই সব বিষয় তাঁর বিরুদ্ধে যাচ্ছে। পিছনেই রয়েছেন অক্ষর পটেল, ওয়াশিংটন সুন্দরের মতো অলরাউন্ডার। তাঁরা জাডেজার জায়গা ভরাট করার জন্য তৈরি। ফলে নির্বাচকদের কাছে বিকল্পও রয়েছে। এমনিতেই টেস্ট থেকে অবসর নিয়েছেন জাডেজা। এ বার হয়তো তাঁর এক দিনের আন্তর্জাতিক কেরিয়ারও শেষের পথে।
প্রশ্ন উঠছে আরও এক জনকে নিয়ে। গৌতম গম্ভীর। অবশ্য ভারতের প্রধান কোচ হওয়ার পর থেকেই তা চলছে। টেস্টে তাঁর পারফরম্যান্স খুব খারাপ। চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ছাড়া এক দিনের ক্রিকেটে সাফল্য খুব বেশি নেই। একমাত্র টি-টোয়েন্টিতে দাপট দেখিয়েছে তাঁর দল। ইনদওরে ডাগ আউটে বসে থাকা গম্ভীরকে যথেষ্ট হতাশ দেখিয়েছে। বার বার নির্দেশ পাঠিয়েছেন তিনি। বোঝা যাচ্ছিল, খেলা দেখে খুশি হতে পারছেন না ভারতের প্রধান কোচ। ফলে পরের এক দিনের সিরিজ়ের আগে বড় সিদ্ধান্ত তিনি নিতেই পারেন। সেটা যে অসম্ভব নয়, তা এর আগে টেস্টেই দেখিয়েছেন গম্ভীর।
গম্ভীরের কেরিয়ারে অবশ্য একটি রক্ষাকবচ রয়েছে। তা হল বোর্ডের চুক্তি। গত মাসেই বোর্ড সচিব দেবজিৎ শইকীয়া বলেছেন, ২০২৭ সালের এক দিনের বিশ্বকাপ পর্যন্ত গম্ভীরের চুক্তি রয়েছে। তার আগে তাড়াহুড়ো করতে চাইছেন না তাঁরা। গম্ভীরকে সময় দিতে চাইছেন। সামনের মাসেই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ রয়েছে। দেশের মাটিতে সেখানে দলকে চ্যাম্পিয়ন করতে পারলে দ্বিতীয় আইসিসি ট্রফি জিতবেন গম্ভীর। সেটা হলে তাঁর ব্যর্থতা নিয়ে সব প্রশ্ন, সমালোচনা হয়তো বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু জাডেজাকে নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে। নিশ্চিন্ত হতে পারবেন না রোহিতও।