IPL 2026

দু’ম্যাচেই পড়ল ১৬ ক্যাচ! নতুন রোগ ছড়াচ্ছে আইপিএলে, কেন পড়ছে এত ক্যাচ, কারণ খুঁজল আনন্দবাজার ডট কম

বাদ যাচ্ছে না কোনও দল। পাল্লা দিয়ে ক্যাচ ফস্কাচ্ছে সকলে। যেন প্রতিযোগিতা চলছে। এ বলে আমায় দেখ। ও বলে আমায়। এ বারের আইপিএলে ভাইরাসের মতো ছড়াচ্ছে ক্যাচ ফস্কানোর রোগ।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ২৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৯:২২
cricket

করুণ নায়ারের ক্যাচ ফস্কানোর সেই মুহূর্ত। ছবি: পিটিআই।

কমলা টুপি ও বেগনি টুপির পাশাপাশি আইপিএলে আরও একটি টুপি থাকা উচিত। লাল, নীল, সাদা যে কোনও রঙের তা হতে পারে। ক্যাচ ফস্কানোর জন্য দেওয়া হবে সেই টুপি। যিনি সবচেয়ে বেশি ক্যাচ ফস্কাবেন, তিনি সেই টুপি পরবেন। তাতেও কিন্তু ভাল প্রতিযোগিতা হবে। অন্তত এ বারের আইপিএলের ধারা সেটাই।

Advertisement

বাদ যাচ্ছে না কোনও দল। পাল্লা দিয়ে ক্যাচ ফস্কাচ্ছে সকলে। যেন প্রতিযোগিতা চলছে। এ বলে আমায় দেখ। ও বলে আমায়। এ বারের আইপিএলে ভাইরাসের মতো ছড়াচ্ছে ক্যাচ ফস্কানোর রোগ। শুধু শনিবারের দুই ম্যাচে পড়েছে ১৬টি ক্যাচ। তার প্রভাব পড়েছে ম্যাচের ফলেও। ব্যাটারের শতরান থেকে শুরু করে ম্যাচ হারা, সবই সেই ক্যাচ ফস্কানোর ফসল।

পঞ্জাব-দিল্লি ম্যাচে পড়েছে ৮ ক্যাচ

দিল্লির ইনিংসে তৃতীয় ওভারের দ্বিতীয় বলে মিড উইকেটে লোকেশ রাহুলের লোপ্পা ক্যাচ ছাড়েন শশাঙ্ক সিংহ। দশম ওভারের দ্বিতীয় বলে বিজয়কুমার বৈশাখ নিজের বলেই ছাড়েন রাহুলের ক্যাচ। রাহুল শেষ পর্যন্ত ৬৭ বলে অপরাজিত ১৫২ রান করেন। আইপিএলের ইতিহাসে কোনও ভারতীয় ব্যাটারের করা সর্বাধিক রান। সব মিলিয়ে তৃতীয় সর্বাধিক।

শুধু রাহুলের ক্যাচ পড়েছে তা নয়, অপর প্রান্তে থাকা নীতীশ রানার ক্যাচও পড়েছে। ১৭তম ওভারের শেষ বলে তাঁর ক্যাচ ধরতে গিয়ে বাউন্ডারির দড়িতে পা লেগে যায় মার্কাস স্টোইনিসের। ৪৪ বলে ৯১ রান করেন নীতীশ। দু’জনের ব্যাটে ২৬৪ রান করে দিল্লি।

ক্যাচ ফস্কানোর লড়াইয়ে পঞ্জাবকে অবশ্য টেক্কা দিয়েছে দিল্লি। পঞ্জাবের তিনটি ক্যাচের বদলে দিল্লির পাঁচটি ক্যাচ পড়েছে। দ্বিতীয় ওভারের তৃতীয় বলে প্রভসিমরন সিংহের ক্যাচ ছাড়েন আকিব নবি। পরের ওভারের তৃতীয় বলে প্রিয়াংশ আর্যর ক্যাচ ধরতে গিয়ে বাজে চোট পান লুঙ্গি এনগিডি। নবম ওভারের প্রথম বলে মুকেশ কুমার একটি ক্যাচ ধরেন বটে, কিন্তু তাঁর পা বাউন্ডারির দড়িতে লেগে যায়।

তখনও চমকের বাকি ছিল। ১৫তম ওভারের শেষ বলে শ্রেয়স আয়ারের লোপ্পা ক্যাচ ছাড়েন করুণ নায়ারের। লং অফ দাঁড়িয়ে ক্যাচ ছাড়ায় তাঁকে লং অনে পাঠিয়ে দেন অধিনায়ক অক্ষর পটেল। পরের ওভারের দ্বিতীয় বলে সেখানেই ক্যাচ তোলেন শ্রেয়স। আবার ক্যাচ ছাড়েন করুণ।

তিন ব্যাটারের ক্যাচ ফস্কে ম্যাচ হারের দিল্লি। প্রিয়াংশ ১৭ বলে ৪৩, প্রভসিমরন ২৬ বলে ৭৬ ও শ্রেয়স ৩৬ বলে অপরাজিত ৭১ রানের ইনিংস খেলে আইপিএলের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি রান তাড়া করে জেতার রেকর্ড করেন।

ম্যাচ হারের জন্য ক্যাচকে দায়ী করেছেন অক্ষর। তিনি বলেন, “এত ক্যাচ ফস্কালে কী ভাবে ম্যাচ জিতব? আমরা অনেক ভুল করেছি। পাটা উইকেট ছিল। সেখানে তো বোলারদের সাহায্য করতে হবে। জঘন্য ফিল্ডিং হয়েছে। এত ক্যাচ পড়েছে। নিজেদের দোষে হেরেছি। কাউকে কিচ্ছু বলার নেই।”

cricket

শশাঙ্ক সিংহের ক্য়াচ ছাড়ার মুহূর্ত। ছবি: আইপিএল।

রাজস্থান-হায়দরাবাদ ম্যাচেও ৮ ক্যাচ মিস্‌

শনিবার সন্ধ্যার ম্যাচেও দেখা গিয়েছে একই রোগ। রাজস্থান রয়্যালসের ইনিংসে পঞ্চম ওভারের প্রথম বলে বৈভব সূর্যবংশীর ক্যাচ ফস্কান অনিকেত বর্মা। ষষ্ঠ ওভারের শেষ বলে ধ্রুব জুরেলের ক্যাচ ছাড়েন সাকিব হুসেন। নবম ওভারের পঞ্চম বলে আবার জুরেলের ক্যাচ ছাড়েন সাকিব। ১৬তম ওভারের দ্বিতীয় বলে রিয়ান পরাগের ক্যাচ ফস্কান প্রফুল্ল হিঙ্গে। বৈভব ৩৭ বলে ১০৩ রান করে। জুরেল করেন ৩৫ বলে ৫১ রান। দু’জনের ব্যাটে ২২৮ রান করে রাজস্থান।

হায়দরাবাদের ফিল্ডারদের সঙ্গে লড়াই করেছেন রাজস্থানের ফিল্ডারের। প্রথম বলেই ট্রেভিস হেডের ক্যাচ ছাড়েন জুরেল। চতুর্থ ওভারের দ্বিতীয় বলে অভিষেক শর্মার মারা বল দেখতেই পাননি শিমরন হেটমায়ার। বল ধরার চেষ্টাও করেননি তিনি। পঞ্চম ওভারের ষষ্ঠ বলে অভিষেকের সহজ ক্যাচ ছাড়েন রবীন্দ্র জাডেজা। তাঁর মতো ফিল্ডারের কাছে এই মিস্‌ দেখা যায় না। ১৫তম ওভারের প্রথম বলে নীতীশ কুমার রেড্ডির ক্যাচ ফস্কান ব্রিজেশ শর্মা।

মিসের খেসারত দিতে হয় রাজস্থানকে। অভিষেক ২৯ বলে ৫৭, ক্লাসেন ২৪ বলে ২৯ ও নীতীশ ১৮ বলে ৩৬ রান করে হায়দরাবাদকে জিতিয়ে দেন।

অর্থাৎ, শনিবারের দু’টি শতরানই হয়েছে ক্যাচ ফস্কানোর জন্য। আবার দিল্লি ও রাজস্থানের হারের নেপথ্যেও রয়েছে ক্যাচ মিস্‌।

রবিবারও সেই ছবি দেখা গিয়েছে। চেন্নাইয়ের রুতুরাজ গায়কোয়াড়ের ক্যাচ ধরতে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছেন গুজরাত টাইটান্সের দুই ফিল্ডার রশিদ খান ও সাই সুদর্শন। বল তাঁদের মাঝে পড়ে। যে কেউ ধরতে পারতেন। কিন্তু দু’জনেই ভাবেন অপর জন ধরবেন। ক্যাচ পড়ার পর একে অপরকে দোষ দেওয়া ছাড়া কিচ্ছু করেননি তাঁরা। পরে গুজরাতের শুভমন গিলের ক্যাচ ফস্কেছেন চেন্নাইয়ের আকিল হোসেন। ক্যাচ ধরতে গিয়ে চোটও পান তিনি।

আইপিএল জুড়ে একই ছবি

শুধু শনি বা রবিবারের ম্যাচ নয়, গোটা আইপিএল জুড়ে এই ছবি দেখা যাচ্ছে। চেন্নাই ও গুজরাতের বিরুদ্ধে বিরাট কোহলির সহজ ক্যাচ পড়েছে। সেই কোহলির ব্যাটেই গুজরাতকে হারিয়েছে বেঙ্গালুরু। কেকেআর, মুম্বই সব দল ক্যাচ ফস্কেছে। উল্লেখ্য, সাধারণত যাদের হাত থেকে ক্যাচ পড়ে না, সেই জাডেজা, রিঙ্কু সিংহ, গ্লেন ফিলিপ্সেরাও ক্যাচ ফস্কেছেন। এই ছবিটাই ভয় ধরাচ্ছে। আবার রিঙ্কুর লোপ্পা ক্যাচ ফেলায় ভুগেছে রাজস্থান। রিঙ্কুর ব্যাটে মরসুমে নিজেদের প্রথম জয় পেয়েছে কেকেআর।

শীর্ষে শশাঙ্ক, করুণ

তবে সকলকে ছাপিয়ে গিয়েছেন শশাঙ্ক ও করুণ। এ বারের আইপিএলে শশাঙ্কের দিকে পাঁচটি ক্যাচ এসেছিল। চারটি ফস্কেছেন তিনি। যেটি ফস্কাননি, সেটি ধরার চেষ্টাই করেননি। অথচ, বল তাঁর থেকে খুব একটা দূরে ছিল না। একই অবস্থা করুণের। তিনটি ক্যাচের মধ্যে দু’টি ফস্কেছেন তিনি। সমাজমাধ্যমে এই দুই ক্রিকেটারকে নিয়ে মজার মিম হচ্ছে। তাঁদের পুরস্কার দেওয়ার দাবি তুলেছেন কেউ। আবার কেউ তাঁদের টাকা কেটে নিতে বলেছেন।

আইপিএলে ক্যাচ ফস্কানোর সংখ্যা বাড়ছে

২০২০ সাল পর্যন্ত আইপিএলে প্রতি ১০০ ক্যাচের মধ্যে ৮৫টি ধরতেন ফিল্ডারেরা। কিন্তু ২০২১-২০২৫ সাল পর্যন্ত তা কমে হয়েছে ৭৬। অর্থাৎ, প্রতি ১০০ ক্যাচে ২৪টি পড়ছে। এ বার সংখ্যাটা আরও কমবে। অর্থাৎ, আলো বা দর্শকের জন্য বল দেখতে না পাওয়া অজুহাত। ক্যাচ মিস্‌ একটা ধারায় পরিণত হয়েছে। খুব খারাপ একটা ধারা।

অজুহাত চহলের

শনিবার পঞ্জাব-দিল্লি ম্যাচের পর সাংবাদিক বৈঠকে চহল বলেন, “ক্যাচ ধরতে পারব না ভেবে তো কেউ মাঠে নামে না। এটা হয়ে যায়। ক্যাচ মিস্‌ খেলারই একটা অঙ্গ। ম্যাচে এটা হতেই পারে।” খুব ভাল অজুহাত দিয়েছেন চহল। কিন্তু মুম্বই ইন্ডিয়ান্সের বিরুদ্ধে হার্দিক পাণ্ড্যের ক্যাচ ধরতে গিয়ে তিনি যা করেছেন, তার কী ব্যাখ্যা দেবেন পঞ্জাবের ক্রিকেটার। ক্যাচ ধরার ঠিক আগেই চোখ বন্ধ করে ফেলেন চহল। চোখ বন্ধ করে কী ভাবে ক্যাচ ধরবেন তিনি? এই সাধারণ বিষয় কি তাঁর মাথায় আসেনি?

মনঃসংযোগের অভাব

ক্যাচ ধরার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনঃসংযোগ। শেষ পর্যন্ত বলের দিকে চোখ রাখা। ভাল ক্যাচ কি এ বারের আইপিএলে হয়নি? অবশ্যই হয়েছে। ফিল সল্ট, শ্রেয়স আয়ার, ধ্রুব জুরেলরা চোখ ধাঁধানো ক্যাচ ধরেছেন। তা হলে কেন এত ক্যাচ পড়েছে? ভারতের হয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ জেতা শ্রীবৎস গোস্বামীর মতে, মনঃসংযোগের অভাব দেখা যাচ্ছে। তিনি বলেন, “ফিল্ডারকে সব সময় তৈরি থাকতে হবে। ভাবতে হবে, প্রতিটা বল তাঁর দিকে আসবে। কিন্তু সেটা হচ্ছে না। অনেকে খেলা থেকে হারিয়ে যাচ্ছেন। ফলে যখন ক্যাচ আসছে, তখন সামলাতে পারছেন না। তার জন্যই অনেক লোপ্পা ক্যাচ পড়ছে।”

টানা খেলার ধকল

ক্যাচ ফস্কানোর জন্য অবশ্য সব দোষ শুধু ফিল্ডারদের দেওয়া যায় না। সূচিও তার জন্য দায়ী। টানা ম্যাচ খেলতে হচ্ছে। ২০২৪ সালে আইপিএল ও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মাঝে মাত্র এক সপ্তাহ সময় ছিল। এ বারও তাই। ৮ মার্চ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শেষ হয়েছে। এক সপ্তাহ পরেই সকলকে আইপিএলের প্রস্তুতি শুরু করে দিতে হয়েছে।

দু’মাস ধরে ৭০টি ম্যাচ খেলার ধকল। এক এক সময় দু’টি ম্যাচের মধ্যে দু’দিনও সময় থাকছে না। ফলে ক্রিকেটারেরা পর্যাপ্ত বিশ্রাম পাচ্ছেন না। এমনটাই মনে করেন মহম্মদ কাইফ। তাঁর ক্যাচের উদাহরণ এখনও দেওয়া হয়। নিজের সময় বিশ্বের অন্যতম সেরা ফিল্ডারের তকমা পাওয়া কাইফ নিজের ইউটিউব চ্যানেলে বলেন, “ফিল্ডিংয়ের অনুশীলনই তেমন হচ্ছে না। ফিল্ডিং অনেকটা প্রাতঃরাশের মতো। তাড়াতাড়ি সব কিছু করতে হয়। কিন্তু ক্রমাগত এক শহর থেকে অন্য শহরে যাওয়া, টানা ম্যাচ খেলার জন্য ক্রিকেটারেরা বিশ্রাম পাচ্ছে না। তাই অনুশীলনে গিয়ে ব্যাটিং বা বোলিংয়ের দিকেই নজর থাকছে। ফিল্ডিংয়ের জন্য বাড়তি সময় দেওয়া যাচ্ছে না। সেই কারণে আইপিএলে যত এগোবে, তত ক্যাচ পড়বে।”

কারণ যা-ই হোক না কেন, এত ক্যাচ পড়লে আইপিএলের মান কমছে। ক্রিকেটে বলা হয়, ক্যাচেস উইন ম্যাচেস। অর্থাৎ, ক্যাচ ধরলে ম্যাচ জেতা যায়। সেটাই দেখা যাচ্ছে না। সত্যিই ক্যাচ না ধরায় ম্যাচ হাতছাড়া হচ্ছে। আইপিএলে যতই বিনোদন থাকুক না কেন, এই ক্যাচ মিস্‌ ক্রিকেটের সৌন্দর্য শেষ করে দিচ্ছে। তাতে কিন্তু আখেরে ক্ষতি হচ্ছে ভারতীয় ক্রিকেটেরই।

Advertisement
আরও পড়ুন