ICC U19 World Cup 2026

ছোটদের বিশ্বকাপে দেশের বড় ভরসা বাঙালি অভিজ্ঞান, তবে পুত্রের ফাইনাল ম্যাচ দেখা হচ্ছে না বাবা অভিষেকের!

শুক্রবার অনূর্ধ্ব১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে যখন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারত খেলছে, তখন মুম্বইয়ে অফিস সামলাতে হচ্ছে টিসিএস-এর মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার অভিষেককে।

Advertisement
অনির্বাণ মজুমদার
শেষ আপডেট: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১৩:৪৪
India U19 cricket Abhigyan Kundu

অভিজ্ঞান কুন্ডু। —ফাইল চিত্র

পুত্র অনূর্ধ্ব ১৯ বিশ্বকাপে ভারতের অন্যতম বড় ভরসা। বৈভব সূর্যবংশী এবং বিহান মলহোত্রের পর ভারতীয় দলে পুত্রের রানই সবচেয়ে বেশি। তবু একটু হলেও মনখারাপ অভিষেক কুন্ডুর। কারণ, অভিজ্ঞানদের ফাইনাল ম্যাচই দেখা হচ্ছে না অভিষেকের।

Advertisement

শুক্রবার অনূর্ধ্ব১৯ বিশ্বকাপের ফাইনালে যখন ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভারত খেলছে, তখন মুম্বইয়ে অফিস সামলাতে হচ্ছে টিসিএস-এর মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার অভিষেককে। আন্দবাজার ডট কম-কে ফোনে অভিষেক বললেন, ‘‘কী আর করা যাবে! কাজের খুব চাপ। পর পর মিটিং রয়েছে। তবে আপডেটেড থাকছি। কাজের ফাঁকে ফাঁকে পারলে টেলিভিশনে চোখও রাখছি।’’

মন ছটফট করছে অভিষেকের। বলেই ফেললেন, ‘উফ্, খুব টেনশন হচ্ছে।’’

ছটফটে ছিল পুত্রও। প্রচণ্ড চঞ্চল ছেলেকে সামলাতেই ক্রিকেটে দিয়েছিলেন প্রবাসী বাঙালি অভিষেক। তিনি এবং স্ত্রী বিনীতা কিছুতেই সামলাতে পারতেন না ছোট্ট অভিজ্ঞানকে। বললেন, ‘‘ও একটা মিনিটও এক জায়গায় স্থির থাকত না। ঘরে থাকলে সারাদিন দৌড়ে বেড়াত। আর বাইরে গেলে ক্রিকেট। সকাল থেকে দুপুর পেরিয়ে কখন সন্ধ্যা হয়ে যেত, মনে থাকত না। চোখে ছিল না ঘুম।’’

বিনীতাও ইঞ্জিনিয়ার। কর্মরত বাবা-মা দেখেছিলেন, এই ছেলেকে কোনও ক্রিকেট কোচিং সেন্টারে পাঠিয়ে দিলেই ভাল। মিটিংয়ে ঢোকার তাড়ায় থাকা অভিষেক বললেন, ‘‘ছেলে যাতে সারাদিন ক্লান্ত হয়ে রাতে অন্তত শান্তিতে ঘুমোয়, সেই আশায় চেতন যাদব স্যরের ক্রিকেট অ্যাকাডেমিতে নিয়ে গিয়েছিলাম।’’ ওটাই শুরু। বাকিটা ইতিহাস, যার ভবিষ্যৎ নিয়ে আশায় অভিষেক।

Abhigyan Kundu with parents

মা বিনীতা, বাবা অভিষেক এবং বোন অভীকার সঙ্গে অভিজ্ঞান। ছবি: ফেসবুক

প্রশিক্ষক চেতনকে পাওয়াটা খানিকটা দুইয়ে-দুইয়ে চার হওয়ার মতো। চেতন এমন পরিবারের সন্তানদেরই কোচিং করান, যাদের বাবা-মায়েরা চাকরি করেন। তাঁর একটিই শর্ত। ছেলেদের খেলায় নাক গলানো যাবে না। অভিজ্ঞানের বাবা-মা সেটাই করেছেন।

সচিন তেন্ডুলকরের গুরু রমাকান্ত আচরেকরের ছাত্র চেতন। তাঁর কোচিংয়ের ধরনও আচরেকরের মতো। প্রতিদিন ৫০০০ বল খেলতে হয় সকলকে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অনুশীলন চলে। অভিজ্ঞানও তা-ই করেছেন। পাঁচ বছর বয়সে প্রথম অ্যাকাডেমিতে যান। সকাল ১০টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত অনুশীলন হত। তার পর ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফেরা অভিজ্ঞানকে শান্ত হয়ে ঘুমোতে দেখে স্বস্তি পেতেন মা-বাবাও।

অভিজ্ঞানের জন্ম মহারাষ্ট্রের ঔরঙ্গাবাদে। দাদু ইছাপুর রাইফেল ফ্যাক্টরিতে কাজ করতেন। পরে মহারাষ্ট্রে চলে যান। এই রাজ্যের সঙ্গে তার পর থেকে আর তেমন যোগাযোগ নেই। মাঝেমাঝে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে আসে কুন্ডু পরিবার। অভিষেক ঝরঝরে বাংলায় কথা বললেও জানালেন, অভিজ্ঞানের বাংলা ভাঙা। যেটুকু বলেন, ঠাকুরদা-ঠাকুমার সঙ্গে।

প্রথমে নবী মুম্বইয়ের স্কুলে পড়তেন অভিজ্ঞান। সেই স্কুলে খেলাধুলোর চর্চা থাকলেও ক্রিকেটের তেমন চল ছিল না। তাই ১১ বছরের অভিজ্ঞানকে মুম্বইয়ের অঞ্জুমান ই ইসলাম হাই স্কুলে ভর্তি করানো হয়। সঙ্গে চেতনের অ্যাকাডেমি, যেখানে শুরু হয় অভিজ্ঞানের আসল ‘পাঠ’।

Abhigyan Kundu with coach Chetan Yadav

কোচ চেতন যাদবের সঙ্গে অভিজ্ঞান। ছবি: সংগৃহীত

ছাত্র যে অক্লান্ত পরিশ্রম করতে পারে, চেতন বুঝে গিয়েছিলেন। পাশাপাশি এটাও বুঝেছিলেন, এই ছেলেকে শুধু ক্রিকেটের টেকনিক শেখালে হবে না। তার বাইরেও অনেক কিছু শেখাতে হবে। স্বচ্ছল পরিবারের সন্তান অভিজ্ঞানের যাপনে কোনও সমস্যা ছিল না। তাই চেতন সুযোগ পেলেই তাঁকে ট্রেনের অসংরক্ষিত কামরায় নিয়ে যেতেন। রাতে স্টেশনের মেঝেতেও ঘুমোতে হয়েছে অভিজ্ঞানকে। যেহেতু চেতন আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা ছেলেদের বিনা খরচে ক্রিকেট শেখান, তাদের সঙ্গে খেতে বসিয়ে দিতেন অভিজ্ঞানকে।

তার ফল হ্যারিস শিল্ডে স্কুলের হয়ে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স। তার পর মুম্বই ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশনের নজরে চলে আসা। সেখান থেকে বিজয় মার্চেন্ট ট্রফিতে দ্বিশতরান, বেঙ্গালুরুর জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমি হয়ে ভারতের ছোটদের বিশ্বকাপ দলে। ১৭ বছরের মধ্যে ১২৫ শতরানের মালিক সে। ব্রায়ান লারা এবং সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের ভক্ত বাঁহাতি অভিজ্ঞান উইকেটরক্ষকও। তাই লারা-সৌরভ ছাড়া তাঁর আইডল মহেন্দ্র সিংহ ধোনিও।

চেতনের অ্যাকাডেমিতে অভিজ্ঞানের সব পরিসংখ্যান রাখা আছে। পাতার পর পাতা কাগজ। সেখানে অভিজ্ঞানের প্রতিটি শতরান, অর্ধশতরানের হিসাব লেখা। শুধু তাঁর ব্যাটিংয়ের ফুটেজ রয়েছে ৬০০০ জিবি মেমরিতে। সেই ফুটেজ দেখিয়ে আজও কোচ তাঁকে বোঝান, কোথায় ভুল করেছেন তিনি। কোথায় তাঁকে আরও উন্নতি করতে হবে।

ছেলের খেলা নিয়ে কোনও দিন নাক না গলালেও অভিষেকের চিন্তা ছিল তাঁর পড়াশোনা নিয়ে। বললেন, ‘‘শুরুতে ওর এই ক্রিকেটের নেশা নিয়ে আমাদের একটু চিন্তা ছিল। দেখতাম, ওর বয়সিরা সকলে স্কুলে যাচ্ছে, আর ও খেলে বেড়াচ্ছে! তবে এখন আর চিন্তা নেই, আপত্তিও নেই।’’ বরং ছেলেও তাঁর মতো ইঞ্জিনিয়ার হোক, এই স্বপ্ন থেকে সরে এসে বাবা চাইছেন, ছেলে দেশের হয়ে খেলুক। আর আইপিএল, যেখানে টাকা-গ্ল্যামারের অনেক বড় হাতছানি? অভিষেক বললেন, ‘‘অবশ্যই চাই, ও সব খেলুক। কিন্তু আইপিএল পরে হবে। টাকা তো আমাদের কাছে কোনও দিনই বড় সমস্যা ছিল না।’’ কোচ আরও বড় লক্ষ্য স্থির করে দিয়েছেন অভিজ্ঞানের জন্য— সচিন তেন্ডুলকরের মতো ভারতের হয়ে খেলে ‘ভারতরত্ন’ পাক ছাত্র।

খেলা নিয়ে এত ব্যস্ততার মধ্যেও লেখাপড়ায় ফাঁকি দেননি অভিজ্ঞান। দশম শ্রেণির পরীক্ষায় পেয়েছেন ৮২ শতাংশ নম্বর। এখন বিজ্ঞান নিয়ে পড়ছেন তিনি। বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলে রবিবার সকালে দেশে ফেরার কথা অভিজ্ঞানের। দু’দিন পর মঙ্গলবার থেকে নতুন পরীক্ষায় বসতে হবে তাঁকে। সে দিন থেকে শুরু তাঁর দ্বাদশ শ্রেণির ফাইনাল পরীক্ষা!

Advertisement
আরও পড়ুন