সাংবাদিক বৈঠকে সূর্যকুমার যাদব। ছবি: সমাজমাধ্যম।
রোহিত শর্মার থেকে তিনি শিখেছেন অনেক কিছুই। তবে সবচেয়ে ভাল যেটা শিখেছেন, তা হল গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে সাংবাদিক বৈঠকে ফুরফুরে থাকা এবং সাংবাদিকদের সঙ্গে মজা করা। অধিনায়ক হিসাবে প্রথম বার টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে দলকে নেতৃত্ব দিতে নামার আগে তেমনই মেজাজে দেখা গেল সূর্যকুমার যাদবকে। তিনি সাফ জানালেন, বরুণ চক্রবর্তীর অফ ফর্ম, টস, শিশিরের প্রভাব, পিচ সব কিছু তাঁরা সামলে নেবেন।
শুরুতেই সূর্যকে মনে করিয়ে দেওয়া হয় মিচেল স্যান্টনারের কথা, যেখানে তিনি প্যাট কামিন্সের কায়দায় অহমদাবাদের এক লক্ষ দর্শককে চুপ করিয়ে দেওয়ার কথা বলেছেন। হাসতে হাসতে সূর্য বলেন, “সবাই দেখছি একই কথা বলছে। কিছু তো নতুন বলতে বলুন। দলের পরিবেশ খুব ভাল। ফাইনালে দলকে নেতৃত্ব দিতে পারা আমার কাছে বিশেষ সম্মানের। দেশের মাঠে একটা অসাধারণ স্টেডিয়ামে খেলতে নামব। খুবই ভাল লাগছে।”
এর পরেই আসে বরুণের প্রসঙ্গ। তিনি উইকেট নিলেও গত কয়েকটি ম্যাচে ভালই রান হজম করেছেন। সূর্যের গলায় বিন্দুমাত্র চিন্তা নেই। তিনি বললেন, “ওকে নিয়ে চিন্তিত হওয়ার মতো কিছু নেই। সকলের প্রয়াসেই তো কোনও দল ম্যাচ জেতে। জেতার পর আমরা ও সব নিয়ে ভাবি না। ক্রিকেটে উত্থান-পতন তো থাকবেই। ১১ জনই তো আর ম্যাচ জেতাতে পারে না। সবার দিন সমান যায় না। বাকিরা সেটা পূরণ করে দেয়। বরুণ নিজেও বিশেষ চিন্তিত নয়। ও বিশ্বের এক নম্বর বোলার। ভালই জানে কোন ম্যাচে কী ভাবে বল করতে হবে। নিশ্চিত ভাবেই ফাইনালে সেটা করবে।” প্রথম একাদশ নিয়ে প্রশ্ন করতে আবার মজা করে সূর্যের উত্তর, “দল কী হবে সেটা কাল দেখে নিন। সবই আজ জেনে নিলে কী করে হবে।”
উঠে আসে অফস্পিনারের প্রসঙ্গও। চলতি বিশ্বকাপে বিভিন্ন ম্যাচে ভারতের বাঁ হাতি ব্যাটারেরা অফস্পিনারদের সামনে উইকেট হারিয়েছেন। পরিসংখ্যান বলছে, ১৫টা উইকেট হারিয়েছে ভারত। নিউ জ়িল্যান্ড দলে চার জন অফস্পিনার। কী ভাবে সামলাবেন? সূর্যের উত্তর, “আমরা এটা নিয়ে কোনও আলোচনাই করিনি। ১২০ স্ট্রাইক রেট নিয়ে যদি ফাইনাল খেলতে নামি তা হলে এ ভাবেই খেলতে আমার আপত্তি নেই। আমরা আলোচনা করি ঠিকই। তবে খুব বেশি নজর দিই না। কোনও দিন কোনও ব্যাটার যদি ভাল ব্যাট করে, তা হলে সে সেই সুযোগটাই কাজে লাগানোর চেষ্টা করে যায়। আগের ম্যাচেই আপনারা দেখেছেন যে দুই বাঁ হাতি কী ভাবে অফস্পিনারদের সামলেছে। ঈশান খুবই ভাল ব্যাট করেছে। শিবম দুবে, তিলক বর্মাও ভাল খেলেছে। এই মুহূর্তে এত ভাবার দরকার নেই। ফাইনালে যখন উঠেছি তখন ভাল তো খেলতেই হবে। ফিরে তো আর আসতে পারব না। কাল সামলে নেব।”
স্যান্টনার জানিয়েছিলেন, তাঁরা ভারতকে ফাইনালে ২৫০-র মধ্যে আটকে রাখার চেষ্টা করবেন। সে প্রসঙ্গে সূর্যের উত্তর, “আমরা ভাল ব্যাট করার চেষ্টা করব। কত রান তুললে ভাল সেটা আগে থেকে বলা সম্ভব নয়। কখনও সখনও পিচের চরিত্র বুঝে খেলতে হয়। তাই যেমন পিচ সেটা ভেবেই খেলব।”
শিশিরের প্রসঙ্গ উঠতে আবার সূর্যের গলায় মশকরার সুর। এক সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেন, শিশিরের কথা মাথায় রেখে দুপুর ৩টেয় ম্যাচ রাখা উচিত ছিল কি না। হাসতে হাসতে সূর্য বলেন, “আমি যখন আইসিসি-তে যাব তখন এটা নিয়ে ভাবব। এখন তো আমাদের সন্ধ্যাতেই খেলতে হবে।” পরক্ষণেই তিনি সিরিয়াস। স্বীকার করে নিলেন, “কখনও সখনও বিকেলে খেলার প্রভাব থাকেই। তবে এ রকম পরিস্থিতিতে তো কিছু করার নেই। শিশির থাকলে আগে ব্যাট করা বাড়তি সুবিধার। বল করার সময় কিছু করার নেই। তাই দেশের কথা ভেবে খেলতে হবে।”
এই দলে এমন অনেকেই রয়েছেন যাঁরা ফাইনালের মতো বড় মঞ্চে প্রথম বার খেলতে নামছেন। তবে আইপিএল বা অন্যান্য প্রতিযোগিতায় খেলার সুবাদে তাঁদের মধ্যে চাপ নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি হয়ে গিয়েছে বলেই মনে করেন সূর্য। তাঁর কথায়, “চাপ সামলানো নির্ভর করে কঠিন পরিস্থিতিতে আপনি কতটা শান্ত থাকছেন তার উপর। আপনি যদি অনুশীলনে নিজের উপর বাড়তি চাপ দিতে পারেন, যেমন ফিল্ডিংয়ে নিজের সেরাটা দেওয়া বা ব্যাটিংয়ের সময় কোনও পরিস্থিতির কথা মাথায় রাখা, তা হলে ম্যাচে নামলে বিষয়টা অনেক সহজ হয়ে যায়। আপনি বুঝে যান এই কাজগুলো আগেই করে এসেছেন। তা ছাড়া আমাদের দলটা পরিবারের মতো। যে কেউ যে কারও কাছে গিয়ে কথা বলতে পারে। সাপোর্ট স্টাফেরাও এ রকম পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে গিয়েছেন। ফলে একে অপরের সঙ্গে কথা বললেও অনেক উপকার হয়।”
ফাইনাল জিততে অভিজ্ঞতার দরকার বলে মনে করেন সূর্য। তাঁর দলে অভিজ্ঞ ক্রিকেটারেরা থাকায় বাড়তি সুবিধা হবে বলে মনে করছেন তিনি। সূর্যের কথায়, “আমাদের দলে এমন অনেক ক্রিকেটার রয়েছে যারা ফাইনাল খেলেছে। তারা ইতিমধ্যেই অনেক অভিজ্ঞ। আমাদের কোচও একটা ফাইনাল খেলেছেন। বুমরাহ, হার্দিক, অক্ষরের মতো ক্রিকেটারেরা আইসিসি প্রতিযোগিতার ফাইনাল। তাই ওদের সঙ্গে কথা বলে অনেক উপকার হয়। বাসে যেতে যেতে বা নৈশভোজের সময় আমরা সেটাই আলোচনা করি। তাতে অনেক দিক উঠে আসে। এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অভিজ্ঞতার দাম তো আছেই।”
গত দু’বছর ধরে ভারতের অধিনায়ক সূর্য। এই সময়ে কোনও ক্রিকেটারই সূর্যের নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। বরং প্রশংসাই করেছেন বার বার। সূর্যের মতে, তিনি দলের ‘বড় ভাই’ হয়ে উঠতে চাননি। তাই সাফল্য পেয়েছেন। ভারত অধিনায়কের কথায়, “বড় ভাই বা বাবা হয়ে কিছুই হবে না। ওদের কখনওই কান মুলে কোনও কাজ করানো যাবে না। স্বাধীনতা দিতে হবে। এমন নয় ওদের সঙ্গে কথাবার্তা হয় না। তবে আমার মন্ত্র হল, সকলকে স্বাধীনতা দাও। আমি ওদের বলি, যে ভাবে সফল হয়েছো সেই কাজই করো। ঘরোয়া ক্রিকেট বা আইপিএলে যে ভাবে সাফল্য পেয়েছে, সেটাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দেখানোর অনুরোধ করি। ভারতের জার্সি পরলে এমনিতেই আলাদা আবেগ কাজ করে। তাই সতীর্থদের আলাদা কিছু বলার দরকারই পড়ে না।”