ICC T20 World Cup 2026

দুই ভারতীয় বিশ্বকাপে ছুটি করে দিলেন অস্ট্রেলিয়ার! রাঠৌর-শ্রীধরই তৈরি করেছেন অসিদের হারিয়ে দেওয়া নতুন নিসঙ্ককে

শ্রীলঙ্কার জাতীয় দলের স্থায়ী দায়িত্ব পাওয়ার পর ওযুধের ব্যবস্থা করেছিলেন সনৎ জয়সূর্য। দাসুন শনাকার দলের জন্য তাঁর ওষুধের নাম ছিল বিক্রম রাঠৌর এবং রামকৃষ্ণণ শ্রীধর। ভারতের দুই কোচ বদলে দিয়েছেন শ্রীলঙ্কাকে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৮:৫৭
picture of cricket

(বাঁ দিক থেকে) বিক্রম রাঠৌর, পাথুম নিসঙ্ক এবং আর শ্রীধর। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

অস্ট্রেলিয়ার ব্যর্থতায় ভেসে উঠল দুই ভারতীয় কোচের নাম। না কি, শ্রীলঙ্কার পাথুম নিসঙ্কের ম্যাচ জেতানো পারফরম্যান্স প্রচারের আলো ফেলল বিক্রম রাঠৌর এবং রামকৃষ্ণণ শ্রীধরের উপর?

Advertisement

দু’ভাবেই দেখা যেতে পারে। একই মুদ্রার দুই পিঠ। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটের জন্য লড়ে যাচ্ছেন ভারতীয় দলের প্রাক্তন দুই সহকারী কোচ। গত কয়েক বছরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বলার মতো সাফল্য নেই শ্রীলঙ্কার। ২০১৪ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জয়ের পর কোনও আইসিসি প্রতিযোগিতার ফাইনালেও উঠতে পারেনি ভারত মহাসাগরের দ্বীপরাষ্ট্র। অথচ এই শ্রীলঙ্কা আইসিসির তিনটি বড় প্রতিযোগিতাই চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এক দিনের বিশ্বকাপ, চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি এবং টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতেছে।

দলীপ মেন্ডিস, অর্জুন রণতুঙ্গা, অরবিন্দ ডি’সিলভা, মুথাইয়া মুরলিথরন, সনৎ জয়সূর্যদের দেশ ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছিল। এশীয় ক্রিকেটেও। দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রভাব পড়তে শুরু করেছিল ক্রিকেটে। শ্রীলঙ্কার প্রথম বিশ্বজয়ী অধিনায়ক রণতুঙ্গা দেশের ক্রীড়ামন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েও হাল ফেরাতে পারেননি। সেই রণতুঙ্গা, যাঁর দলকে সমীহ করত অস্ট্রেলিয়াও। সৌরভ গঙ্গোপাধ্যায়ের অনেক আগে তিনি দেখিয়ে দিয়েছিলেন অস্ট্রেলীয়দের চোখে চোখ রেখে ক্রিকেট খেলা যায়। সাফল্য পাওয়া যায়। ২২ গজের মাপ সকলের জন্য সমান।

এশিয়ার ‘ওয়েস্ট ইন্ডিজ়’ হয়ে যাওয়া দলের হাল ফেরাতে শ্রীলঙ্কার ক্রিকেট কর্তারা দেশ-বিদেশের অনেক কোচকে দায়িত্ব দিয়েছেন। ফল দিতে পারেননি কেউ। জয়সূর্য অস্থায়ী কোচ হিসাবে তেমন কিছু করতে পারেননি। রোগ ধরলেও বিশেষ কিছু করার ছিল না তাঁর। ক্ষমতা ছিল সীমিত। স্থায়ী দায়িত্ব পাওয়ার পর ওষুধের ব্যবস্থা করেন।

ওষুধের নাম রাঠৌর এবং শ্রীধর। দু’জনেরই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কোচিং করানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে। রাহুল দ্রাবিড় কোচ থাকার সময় ভারতীয় দলের ব্যাটিং কোচ ছিলেন রাঠোর। ভারতীয় দলের প্রাক্তন ব্যাটার ২০২৪ সালে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী দলের সঙ্গে ছিলেন। একাধিক রঞ্জি এবং আইপিএল দলের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।

অন্য দিকে, হায়দরাবাদের প্রাক্তন বাঁহাতি স্পিনার শ্রীধর সফল ফিল্ডিং কোচ। ২০০১ সাল থেকে কোচিং করাচ্ছেন। ভারতের জাতীয় ক্রিকেট অ্যাকাডেমির দায়িত্ব সামলেছেন। পর্যায় ক্রমে তাঁর উত্থান হয়েছে। প্রতিটি পর্বে সাফল্য পেয়েছেন। ২০১৪ থেকে ২০২১ পর্যন্ত ছিলেন ভারতীয় দলের ফিল্ডিং কোচ। অস্ট্রেলিয়ায় কাজ করেছেন। আফগানিস্তানের জাতীয় দলের সঙ্গে কাজ করেছেন। একাধিক রঞ্জি এবং আইপিএল দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। রবি শাস্ত্রী ভারতের কোচ থাকার সময় ফিল্ডিংয়ের সার্বিক উন্নতির কারিগর ছিলেন এই শ্রীধরই।

রাঠৌর এবং শ্রীধর প্রচারের আড়ালে থেকে কাজ করতে পছন্দ করেন। হেড কোচ যেমন চান, ঠিক তেমন ভাবে দলকে তৈরি করার চেষ্টা করেন। ব্যক্তিত্বের সংঘাতে জড়ান না। সামনে এসে কৃতিত্ব দাবি করেন না। সম্ভবত সে কারণেই অভিজ্ঞ জয়সূর্য শ্রীলঙ্কার জাতীয় দলের জন্য বেছে নেন এই দু’জনকে।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রস্তুতি কয়েক মাস আগেই শুরু করে দেন জয়সূর্য। নিজে এক সময় বিশ্বের অন্যতম সেরা ওপেনার ছিলেন। তা-ও রাঠৌরকে দায়িত্ব দিয়েছেন ব্যাটিং কোচের! শ্রীধরকে কয়েক মাস আগে কলম্বোয় নিয়ে গিয়েছিলেন। দু’দফায় শিবির করান তাঁকে দিয়ে। জাতীয় দলের সদস্য এবং সুযোগ পেতে পারেন এমন সব ক্রিকেটারকে শিবিরে ডেকে পাঠানো হয়। ১৫ দিনের দু’টি শিবিরে শুধু ফিল্ডিং শিখিয়েছিলেন শ্রীধর। রাঠৌরও শিবির করেছেন বিশ্বকাপের আগে। ব্যাটারদের ধরে ধরে শিখিয়েছেন। প্রত্যেকের খামতি নোট করেছেন। সেই মতো শোধরানোর চেষ্টা করেছেন।

ফিল্ডিং, ব্যাটিংয়ের উন্নতির চেষ্টা করেছেন দুই ভারতীয় কোচ। পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার ক্রিকেটারদের মধ্যে ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন নাছোড় মানসিকতা। বিরাট কোহলি এবং রোহিত শর্মার মতো অধিনায়কের সঙ্গে কাজ করা দুই কোচ বুঝিয়েছেন, শেষ বল পর্যন্ত লড়াই করতে হবে। হবে না জেনেও, চেষ্টা করতে হবে। চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। চেষ্টা করতে করতেই হবে। এক বারে না হলে, ১০ বারে হবে। ম্যাচের প্রতিটি বলে সকলকে সেরাটা দেওয়ার জন্য তৈরি থাকতে হবে। সহজ কোনও পথ নেই। একই জিনিস অনুশীলন করে যেতে হবে। হাজার হাজার বার অনুশীলন করতে হবে। দুই ভারতীয় সহকারীকে কাজ করার স্বাধীনতা দিয়েছিলেন জয়সূর্য। ফল পাচ্ছেন বিশ্বকাপে। গত কয়েক বছর ধরে ধুঁকতে থাকা একটা দলকে তরতাজা দেখাচ্ছে।

সোমবার বাজপাখির মতো উড়ে গিয়ে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের ক্যাচ ধরেছেন নিসঙ্ক। অবিশ্বাস্য ক্যাচ। বিস্মিত হয়েছেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞেরাও। তিনিই ব্যাট হাতে অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের বল মাঠের বাইরে পাঠিয়েছেন অনায়াসে। এ বারের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের প্রথম শতরান করেছেন। তাঁর আগ্রাসন থামাতে পারেননি মার্শের দলের বোলারেরা। সোমবার নিসঙ্কের জন্যই দাসুন শনাকার দলকে অনেকটা রণতুঙ্গার শ্রীলঙ্কার মতো দেখিয়েছে। নিসঙ্কের প্রতিভা নিয়ে সংশয় ছিল না। তাই বলে এমন পারফরম্যান্স! রাঠৌর-শ্রীধর যুগলবন্দির ছোঁয়া।

কলম্বোর মাঠে যখন নিসঙ্ক একের পর এক বল মাঠের বাইরে পাঠিয়েছেন, তখন শিশুর মতো লাফিয়েছেন জয়সূর্য। অস্ট্রেলিয়া ইনিংসের শেষ দিকে যখন একের পর এক উইকেট পড়েছে, তখনও শ্রীলঙ্কার কোচ উচ্ছ্বাস গোপন করেননি। পরিকল্পনা সফলের আনন্দে মেতেছেন। যে পরিকল্পনার অবিচ্ছেদ্য অংশ দুই ভারতীয় সহকারী।

ভারতীয় ক্রিকেটের উন্নতির সুফল পাচ্ছে অন্য দেশও। শুধু ক্রিকেটারেরা বিশ্ব শাসন করছেন না। ভারতীয় কোচেরাও ধুঁকতে থাকা একটা দলকে বদলে দিচ্ছেন। অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ম্যাচের পর জয়সূর্য বলেছেন, ‘‘শ্রীধর আমাদের ফিল্ডিং কোচ। ও ভারতীয়। ব্যাটিং কোচ রাঠৌরও ভারতের। দু’জনেই দুর্দান্ত মানুষ। আমরা অনুশীলনে যা যা করতে চেয়েছি, ওরা সব করিয়েছে। আইপিএলে ওদের কোচিং করানোর অভিজ্ঞতায় আমরা উপকৃত হয়েছি। প্রত্যেক খেলোয়াড়কে নিয়ে আলাদা করে কাজ করে ওরা। আমাদের ব্যাটারদের মধ্যে এখন আত্মবিশ্বাসের অভাব নেই। শরীর ছুড়ে ফিল্ডিং করতে ছেলেরা এখন ভয় পায় না। রাঠৌর আর শ্রীধরের জন্যই এগুলো সম্ভব হয়েছে।’’

দুই সহকারীকে কৃতিত্ব দিতে কার্পণ্য করেননি শ্রীলঙ্কার প্রাক্তন অধিনায়ক। জয়সূর্য মেনে নিয়েছেন, তাঁর দলকে বদলে দিয়েছেন দুই ভারতীয় কোচ। যে ভাবে ভারতীয় ক্রিকেটারদের গড়ে তোলা হয়, সে ভাবেই চেষ্টা করেছেন রাঠৌর এবং শ্রীধর। সাফল্যের রাস্তা দেখিয়েছেন। নিসঙ্কেরা সেই রাস্তায় হাঁটতে শুরু করেছেন।

ভারতীয় দলের কোচ গৌতম গম্ভীর তাঁদের উপর ভরসা করতে পারেননি। দুই সফল এবং পরীক্ষিত সহকারী কোচকে দলের সঙ্গে রাখেননি। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে কি এড়াতে পারবেন? সূর্যকুমার যাদবের দলের সকলের সব কিছু প্রতিপক্ষের নখদর্পণে!

এটাও ভারতীয় ক্রিকেটের জয়।

Advertisement
আরও পড়ুন