শ্রেয়স আয়ার। ছবি: সমাজমাধ্যম।
গত কয়েক বছরে পাল্টে গিয়েছেন শ্রেয়স আয়ার। যে ভাবে দলের দায়িত্ব নিয়ে একের পর এক ম্যাচ জেতাচ্ছেন, তা অবাক করেছে সকলকেই। নেতৃত্বের বোঝা কাঁধে থাকলে অনেকেরই ব্যাটিং ঝুলে যায়। শ্রেয়স দু’টি সামলাচ্ছেন নিপুণ ভাবে। তাই অনেকেই মনে করছেন, বয়স এবং অভিজ্ঞতার বিচারে ভারতের টি-টোয়েন্টি দলের পরবর্তী নেতা তিনিই।
শ্রেয়স এই কাজ শুধু এই বছর নয়, গত কয়েক বছর ধরেই করে চলেছেন। তিনি নিজে কত ভাল অধিনায়ক সেটাই শুধু প্রমাণ করেননি, ব্যাট হাতে নেতৃত্বও দিয়েছেন।
উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটা বোঝা যাবে। ২০২০-র আইপিএলে তাঁর নেতৃত্বে প্রথম ফাইনালে উঠেছিল দিল্লি। সেই মরসুমে ১৭টি ম্যাচে ১২৩.২৭ স্ট্রাইক রেটে ৫১৯ রান করেছিলেন শ্রেয়স। ২০২৪-এ তাঁর নেতৃত্বে কেকেআর আইপিএল জেতে। শ্রেয়স ১৫টি ম্যাচে ৩৫১ রান করেছিলেন। ২০২৫-এ তিনি পঞ্জাব কিংসকে ফাইনালে তোলেন ১১ বছর পর। শ্রেয়স ১৭টি ম্যাচে ৬০৪ রান করেছিলেন।
তাঁর নেতৃত্বের একটি গুণ হল, তিনি শুধু সতীর্থদের পরামর্শ দিয়েই থেমে থাকেন না, নিজেও দায়িত্বশীল ভূমিকা নেন। মাঠে নির্দেশ দানই হোক বা ব্যাট হাতে, চাপের মুখে দলকে উদ্ধার করেন। গত বছর মুম্বইয়ের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় কোয়ালিফায়ারে একার হাতে দলকে জিতিয়েছিলেন। জসপ্রীত বুমরাহকে মারা একটি ছয় এখনও অনেকের চোখে ভাসে।
ভারতের এখনকার টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক সূর্যকুমার যাদবের সাফল্যের খতিয়ান খারাপ নয়। দেশকে ২০২৫-এর এশিয়া কাপ এবং এ বছর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জিতিয়েছেন। ভারতের টি-টোয়েন্টি অধিনায়কদের মধ্যে জয়ের শতাংশের বিচারে সকলের আগে তিনিই। ৫২টি ম্যাচের মধ্যে ৪০টিতে জিতেছে ভারত। হেরেছে আটটিতে।
তবে বয়স এবং সাম্প্রতিক খারাপ ফর্ম তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এ বছরের শুরুতে নিউ জ়িল্যান্ডের বিরুদ্ধে পাঁচ ম্যাচের সিরিজ়ে মাত্র ২৪২ রান করেছিলেন। তবে আইসিসি প্রতিযোগিতায় ব্যাট হাতে তাঁর অবদান বিশেষ নেই। গত এশিয়া কাপে সাত ম্যাচে মাত্র ৭২ রান করেছিলেন। টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ৯ ইনিংসে ২৪২ রান করেছেন। তাঁর ১৩৬.৭২ স্ট্রাইক রেটে ভারতীয়দের মধ্যে সবচেয়ে কম ছিল। নকআউট পর্বে রানই পাননি।
গত বছরের আইপিএলে অবশ্য তাঁর ফর্ম খারাপ ছিল না। ১৬টি ম্যাচে ৭১৭ রান করেছিলেন। এ বারের আইপিএলে সেই ফর্ম উধাও। প্রথম ৬ ম্যাচে মাত্র ১২১ রান করেছেন। গত ১৬ এপ্রিল পঞ্জাবের বিরুদ্ধে প্রথম বলেই আউট হয়েছেন।
ভারত পরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলবে ২০২৮-এ। সে বছর অলিম্পিক্সেও ক্রিকেট খেলবে তারা। তখন সূর্যের বয়স হবে ৩৮। শুধু শ্রেয়সই নন, সূর্যের জায়গা নেওয়ার জন্য রজত পাটীদারের মতো ব্যাটারও অপেক্ষা করছেন।
শ্রেয়স শুধু ট্রফিই জেতেননি, বিভিন্ন ফরম্যাটে আলাদা আলাদা সতীর্থদের সঙ্গে খেলে ভাল পারফর্মও করেছেন। টি-টোয়েন্টি দলে পাটীদারের সঙ্গে তাঁর একটা লড়াই হতে পারে ঠিকই। তবে অভিজ্ঞতার বিচারে শ্রেয়স এগিয়ে। এমনকি অক্ষর পটেলের নাম ভাবনাচিন্তার মধ্যে থাকলেও শ্রেয়স তাঁর থেকে এগিয়ে রয়েছেন।
ধারাবাহিকতার জন্য শ্রেয়স বাকিদের থেকে এগিয়ে থাকবেন। তিনি নেতা হিসাবে ধারাবাহিক ভাবে ব্যাট হাতে ভাল খেলেছেন। গত তিন বছরে বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ শ্রেয়সকে টি-টোয়েন্টি দলে নেওয়ার পক্ষে দাবি করছেন। কৌশলগত দিক এবং নেতৃত্বের দক্ষতা, দু’টিতেই শ্রেয়স বাকিদের টেক্কা দিতে পারেন।
অনিল কুম্বলে শ্রেয়সের বর্ণনা করেছেন ‘সবচেয়ে কম গুরুত্ব পাওয়া অধিনায়ক’ হিসাবে। তাঁর মতে, গত কয়েক বছরে একাধিক বার দল পাল্টে প্রতিটি দলকেই ফাইনালে তোলা কম গুরুত্বের নয়। রিকি পন্টিং জানিয়েছেন, শ্রেয়স নিজের খেলাকে ‘অন্য উচ্চতায়’ নিয়ে গিয়েছে। ব্যক্তিগত এবং কৌশলগত ভাবে শ্রেয়স আরও পরিণত হয়েছেন বলেই তাঁর মত। ব্র্যাড হাডিন তাঁকে ‘গেমচেঞ্জার’ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। হাডিনের মতে, সতীর্থদের খেয়াল রাখার ব্যাপারে শ্রেয়সের জুড়ি নেই।
তবে সবচেয়ে ভাল মতামতটি দিয়েছেন রবিচন্দ্রন অশ্বিন। তিনি বলেছেন, “দলের মধ্যে স্বস্তিদায়ক একটা পরিবেশ তৈরি করেছে শ্রেয়স। সবার সঙ্গে ভাইয়ের মতো ব্যবহার করে। এই ভ্রাতৃত্বই ওদের জেতাচ্ছে। আমি নিজে ক্রিকেটার হিসাবে বুঝেছি, অধিনায়কের কাছে পৌঁছনোর মাঝে একটা স্তর সব সময়েই থাকে। সব সময় আপনি এগিয়ে গিয়ে বলতে পারবেন না যে, ‘আমি গিয়ে এই কাজটা করে দেব’। শ্রেয়সের দলে সেটাই হয়েছে। সব কিছু খুব সহজ রেখেছে ও। মনে হবে যেন আইপিএল নয়, গলি ক্রিকেট এবং টেনিস বল ক্রিকেটের অধিনায়ক ও। অধিনায়ক যখন বন্ধু হয়ে যায় তখন দলে আলাদা একটা মেজাজ কাজ করে। যে ভাবে ব্যাট করছে, যে ভাবে নেতা হিসাবে নিজেকে তুলে এনেছে, তাতে সকলে এখন শ্রেয়সকে দেখেই শিখবে।”