(উপরে বাঁ দিক থেকে) লিয়োনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডো, আর্লিং হালান্ড এবং হ্যারি কেন। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
গোলপোস্টের সামনে গোলরক্ষক দাঁড়িয়ে থাকবে, ফুটবলে এটাই স্বাভাবিক। এর অন্যথা হওয়ার উপায় নেই। কিন্তু বাকি ১০ জন ফুটবলার কোথায় থাকবে, তাদের ভূমিকা কী হবে, এ সব ঠিক করতেই দিনরাত এক করে ফেলতে হচ্ছে বিশ্বকাপের ৪৮ জন কোচকে। প্রতিপক্ষের শক্তি-দুর্বলতা যেমন যাচাই করতে হচ্ছে, তেমনই বুঝে নিতে হচ্ছে নিজের দলের সামর্থ্য। সব বিচার বিবেচনা করে তৈরি করতে হচ্ছে রণকৌশল।
৪-৪-২, ৫-৩-২, ৪-২-৩-১, ৪-১-৪-১, ৪-১-২-৩, ৪-৪-১-১— ফুটবলে এমন নানা ছকের কথা জানেন ক্রীড়াপ্রেমীরা। নির্দিষ্ট কোনও ছক হয় না। ৪-৩-৩, ৪-৩-১-২, ৩-৫-২ বা ৩-৪-৩ ছকেও দলকে খেলাতে পারেন কোনও কোচ। ১০ জন ফুটবলারকে প্রয়োজন অনুযায়ী সাজানোই চ্যালেঞ্জ। বিশ্বের তাবড় ফুটবল কোচেরা এই ছক বা ফর্মেশন নিয়ে নিরন্তর কাজ করে চলেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা, ফুটবল মস্তিষ্কই মূলত পরিচালনা করে দলকে। সব কোচেরই পছন্দের একটি বা দু’টি পছন্দের ছক থাকে। তার মানে এমন নয়, তাঁরা তার বাইরে বেরোন না বা অন্য কোনও ছক ব্যবহার করেন না। প্রতিপক্ষ দলের ছকও তো মাথায় রাখতে হয়।
এ বারের বিশ্বকাপের প্রথম ২৪টি ম্যাচ পর্যন্ত ন’রকম ছক ব্যবহার করতে দেখা গিয়েছে কোচদের। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে ৪-৪-২। রক্ষণে চার জন, মাঝ মাঠে চার জন এবং আক্রমণে দু’জন ফুটবলার থাকে এই ছকে। ১২টি দল এই ছকে খেলেছে। ১২টি দলের মধ্যে শুধু স্কটল্যান্ড এবং আইভোরি কোস্ট জিততে পেরেছে ফুটবলের সবচেয়ে পরিচিত ছকে খেলে। ব্রাজিল, উরুগুয়ে এবং কানাডা সাধারণত এই ছকে খেলে। রক্ষণ মজবুত রেখে কোনও কোনও কোচ দলকে খেলাচ্ছেন ৪-৩-৩ বা ৫-৩-২ ছকে। ৩-৪-৩ ছকে খেলে হেরে গিয়েছে চারটি দল।
আক্রমণাত্মক মিডফিল্ড ছক (৪-২-৩-১)
চার ডিফেন্ডার, দুই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার, তিন আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার এবং এক জন স্ট্রাইকার রেখে দল তৈরি করতে অনেক কোচ পছন্দ করে। আধুনিক ফুটবলে পরিচিত এই ছক। এই ছক ব্যবহার করে জয় পেয়েছে আমেরিকা, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং অস্ট্রিয়া। সুবিধা হল সাত থেকে আট জন মিলে রক্ষণ সামলাতে পারেন আবার পাঁচ থেকে ছ’জন আক্রমণে উঠে যেতে পারেন। লোকের অভাব হয় না।
অতি আগ্রাসী ছক (৪-১-২-৩)
এই ছকে খেলেন চার জন ডিফেন্ডার, এক জন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার, দু’জন মিডফিল্ডার এবং তিন জন স্ট্রাইকার বা উইঙ্গার। মেক্সিকো, ঘানা, নরওয়ে এবং কলম্বিয়া প্রথম ম্যাচে এই ছক ব্যবহার করেছে। সব মিলিয়ে আটটি দলের খেলায় এই ছক দেখা গিয়েছে। স্পেন এবং নেদারল্যান্ডসের খেলায় উইঙ্গারদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
শক্তিশালী মাঝমাঠ (৩-৪-৩)
তিন জন ডিফেন্ডার, চার জন মিডফিল্ডার এবং তিন জন ফরোয়ার্ড রেখে দল তৈরি করেন কোচেরা। সাতটি দলকে এই ছক ব্যবহার করতে দেখা গিয়েছে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে। জার্মানি এবং দক্ষিণ কোরিয়া জিতেছে। জার্মানি ৭ গোলও দিয়েছে। সব বিভাগের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এবং মাঝমাঠ দখলে রাখতে এই ছক ব্যবহার করা হয়।
পুরনো ছক (৪-৩-৩)
ফুটবলে অন্যতম পুরনো এবং পরিচিত এই ছক ব্যবহার করছেন আর্জেন্টিনার কোচ লিয়োনেল স্কালোনি। চার জন ডিফেন্ডার, তিন জন মিডফিল্ডার এবং তিন জন ফরোয়ার্ড নিয়ে দল সাজিয়ে আলজেরিয়াকে ৩ গোল দিয়েছে গত বারের চ্যাম্পিয়নেরা। ২০২২ বিশ্বকাপে এই ছকেই খেলেছিলেন লিয়োনেল মেসিরা। ১৯৭০ সালে পেলের ব্রাজিলও এই ছক ব্যবহার করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।
আক্রমণাত্মক ফুলব্যাক (৫-৩-২)
পাঁচ ডিফেন্ডার, তিন মিডফিল্ডার এবং দুই ফরোয়ার্ডের এই ছক ব্যবহার করেছে তিনটি দল। জিততে পারেনি কোনও দলই। দক্ষিণ আফ্রিকা এবং টিউনিশিয়া হেরে গিয়েছে। কঙ্গো ড্র করেছে। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর পর্তুগালের বিরুদ্ধে তাদের লড়াইকে অবশ্য কৃতিত্ব দিচ্ছেন ফুটবল বিশেষজ্ঞেরা।
ফাঁকা মাঝমাঠ (৫-২-৩)
পাঁচ ডিফেন্ডার, দুই মিডফিল্ডার এবং ৩ ফরোয়ার্ড নিয়ে খেলতে দেখা গিয়েছে শুধু চেক প্রজাতন্ত্রকে। দুই ফুলব্যাত সাহায্য করেছেন মাঝমাঠকে। কিন্তু দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে হেরে গিয়েছে চেকরা।
রক্ষণাত্মক মাঝমাঠ (৫-৪-১)
অতি রক্ষণাত্মক ছক হিসাবে বিবেচিত হয় ফুটবলে। পাঁচ জন ডিফেন্ডার, চার জন মিডফিল্ডার, এক জন স্ট্রাইকার নিয়ে খেলেও তুরস্ককে হারিয়েছে অস্ট্রেলিয়া। রক্ষণে পায়ের জঙ্গল তৈরি করে প্রতিপক্ষকে বেদম করে দেওয়ার চেষ্টা। কলকাতা ময়দানের ছোট দলগুলি দুই প্রধান বা শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অনেক সময় এই ছকে দল সাজায়। সাফল্যও পায় অনেক সময়।
রূপান্তর কেন্দ্রিক (৩-৪-১-২)
এই ছকে গোটা মাঠ জুড়ে খেলেন অন্তত সাত থেকে আট জন ফুটবলার। তিন জন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার, চার মিডফিল্ডার, এক আক্রমণাত্মক মিডফিল্ডার এবং দু’জন ফরোয়ার্ড নিয়ে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ খেলেছে সুইডেন। টিউনিশিয়াকে ৫-১ ব্যবধানে হারিয়েছে সুইডিশেরা।