(বাঁ দিকে) কেভিন ডি ব্রুইনদের বার বার আটকে দিলেন আলিরেজ়া বেইরানভান্দ (ডান দিকে)। ছবি: রয়টার্স।
বিশ্বকাপে অপেক্ষাকৃত কম শক্তির দলগুলির গোলরক্ষকেরা নজর কেড়ে নিচ্ছেন। কাবো ভার্দের গোলরক্ষক ভোজ়িনহার পর আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছিলেন কুরাসাওয়ের এলয় রুম। সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে ইরানের গোলরক্ষক আলিরেজ়া বেইরানভান্দের নাম। ৩৩ বছরের গোলরক্ষকের কাছেই আটকে গিয়েছে বেলজিয়াম। ফুটবল মহল মুগ্ধ বেইরানভান্দের পারফরম্যান্সে। সমান আকর্ষণীয় তাঁর যাযাবর জীবনও। হয়তো খানিকটা বেশিই।
রবিবারের ম্যাচে ৬ ফুট ৫ ইঞ্চির গোলরক্ষক বেলজিয়ামের সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অন্তত সাতটি গোল আটকে দিয়েছেন। বিশ্বকাপের গোল পোস্টের সামনে জাঁকিয়ে বসা বেইরানভান্দের জন্ম ইরানের লোরেস্তান এলাকায় দরিদ্র কুর্দি লাক পরিবারে। যাযাবর পরিবার। চরম দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন। কোনও কোনও দিন খাওয়াও জুটত না। জ্ঞান হওয়া থেকে লড়াই শুরু। প্রতি বেলার সংগ্রামের সঙ্গে পরিচয়। এমন জীবনের সামনে ৯০ মিনিটের বেলজিয়াম কী এমন কঠিন প্রতিপক্ষ!
অভাব আটকাতে পারেনি বেইরানভান্দকে। ছেলের ফুটবল খেলার শখ পূরণের সামর্থ্য ছিল না দরিদ্র পরিবারের। পরিবারের পেশা ছিল ভেড়া পালন। বেইরানভান্দের বাবা চাইতেন না ছেলে ফুটবল খেলুক। তাই বলে স্বপ্নকে হত্যা? নৈব নৈব চ। ফুটবলের টানে কিশোর বয়সেই পালিয়ে তেহরানে চলে আসেন বেইরানভান্দ। ইরানের রাজধানীতে বেইরানভান্দ এসেছিলেন খালি হাতে। পয়সা-কড়ি কিছুই ছিল না সঙ্গে। তার উপর কেহরানের তেহরানের মতো বড়, ঝকঝকে শহর। অচেনা দুনিয়া। ধাতস্থ হতেই কয়েকটা দিন কেটে গিয়েছিল। জীবন আরও কঠিন। দিন বা রাত, খোলা আকাশই ছিল তাঁর মাথার ছাদ। বাঁচার তাগিদে তেহরানের আজ়াদি টাওয়ারের কাছে গৃহহীনদের সঙ্গে মিশে গিয়েছিলেন। কিন্তু খাওয়াবে কে? ফুটবল তো দূরের কথা। উপায়? ভিক্ষা। পথ চলতি মানুষ যে দু’চার টাকা ছুড়ে দিত, তাতেই যতটুকু পেট ভরে। তখনও মাথায় ফুটবল। খেলতেই হবে।
খোঁজা খুঁজি করে সন্ধান পেলেন ওয়াহদাত নামে এক ফুটবল ক্লাবের। সেই ক্লাবের সদর দরজায় বাইরে শুরু হল দিনযাপন। শুরু নতুন লড়াই। ফুটবল খেলতে হলে দরকার জামা, শর্টস, জুতো। কিনবেন কী করে। ক্লাবে আসা, রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা গাড়ি ধুয়ে রোজগার শুরু। তাতে কি চলে! তবে গাড়ি ধোয়ার কাজই তাঁর জীবনের খেলা বদলে দেয়। এক দিন একটি গাড়ি ধোয়ার পর টাকা নিতে গিয়ে বেইরানভান্দ দেখেন বসে রয়েছেন ইরানের প্রাক্তন ফুটবলার আলি দাই। চিনতে ভুল হয়নি। সাহস করে নিজের স্বপ্নের কথা জানিয়ে সাহায্য চান। খেলা শেখার ব্যবস্থা করে দেন দাই। কাজ পান পোশাক তৈরির একটি কারখানায়। তার পরও ক্লাবের সদর দরজার বাইরেই রাত কাটাতেন। যাতে সকালের অনুশীলনে দেরি না হয়! খরচ চালাতে কখনও পিৎজার দোকানে কাজ করেছেন। কখনও রাস্তা পরিষ্কার করেছেন। কখনও তেহরান পুরসভায় সাফাই কর্মীর কাজ করেছেন। চাইতেন রাতের কাজ। যাতে দিনে ফুটবল খেলার সময় না কমে।
ওয়াহদাতে খেলা শেখার সময় নজরে পড়ে গিয়েছিলেন নাফত তেহরান ক্লাবের এক কর্তার। প্রতিভা চিনতে ভুল করেননি তিনি। বেইরানভান্দকে নিয়ে যান নিজের ক্লাবে। ২০০৮ থেকে ২০১৬ সেখানেই ছিলেন। নাফত তেহরানই তাঁকে ফুটবলার হিসাবে তৈরি করে দেয়। নির্দিষ্ট করে বললে গোলরক্ষক হিসাবে। ২০১০ সালে সুযোগ পান ইরানের অনূর্ধ্ব ২০ দলে। জীবন বদলাতে শুরু করে। বিভিন্ন ক্লাবের প্রস্তাব আসতে শুরু করে। বেইরানভান্দ দল ছাড়ার কথা ভাবেননি। ক্লাবের প্রতি কৃতজ্ঞতায়। তার পর আরও তিন ক্লাব ঘুরে বেইরানভান্দ এখন খেলেন ট্রাক্টর এফসির হয়ে। ২০১৫ থেকে খেলছেন ইরানের জাতীয় দলে।
২০১৮ সালে প্রথম বিশ্বকাপ। ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর পেনাল্টি আটকে সে বারই নায়কের মর্যাদা পেয়েছিলেন বেইরানভান্দ। তাঁর কাছ আটকে গিয়েছিল পর্তুগালও। ২০২২ সালের বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচে সতীর্থ মজিদ হোসেইনির সঙ্গে সংঘর্ষের পর মাঠ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। স্টেডিয়াম থেকেই তাঁকে নিয়ে যেতে হয়েছিল হাসপাতালে।
ইরানের হয়ে ৮৮টি ম্যাচ খেলা গোলরক্ষকের ঝুলিতে রয়েছে জোড়া বিশ্বরেকর্ড। প্রথম, ২০১৬ সালের ১১ অক্টোবর দক্ষিণ কোরিয়া ৬১.০০২৬ মিটার দূরে বল ছুড়ে ছিলেন। বিশ্বের আর কোনও গোলরক্ষক এত দূরে বল ছুড়তে পারেননি। এক থ্রোয়ে বল মাঝ মাঠ পার করানো তাঁর কাছে সহজ কাজ। ফুটবলে সবচেয়ে দীর্ঘ ড্রপ কিকের বিশ্বরেকর্ডও বেইরানভান্দের। ২০১৯ সালের ১৭ এপ্রিল একটি ম্যাচে ৭৮.০১৪ মিটার দূরে পাঠিয়ে ছিলেন বল।