FIFA World Cup 2026

মেসি-মেলায় দিয়েগোর গান

নব্বই মিনিটের উপর স্টেডিয়ামের ভিতরে বসে যাঁরা সারাক্ষণ ‘মেসি-মেসি’ জয়ধ্বনি দিয়ে গেল, আর্জেন্টিনা ফুটবলের জয়গান গেয়ে চলল, অবিরাম ড্রাম বাজিয়ে গেল, মেক্সিকান ওয়েভ তুলল— তাঁদের গলায় ক্লান্তির ছাপ তো দূরের কথা, বরং যত রাত বাড়ল তত যেন তেজ বাড়তে থাকল।

সুমিত ঘোষ
শেষ আপডেট: ১৮ জুন ২০২৬ ০৭:২১
রাজকীয়: বিশ্বকাপে শুরু মেসি-জাদু। আলজিরিয়ার বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিকের প্রথম গোল করার পরে উৎসব আর্জেন্টিনার অধিনায়কের। বুধবার আমেরিকার ক্যানসাস সিটিতে।

রাজকীয়: বিশ্বকাপে শুরু মেসি-জাদু। আলজিরিয়ার বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিকের প্রথম গোল করার পরে উৎসব আর্জেন্টিনার অধিনায়কের। বুধবার আমেরিকার ক্যানসাস সিটিতে। ছবি: পিটিআই।

মেসি-মায়া তো এত ক্ষণ স্টেডিয়ামের ভিতরে বসে দেখে এলাম। ম্যাচের পরে বেরোতে গিয়ে যা দেখছি, তার নামকরণ কী করা উচিত? মেসি-মেলা?

দেখেশুনে তো তা-ই তো মনে হচ্ছে। আকাশি নীল-সাদার এমন সমুদ্র... দাঁড়ান ভুল লিখে ফেলেছি... মহাসমুদ্র লেখা উচিত। যা দেখে মনে হচ্ছে শহরটার নাম আদৌ ক্যানসাস সিটি নয়, বুয়েনস আইরেস হবে। স্টেডিয়ামটা কি অ্যারোহেড না লা বম্বোনেরা? বোকা জুনিয়র্সের ‘হোম’? নাকি এল মনুমেন্টাল? রিভার প্লেটের ঘরের মাঠ।

নব্বই মিনিটের উপর স্টেডিয়ামের ভিতরে বসে যাঁরা সারাক্ষণ ‘মেসি-মেসি’ জয়ধ্বনি দিয়ে গেল, আর্জেন্টিনা ফুটবলের জয়গান গেয়ে চলল, অবিরাম ড্রাম বাজিয়ে গেল, মেক্সিকান ওয়েভ তুলল— তাঁদের গলায় ক্লান্তির ছাপ তো দূরের কথা, বরং যত রাত বাড়ল তত যেন তেজ বাড়তে থাকল। এক-এক সময় মনে হচ্ছে, এতে আশ্চর্যেরই বা কী আছে? হলিউডের এত সব সুপারহিরো রয়েছে। সারা পৃথিবীতে যারা বিখ্যাত। সুপারম্যান, ব্যাটম্যান, স্পাইডারম্যান। হলিউডের দেশ এ বার দেখল রক্তমাংসের সুপারহিরো কেমন হয়। যিনি আগামী সপ্তাহে ৩৯-এ পা দেবেন। যাঁর সম্পর্কে ভাবা হচ্ছিল কাতারে কাপ জয়ের অধরা স্বপ্নপূরণের পরে আর কী নতুন চাঁদমারি থাকতে পারে। যাঁকে ছাড়াই নাকি আর্জেন্টিনা হালফিলে ভাল খেলছে বলে কোনও কোনও পণ্ডিত রায় দিয়ে ফেলেছিলেন। তিনি প্রথম ম্যাচেই এমন মহাকাব্যিক হ্যাটট্রিকের জাদুতে বিশ্বকাপকে টাইমস স্কোয়্যারের চেয়েও ঝলমলে করে দিয়ে গেলে, সুপারহিরো ছাড়া কী আর বলা যায়? আর ওই পণ্ডিতদের শিক্ষা দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন, আর্জেন্টিনা মেসি-হীন হয়ে গেলেও হয়তো আসর বসবে। কিন্তু বাজবে না ওস্তাদের সরোদ! মাত্র একটি রাস্তা দিয়ে ভাগাভাগি হয়ে গিয়েছে ক্যানসাস সিটি আর মিসৌরি। রাস্তার এক দিকে ক্যানসাস। তার এক রকম নিয়মকানুন, ট্যাক্স প্রক্রিয়া। অন্য দিকে মিসৌরি, তার নিয়ম আলাদা। তেমনই যেন মেসি-সহ ফুটবল আর মেসি-হীন ফুটবল— দু’টো আলাদা শহর। একটা উজ্জ্বল, অন্যটা বিবর্ণ।

উৎসব: মেসিদের জয়ের পরে মারাদোনার ছবি আঁকা বাদ্যযন্ত্র নিয়ে স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা।

উৎসব: মেসিদের জয়ের পরে মারাদোনার ছবি আঁকা বাদ্যযন্ত্র নিয়ে স্টেডিয়ামে আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা। ছবি: রয়টার্স।

আমেরিকার বেশির ভাগ মাঠেই পাঁচ, ছয় বা আট তলা থেকে দর্শকেরা নামেন র‌্যাম্প ধরে বা এলিভেটরে করে। নিউ জার্সিতে প্রথম ম্যাচের পরে ব্রাজ়িলের হলুদ স্রোতকে এলিভেটরে করে নেমে আসতে দেখা গিয়েছিল। নিস্তব্ধ, প্রাণহীন। আর এখানে আকাশি নীল ও সাদার মহাস্রোত যেন ঠিক তার বিপরীত। তারা এলিভেটরের তোয়াক্কা করল না। র‌্যাম্প দিয়ে দল বেঁধে নামতে থাকল গান গাইতে গাইতে। কাতারে আর্জেন্টিনীয় সমর্থকদের সঙ্গী ছিল ‘মুচাচোস, অহোরা নস ভলভিমোস আ ইলিউসিয়োনার’ গান। যার প্রধান কথাগুলি ছিল— ‘‘আমরা আবার আশার আলো দেখছি/আমাদের তৃতীয় কাপ চাই/আমরা আবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হব/স্বর্গ থেকে দিয়েগো দেখবে/দিয়েগো গলা ফাটাবে মেসির জন্য!’’

আর্জেন্টিনীয় ফুটবল যত দিন থাকবে, দু’টি চরিত্র তত দিন তাদের সমস্ত গানে থাকবে। দিয়েগো মারাদোনা এবং লিয়োনেল মেসি। একটা সময় মেসিকে তাঁর দেশবাসীই অনেক হেয় করত মারাদোনার সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে।

বলত, দিয়েগো আর্জেন্টিনার, দিয়েগো আমাদের বিশ্বকাপ দিয়েছে, লিয়ো তো স্পেনের সন্তান। কাতারে বিশ্বকাপ দেওয়ার পরে সে সব অপবাদ, লাঞ্চনা এখন অতীত। অ্যারোহেডে দেখা গেল মেসির জন্য এখন আর্জেন্টিনীয়দের মনে রয়েছে শুধু ভালবাসা আর ভালবাসা। কাতার বিশ্বকাপের গানে আর্জেন্টিনীয়দের প্রার্থনা ছিল— কাপ অভিযানে উপর থেকে দিয়েগো আশীর্বাদ করবে লিয়োকে। আমেরিকায় তা পাল্টে গিয়েছে। এ বারের প্রার্থনা হচ্ছে— লিয়ো মুক্তি দেবে দিয়েগোকে।

নতুন করে লেখা এই গান, যা সারা ক্ষণ মাঠের মধ্যে এবং র‌্যাম্প দিয়ে নামতে নামতে গেয়ে চলল আকাশি নীল ও সাদা বাহিনী, তার লাইনগুলো আরও বেশি করে গায়ে কাঁটা দেওয়ার মতো। আর্জেন্টিনীয়রা ভোলেনি তাদের অতীত ক্ষত। এই আমেরিকাতেই ১৯৯৪ বিশ্বকাপে যে ডোপ কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়ে নির্বাসিত হতে হয়েছিল প্রিয় দিয়েগোকে। এ বারের গানের কথাগুলো তাই বদলা চাইছে— ‘‘আমরা তৃতীয়টা জিতেছি লিয়োর হাত ধরে/আমরা আবার চ্যাম্পিয়ন হতে চাই/৩২ বছর পরে বদলা নেবে আমাদের দল/যে কাপটা ওরা চুরি করে নিয়েছিল, যেটা আমাদের জিততে দেয়নি সেটা আমরা জিতব/জার্সিতে চতুর্থ স্টার আনবে লিয়োরা, এটা দিয়েগোর জন্য/দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত আমি আর্জেন্টিনীয়।’’ মাঠের ধারে পার্ক করা অনেক বড় বড় গাড়িতে দেখা গেল মারাদোনা ও মেসি দু’জনেরই মুখ লাগানো। সে সব দেখতে দেখতে আরওই মনে হচ্ছিল, কাপ-রক্ষার যাত্রায় মেসি একা নন। তাঁর সঙ্গে কোথাও ছায়াসঙ্গী হয়ে যেন ঘুরবেন দিয়েগো মারাদোনাও।

একে তো মেক্সিকো ১৯৮৬-র স্মৃতি। এ বারেও সেখানে বিশ্বকাপের আসর বসছে। যদিও আর্জেন্টিনার ম্যাচ নেই মেক্সিকোতে। তার সঙ্গে আমেরিকা ১৯৯৪-এর ডোপ কেলেঙ্কারির কালো দাগ। মেসির জাদুতে মেক্সিকোর সুখস্মৃতি ফিরে আসুক আর আমেরিকার লজ্জা (আর্জেন্টিনীয়দের কথায় অন্যায়, চক্রান্ত) ধুয়েমুছে সাফ হয়ে যাক— মনে হচ্ছে এটাই এ বারে আর্জেন্টিনীয় সমর্থকদের মন্ত্র।

আর মেসি শুরুটাই এমন ফাটিয়ে করলেন যে, মেক্সিকোয় মারাদোনার সেই কাপ-গাথাকে মনে করিয়ে দেওয়ার মতো। পাঁচ মিনিটের মধ্যেই গোল করে ফেলেছিলেন, অফসাইডের জন্য বাতিল হল। কিন্তু বেশি ক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। ১৭ মিনিটেই ঝাড়বাতির আলোয় অ্যারোহেড স্টেডিয়ামকে আলোকিত করে তুললেন তিনি। ইন্টার মায়ামিতে তাঁর সতীর্থ রদ্রিগো দি পলের বাড়ানো ৪০ গজের অসাধারণ পাস বক্সের সামনে ধরলেন, ঘুরলেন, তার পর মাত্র তিনটি টাচে বাঁ পায়ের সেই মেসি-সুলভ সোয়ার্ভিং শটে অবিশ্বাস্য গোল করে গেলেন। অ্যারোহেডে কোন ছাদ নেই। খোলা আকাশের নীচে উন্মুক্ত স্টেডিয়াম। সব চেয়ে বেশি ডেসিবেলের জন্য গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডসে নাম উঠেছে এই মাঠের। আর্জেন্টিনা-আলজিরিয়া ম্যাচের হিসাব হাতে এলে বোঝা যাবে, অতীতের সব ডেসিবেলের রেকর্ড চূর্ণ হয়ে গেল কি না। সামনে বসা এক আর্জেন্টিনীয় পরিবারকে পাওয়া গেল সড়কপথে এসেছেন। মেসির গোলটা যেন সব কষ্ট লাঘব করে দিয়ে গেল, এমনই আত্মহারা দেখাচ্ছিল তাঁদের। মেসি মানে শুধু তো গোল নয়, শুধু ম্যাচ জেতানো মহানায়ক নয়। মেসি মানে কাঁটায় ভরা জীবনের রাস্তায় রডোডেনড্রনের সন্ধান।

প্রথম গোল করে মেসি নিজেও কেঁদে ফেললেন। কেন কাঁদছিলেন? ম্যাচের পরে খোলসা করতে চাননি তিনি। শুধু বলেছেন, ‘‘ফুটবলের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই।’’ নাকি আছে? এখনই বলতে চান না? রহস্য থেকে গেল। যেটা নিয়ে কোনও রহস্য-দ্বন্দ্ব কিছুই নেই, তা হচ্ছে— তিনিই ‘গোট’। গ্রেটেস্ট অব অল টাইম। আলজিরিয়া এত ছেড়ে ছেড়ে রাখল কেন মেসিকে, সেই প্রশ্ন উঠতে পারে। বিপজ্জনক ভাবে একবার পা চালানোর জন্য তাঁকে কার্ড দেখানো উচিত ছিল রেফারির, সেই দাবিও উঠছে। কিন্তু সব কিছুকে ছাপিয়ে চলছে মেসি-বন্দনা। প্রথম ম্যাচেই বিশ্বকাপটাকে অনেক রঙিন করে দিয়ে গেলেন তিনি।

৬০ মিনিটে দ্বিতীয় গোলটি সুযোগসন্ধানীর মতো করা। যেন সেই ছটফটে, কিশোর মেসি। লিভারপুলের মিডফিল্ডার আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের ৩০ গজের শট হাত থেকে বেরিয়ে গেল লুকা জ়িদানের। আর বেরোবি তো বেরো, বলটা গিয়ে পড়ল মেসির রাস্তাতেই। ৩৯ হওয়ার মুখে থাকুন কী ৭৯, চোখ বুজে এ সব গোল করেই যাবেন মেসি। জায়ান্ট স্ক্রিনে কি তখনই জ়িনেদিন জ়িদানকে দেখাল? বিশ্বকাপে অভিষেক ঘটল ছেলের। কোনও বাবা চায় মেসির বিরুদ্ধে ছেলে সর্বোচ্চ আসরে প্রথম ম্যাচ খেলতে নামুক? কিন্তু তিনি জ়িনেদিন জ়িদান— বিশ্বকাপ ফাইনালে ঢুঁসো মেরে মাঠ থেকে বিসর্জিত জ়িদান তো আরও ভাল করে জানেন, ফুটবল যেমন দু’হাত ভরে দেয় তেমন আবার কেড়েও নেয়! এটাইতো জীবন।

মেসি মহাকাব্য তখনও শেষ হয়নি। ৭৬ মিনিটে হ্যাটট্রিক। এই গোলটা দেখে অনেকের আবার মারাদোনাকে মনে পড়ে গিয়েছে। ১৯৯৪ বিশ্বকাপেই ডোপ কেলেঙ্কারিতে নির্বাসিত হওয়ার আগে মারাদোনা দু’টি ম্যাচ খেলেছিলেন। গ্রিসের বিরুদ্ধে এ রকম একটি গোল তিনি করেছিলেন বলে আর্জেন্টিনীয় সমর্থকেরা বলতে শুরু করেছেন। মেসির জাদু, মারাদোনা স্মরণ— সব মিলিয়ে একটা ‘ঐশ্বরিক’ প্রভাব যেন শুরু থেকেই আর্জেন্টিনার কাপ-অভিযানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল!

যত বিশ্বকাপ এগোবে, যত মেসি-জাদু চলবে, ততই মেসি-মেলার ঝলমলানি বাড়বে। আর ততই আকাশে মিশে যাওয়া দিয়েগো রামধনু তার আবেগের সাত রং নিয়ে ভেসে উঠতে থাকবে!

আরও পড়ুন