(বাঁ দিক থেকে) কার্লোস আলকারাজ়, নোভাক জোকোভিচ এবং ইয়ানিক সিনার। — ফাইল চিত্র।
একজন নামবেন টানা তিন বার ট্রফি জিতে কিংবদন্তির নজির স্পর্শ করতে। অপর জন নামবেন প্রথম বার ট্রফি জিততে। এই দু’জনের বাইরে, কিছুটা নজরের আড়ালে আছেন যে তৃতীয় জন, তিনি নামবেন ২৫তম গ্র্যান্ড স্ল্যাম জিতে পরিসংখ্যানের দিক থেকে সর্বকালের সেরা টেনিস খেলোয়াড় হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে। রবিবার অস্ট্রেলিয়ান ওপেন শুরু হওয়ার আগে এ রকমই পরিস্থিতি ইয়ানিক সিনার, কার্লোস আলকারাজ় এবং নোভাক জোকোভিচের।
বিশ্বের নানা প্রান্তে টেনিস প্রতিযোগিতা চলছে। তবে মূল লক্ষ্য একটাই, অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে ভাল ফল করা। বছরের প্রথম এই গ্র্যান্ড স্ল্যামকে ‘হ্যাপি স্ল্যাম’ও বলা হয়। হালকা পরিবেশ, মনোরম আবহাওয়া এবং টেনিস কোর্টের ধুন্ধুমার লড়াই অনেকেরই বিশেষ পছন্দের। সেই লড়াই শুরু হতে চলেছে রবিবার।
সিনার এবং ম্যাডিসন কিজ় নামবেন গত বারের ট্রফিজয়ী হিসাবে। সিনার যেমন জোকোভিচের নজির স্পর্শ করতে চাইবেন, তেমনই কিজ় চাইবেন গত বারের সাফল্যের পুনরাবৃত্তি। তার জন্য ইগা শিয়নটেক, এরিনা সাবালেঙ্কাদের মতো পাহাড় টপকাতে হবে তাঁকে।
শেষ আটটি গ্র্যান্ড স্ল্যাম নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছেন সিনার এবং আলকারাজ়, যাঁদের দ্বৈরথ টেনিস সার্কিটে ‘সিনকারাজ়’ নামে খ্যাত। আলকারাজ় আজ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিততে পারেননি। এই ট্রফিটা পেলে কেরিয়ার স্ল্যাম (যাঁরা সব গ্র্যান্ড স্ল্যাম অন্তত এক বার করে জিতেছেন) হয়ে যাবে তাঁর। আলকারাজ়ের সামনে সুযোগ সবচেয়ে কম বয়সে (২২ বছর) এই কীর্তি অর্জন করার।
সেটা করতে হবে কোচ জুয়ান কার্লোস ফেরেরোকে ছাড়াই। বিশ্বের প্রাক্তন এক নম্বর ফেরেরোর সঙ্গে ডিসেম্বরেই বিচ্ছেদ হয়েছে আলকারাজ়ের। তিনি খেলবেন স্যামুয়েল লোপেজ়ের অধীনে। গত বছর পাঁচটি ট্রফি জিতেছে এই জুটি। মেলবোর্নে ষষ্ঠ ট্রফির অপেক্ষা। নতুন কোচকে নিয়ে আত্মবিশ্বাসী আলকারাজ়। বলেছেন, “জুয়ানকে নিয়ে একটা সিদ্ধান্ত নিতেই হয়েছে। এখন আমার সঙ্গে যে দল রয়েছে তাঁদের প্রতি পূর্ণ আত্মবিশ্বাস রয়েছে। জুয়ানের সঙ্গে সাত বছর কাটাতে পেরে আমি কৃতজ্ঞ। অনেক কিছু শিখেছি। তার জন্য কৃতজ্ঞ।” আলকারাজ় স্পষ্ট করে দিয়েছেন, অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিতে কেরিয়ার স্ল্যামই তাঁর একমাত্র লক্ষ্য।
উল্টো দিকে গত দু’বারের বিজয়ী। গত বছরের শেষের দিকে এক নম্বর র্যাঙ্কিং খোয়া গিয়েছে আলকারাজ়ের কাছে। ইটালির খেলোয়াড়ের বিশেষ পছন্দ হার্ড কোর্ট। তিনি অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে টানা ১৪টি ম্যাচ জিতে খেলতে নামবেন। তিনি অবশ্য দীর্ঘ দিনের কোচ ড্যারেন কাহিলের কাছেই প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। কাহিল জানিয়েছেন, সিনার উইম্বলডন জিততে পারলে তবেই তিনি কোচ হিসাবে কাজ চালিয়ে যাবেন। ফাইনালে আলকারাজ়ের বিরুদ্ধেই সিনারের লড়ার সম্ভাবনা বেশি। সম্প্রতি সিনার বলেছিলেন, “গত বছরের থেকে এ বার আরও ভাল খেলছি। অনেক ম্যাচ জিতেছি। যেগুলো হেরেছি, সেখান থেকেও ইতিবাচক বিষয় খোঁজার চেষ্টা করেছি। নিজেকে উন্নত করার চেষ্টা চালিয়েছি।” গত বছর অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে খেলতে নামার আগে ডোপিং কলঙ্কের বিরুদ্ধে লড়তে হয়েছিল সিনারকে। এ বার চাপ অনেকটা কম বলে মনে করছেন সিনার। বলেছেন, “আগের বার অনেক কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে ছিলাম। জানতাম না কী হতে চলেছে। এ বার অনেকটাই শান্ত সব কিছু। কোর্টে সময়টা উপভোগ করার চেষ্টা করছি।”
জোকোভিচের সমসাময়িক দুই কিংবদন্তি রজার ফেডেরার এবং রাফায়েল নাদাল আগেই অবসর নিয়েছেন। সার্বিয়ার খেলোয়াড় এখনও কোর্টে লড়াই করছেন। তবে সাফল্য অধরাই। গত বছর চারটি গ্র্যান্ড স্ল্যামের সেমিফাইনালে উঠলেও প্রতিটিতে হেরেছেন। এ বার তিনি বলেছেন, “যতটুকু চেষ্টা করতে পারি ততটুকু করব।” তবে অবসরের জল্পনা উড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। বলেছেন, “আমাকে সব সময় জিজ্ঞাসা করা হয় যে কবে খেলা ছাড়ব। তবে এ সব নিয়ে এখনই ভাবতে বা কথা বলতে রাজি নই। এখনও লড়ার মনোভাব রয়েছে। যে দিন সেই দিনটা আসবে সে দিন আপনাদের সঙ্গে ভাগ করবে নেব। তখন বিদায়ের ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করব।”
এঁদের যাঁরা পরীক্ষার মুখে ফেলতে পারেন, তাঁদের মধ্যে টোকিয়ো অলিম্পিক্সে সোনাজয়ী আলেজ়ান্ডার জ়েরেভ রয়েছেন। তিনি গত বার ফাইনালে হেরেছিলেন সিনারের কাছে। এ ছাড়া বিশ্বের পাঁচ নম্বর লরেঞ্জো মুসেত্তি এবং অস্ট্রেলিয়ার আলেক্স ডি মিনর রয়েছেন। স্ট্যান ওয়ারিঙ্কা শেষ বার অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে খেলবেন।
মেয়েদের বিভাগে লড়াইটা এতটা তীব্র নয়। কিজ় গত বার অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জেতার পর সারা বছর একটিও ট্রফি জিততে পারেননি। ফলে নজর থাকবে সাবালেঙ্কা এবং শিয়নটেকের দিকেই। ২০২৩ থেকে মেলবোর্নে সাবালেঙ্কার নজির ২০-১। গত বারের ফাইনালে হেরেছিলেন। দু’বছরে সেটাই একমাত্র হার। দু’বারের অস্ট্রেলিয়ান ওপেন বিজয়ী সাবালেঙ্কা সম্প্রতি ব্রিসবেন ওপেন জিতেছেন। ১১ হাজার পয়েন্ট নিয়ে তিনিই মেয়েদের বিভাগে বিশ্বের এক নম্বর খেলোয়াড়। দ্বিতীয় স্থানাধিকারীর থেকে ২৫০০ পয়েন্টে এগিয়ে। দ্বিতীয় স্থানে থাকা শিয়নটেকের চেষ্টা থাকবে হার্ড কোর্টে নিজের সেরাটা দিয়ে ফর্মে ফেরার। হার্ড কোর্টে খেলতে সবচেয়ে বেশি সমস্যা হয় শিয়নটেকের।
শিয়নটেকের হাতে অস্ট্রেলিয়ান ওপেন উঠলে, তিনি মারিয়া শারাপোভার পর মেয়েদের বিভাগে কনিষ্ঠতম খেলোয়াড় হিসাবে কেরিয়ার স্ল্যাম সম্পূর্ণ করবেন। সম্প্রতি পোল্যান্ডকে ইউনাইটেড কাপ জিতিয়ে ভাল ছন্দেও রয়েছেন।
হিসাবের বাইরে রাখা যাবে না কোকো গফকেও। নিজের সার্ভিসকে অনেকটাই বাগে আনতে পেরেছেন। প্রথম বার অস্ট্রেলিয়ান ওপেন জিততে মরিয়া তিনিও। প্রতিযোগিতা শুরুর আগে তিনি পুরস্কারমূল্য বাড়ানোর দাবি তুলেছেন। বলেছেন, “এখনও অনেক আলোচনা বাকি। শুধু অস্ট্রেলিয়ান ওপেন নয়, বাকি সব স্ল্যাম নিয়েই আলোচনা হোক।” গত বার যিনি চমকে দিয়েছিলেন, সেই আমান্ডা আনিসিমোভার দিকেও নজর থাকবে। কালো ঘোড়া হতে পারেন এলিনা রিবাকিনাও।
একজন অবশ্য সবার অলক্ষ্যে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি ভিনাস উইলিয়ামস। পাঁচ বছর পর এ বার ওয়াইল্ড কার্ড পেয়ে খেলতে নামছেন অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে। ৪৫ বছরের খেলোয়াড় দু’বার সিঙ্গলস ফাইনাল খেলেছেন। এ ছাড়া মেলবোর্ন পার্কে পাঁচ বার ডাবলস জিতেছেন। বুড়ো হাড়ে তাঁরও যে দম কম নয়, সেটা বোঝাতে চাইবেন ভিনাস।