Bangriposhi Travel Guide

সাহিত্যের পাতায় তার স্থান, নদী অরণ্যের সান্নিধ্য উপভোগে দু’রাত্তির কাটিয়ে আসুন বাংরিপোসিতে

দু’রাতের গন্তব্য হোক ওড়িশার বাংরিপোসির অরণ্য। বুদ্ধদেব গুহের বইয়ের পাতার সেই বাংরিপোসি বাস্তবে কেমন?

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক
শেষ আপডেট: ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ১২:২৩
ওড়িশার বাংরিপোসি হোক শীত শেষের গন্তব্য।

ওড়িশার বাংরিপোসি হোক শীত শেষের গন্তব্য। ছবি: সংগৃহীত।

বাংরিপোসির অরণ্য এখনও যাঁরা চাক্ষুষ করেননি, মনে মনে তাঁদের অনেকেই ছবি এঁকে নিয়েছেন হয়তো। মনোজগতে অরণ্যের অপার্থিব রূপকেই জীবন্ত করে তুলেছিলেন সাহিত্যিক বু্দ্ধদেব গুহ তাঁর ‘বাংরিপোসির দু’রাত্তির’ উপন্যাসে।

Advertisement

বইয়ের সেই বাংরিপোসির ঠিকানা ওড়িশার ময়ূরভঞ্জ জেলায়। পুরুলিয়া-বাঁকুড়া ঘুরেছেন? এ বার সরাসরি বইয়ের পাতায় পড়া বাংরিপোসিকে দেখতে চলুন। কলকাতা থেকে দূরত্ব খুব বেশি নয়। দুই রাত্তির কাটিয়ে এলে, এখনও খুঁজে পাবেন অরণ্যের অকৃত্রিম রূপ, ধোঁয়াটে পাহাড়। অনুভবের দৃষ্টি থাকলে দুয়ারসিনি পাহাড় চূড়ার সূর্যাস্ত আজও মুগ্ধ করবে। আর এই সবের মধ্যেই হয়তো জীবন্ত হয়ে উঠবে গল্পের নায়ক-নায়িকারা।

পাহাড়-অরণ্য, জলাধার, নদীর মন ভাল করা সৌন্দর্য রয়েছে বাংরিপোসিতে।

পাহাড়-অরণ্য, জলাধার, নদীর মন ভাল করা সৌন্দর্য রয়েছে বাংরিপোসিতে। ছবি:সংগৃহীত।

সাহিত্যিকের বর্ণনার সঙ্গে এখনকার বাংরিপোসির কিঞ্চিৎ অমিল থাকতেই পারে। সময়ের গ্রাসে বদল অনিবার্য। তবে সবটুকু ফুরোয়নি। এখনও দেখতে পাবেন বুড়িবালামের বয়ে চলা, ঠাকুরানী পাহাড় আর ব্রাহ্মণ কুণ্ডের স্বচ্ছ জল। গহীন অরণ্য আজও বুকে প্রতিধ্বনি তোলে।

ময়ূরভঞ্জের বড় একটি শহর বারিপদা। সেখান থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে ওড়িশার এক নির্জন অরণ্যঘেরা গ্রাম বাংরিপোসি। বর্ষায় অরণ্য সবুজ, আর বসন্তের ছোঁয়ায় তা রোম্যান্টিক। বাংরিপোসির নির্জনতা, প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে যাতায়াত বাদে দু’রাত্তির থেকে যেতে হবে সেখানেই। আর যদি রাত্রিবাসের দোসর হয় জ্যোৎস্না, তবে আপনিও অনুভব করতে পারবেন, অরণ্যের সেই অপার্থিব সৌন্দর্য।

বাংরিপোসির অরণ্যের মধ্যে কোনও হোটেলে দু’টি দিন অলসযাপনেই কাটিয়ে দেওয়া যায়। তবে ঘোরাঘুরির শখ থাকলে গাড়ি ভাড়া করে নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন আশপাশ। বারিপদাকে কেন্দ্র করেই রয়েছে পর্যটনস্থলগুলি।

দর্শনীয় কী কী?

ব্রাহ্মণ কুণ্ড

ব্রাহ্মণ কুণ্ড জায়গাটিও গাছগাছালি ঘেরা। জলস্রোত থেকে কুণ্ড তৈরি হয়েছে।

ব্রাহ্মণ কুণ্ড জায়গাটিও গাছগাছালি ঘেরা। জলস্রোত থেকে কুণ্ড তৈরি হয়েছে। ছবি:সংগৃহীত।

পাহাড়-অরণ্যের ঘেরাটোপে রয়েছে ব্রাহ্মণ কুণ্ড। বাংরিপোসি থেকে দূরত্ব ৭ কিলোমিটারের মতো। স্বচ্ছ শীতল জলের কুণ্ড আর নিরালা পরিবেশ যেন মনকে নিমেষে শান্ত করে দেয়। এই পথেরই সঙ্গী হবে বুড়িবালাম নদী। নদীটি চাঁদিপুর হয়ে বালেশ্বর চলে গিয়েছে। ব্রাহ্মণ কুণ্ড দেখতে যাওয়ার পথেই চোখে পড়বে ঠাকুরানী পাহাড়। বর্ষায় কুণ্ড জলে ভরে থাকে, শীতের দিনে জল কম। রুক্ষতা বেশি। তবে স্থানীয় পিকনিক পার্টির ভিড় না থাকলে, এই জায়গা মন ছুঁয়ে যাবে।

দুয়ারসিনি মন্দির

দুয়ারসিনি মন্দির।

দুয়ারসিনি মন্দির। ছবি:সংগৃহীত।

অরণ্যের মধ্যে পাহাড় ঘেরা স্থান রয়েছে দুয়ারসিনির মন্দির। আদিবাসীদের কাছে এই মন্দিরের দেবী অত্যন্ত জাগ্রত। এক সময় অরণ্যপথে নির্বিঘ্নে যাত্রার জন্য মায়ের আশীর্বাদ নেওয়া হত। মন্দিরচত্বরটি বাঁধানো, রঙিন কারুকাজ রয়েছে দেওয়ালে।

শঙ্করমারা জলাধার

শঙ্করমারা জলাধারটিও রাখুন ভ্রমণতালিকায়।

শঙ্করমারা জলাধারটিও রাখুন ভ্রমণতালিকায়। ছবি:সংগৃহীত।

বাংরিপোসি থেকে সরাসরি আসাই সুবিধাজনক। দূরত্ব মোটে ২০ কিলোমিটার। সময় লাগবে ৪০-৪৫ মিনিট। ছোট-বড় টিলার মতো সবুজ পাহাড় ঘিরে রয়েছে জলাধারকে। স্থানগুলি নির্জন, কারণ পর্যটকেরা এই জায়গাগুলির কথা বড় একটা জানেন না। স্থানীয়েরা অবশ্য শীতের দিনে ঘুরতে আসেন, কখনও পিকনিকেরও আসর বসে। তবে লোকজন না থাকলে এই জায়গার নির্জনতা মনকে মুগ্ধ করবে। বর্ষাভেজা প্রকৃতির রূপও এখানে অতুলনীয়।

বাঁকবল জলাধার এবং সুলাইপাত: ব্রাহ্মণকুণ্ড থেকে ৫৬ কিলোমিটার দূরে ময়ূরভঞ্জের দর্শনীয় স্থান বাঁকবল। পাহাড় ঘেরা জলাধারটি দেখতে ভারি সুন্দর। আর একটি সুন্দর জলাধার সুলাইপাত। পাহাড় যেন বেড় দিয়ে রেখেছে সুলাইপাত বা সুলেইপাত জলাধারকে। খড়কাই নদীর উপর বাঁধ দিয়ে সুলাইপাত জলাধারের সৃষ্টি। হেঁটে পুরোটা ঘোরা কষ্টকর। বরং গাড়ি করে জলাধারটি এক চক্কর দিয়ে আসতে পারেন।

বাদামপাহাড়: বাংরিপোসি থেকে ঘোরাঘুরির তালিকায় রাখতে পারেন বাদামপাহাড়ও। আসলে দর্শনীয় স্থানগুলি যতটা সুন্দর, ততটাই উপভোগ্য সেখানে পৌঁছোনোর রাস্তাও। বাংরিপোসি থেকে দূরত্ব প্রায় ৬৫ কিলোমিটার। পথেই সঙ্গ দেবে ঢেউ খেলানো পাহাড়। নির্মল প্রকৃতি, আদিবাসী গ্রাম, মোরামের রাস্তা মনে করিয়ে দেবে সাহিত্যের পাতায় গ্রাম-অরণ্যের বর্ণনার কথা। লৌহ খনির উপস্থিতির জন্য এই অঞ্চলের মাটি লাল। ধুলোর স্তর জমে গাছ-পালাও তেমনটাই দেখায়। বাদামপাহাড় নামটি যেন আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নির্জনতা তাকে পরিচিতি দিয়েছে।

এ ছাড়াও ঘুরে নিতে পারেন সিমলিপালের পীথাবাটা প্রবেশদ্বারের আগেই অরণ্যপথে গিয়ে সীতাকুণ্ড। বাংরিপোসি থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে কুলিয়ানার ডোকরা গ্রামও জুড়ে নিতে পারেন ভ্রমণতালিকায়। ২ রাত থেকে যদি ভ্রমণ ৩ রাতের হয়, তা হলে জুড়ে নেওয়া যায় সিমলিপাল অভয়ারণ্যও।

এক দিন ব্রাক্ষণকুণ্ড, দুয়ারসিনি মন্দির, বাঁকাবল, সুলাইপাত জলাধার, বাদামপাহাড় ঘুরে নিন। পরের দিনটি রাখুন শঙ্করমারা হ্রদ, সীতাকুণ্ড, সিমলিপালের অরণ্যের কাছে লুলুং ঘোরার জন্য।

কী ভাবে যাবেন?

ধর্মতলা থেকে এসি ভলভো বাসে বাংরিপোসি যেতে পারেন। বারিপদার বাস ধরেও সেখান থেকে বাকিটা গাড়ি ভাড়া করে ঘুরে নিতে পারেন। বারিপদা থেকেও বাংরিপোসির বাস মিলবে। ট্রেনে সরাসরি যাওয়া যায় না। তবে বারিপদা পৌঁছে গাড়ি ভাড়া করে যাওয়া যাবে।

কোথায় থাকবেন?

বাংরিপোসিতে থাকার জন্য তিন-চারটি হোটেল রয়েছে। তবে বারিপদাতেও অনেক হোটেল পাবেন। সেখান থেকেও ঘোরা যায়। তবে অরণ্যের সৌন্দর্য উপভোগ করতে হলে বাংরিপোসিতেই থাকতে হবে।

Advertisement
আরও পড়ুন