Baruipur Incident

গণপিটুনিতে নিহতের অটোতেই তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বারুইপুরের কিশোরীকে? খুন-সহ তিনটি মামলা রুজু, তদন্তে সিট

কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের দাবি, মমতা বারুইপুরে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে ‘আটকাতে’ তাঁর বাড়ির সামনে বিশাল পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। কিশোরীর পরিবারের সঙ্গে তিনি ফোনে কথা বলেছেন বলেও দাবি করা হয়েছে।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৬ ২২:১৮
বারুইপুরে দেহ ঘিরে বিক্ষোভ।

বারুইপুরে দেহ ঘিরে বিক্ষোভ। — নিজস্ব চিত্র।

এক দিন নিখোঁজ থাকার পরে রবিবার সকালে বারুইপুরে পুকুর থেকে উদ্ধার হয় ১২ বছরের কিশোরীর দেহ। পরিবারের দাবি, কিশোরীকে ধর্ষণ করে খুন করা হয়েছে। তার পর থেকেই ওই ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হয়েছে এলাকা। এক যুবককে পিটিয়ে খুন করার অভিযোগ উঠেছে। সূত্রের খবর, ওই যুবক পেশায় অটোচালক। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, শনিবার বিকেলে ওই যুবকের অটোতেই কিশোরীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। বিক্ষোভের পরিস্থিতি সামাল দিতে মোতায়েন করা হয় বিশাল পুলিশ বাহিনী। ওই ঘটনায় খুনের মামলা রুজু করে এক জনকে গ্রেফতারও করা হয়েছে। তদন্তের জন্য গঠিত হয়েছে সিট (বিশেষ তদন্তকারী দল)। নিহত তরুণীর বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলে সাহায্যের আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের দাবি, কিশোরীর পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একটি ফেসবুক লাইভে মমতার অভিযোগ, তাঁকে কার্যত নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে।

Advertisement

শনিবার বিকেলে খাবার কিনতে বেরিয়ে আর ফেরেনি কিশোরী। স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, ওই কিশোরীকে চার জন তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন। কারও কারও দাবি, একটি অটোয় চাপিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। সেই অটোর চালককে পিটিয়ে খুন করার অভিযোগ উঠেছে। নিখোঁজ হওয়ার আগে যে ব্যক্তির সঙ্গে কিশোরীকে শেষ বার দেখা গিয়েছিল, তাঁকে ইতিমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। রাতেই কিশোরীর দেহের ময়নাতদন্ত শেষ হয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, রিপোর্ট এলে বোঝা যাবে খুনের কারণ। তাকে ধর্ষণ করা হয়েছিল কি না, জানা যাবে তা-ও। সেই মতো রুজু করা হবে মামলা।

কী ঘটেছিল

পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, কিশোরী শনিবার বিকেলে খাবার কিনতে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল। তার পর থেকে তার খোঁজ মেলেনি। পরিবারের অভিযোগ, চার জন তাকে তুলে নিয়ে যায়। রবিবার সকালে বাড়ির অদূরে একটি পুকুরে কিশোরীর দেহ মেলে। তার পরেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে এলাকা। দেহ ঘিরে রেখে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন স্থানীয়েরা। পথ অবরোধ করেন। সূর্যপুর স্টেশনেও অবরোধ হয়। এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাঁকে জেরা করা হচ্ছে।

বিক্ষোভ

রবিবার সকালে তরুণীর দেহ ঘিরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন স্থানীয়দের একাংশ। শিয়ালদহ-নামখানা লাইনে অবরোধের জেরে ঘণ্টাখানেক বন্ধ থাকে ট্রেন চলাচল। প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বন্ধ থাকে সড়কও। পুলিশ প্রথমে গেলে তাদের ঢিল ছুড়ে মারার অভিযোগ ওঠে উন্মত্ত জনতার বিরুদ্ধে। জনতাকে ছত্রভঙ্গ করতে পুলিশকে লাঠিচার্জ করতে হয়। বিক্ষোভ চলাকালীন স্থানীয় এক যুবককে পিটিয়ে খুন করার অভিযোগ উঠেছে। এই অবস্থায় ঘটনাস্থলে পৌঁছোয় পুলিশ। মোতায়েন হয় বিশাল বাহিনী। শেষপর্যন্ত পুলিশ কিশোরীর দেহ উদ্ধার করে বারুইপুর মহকুমা হাসপাতালে নিয়ে যায়। দুপুর নাগাদ পুলিশের হস্তক্ষেপে সড়ক অবরোধ তুলে নেন বিক্ষোভকারীরা। স্টেশন থেকেও সরে যান বিক্ষোভকারীরা। ট্রেন চলাচল শুরু হয় নামখানা-শিয়ালদহ লাইনে।

মুখ্যমন্ত্রীর আশ্বাস

মৃতার বাবার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এই ঘটনায় যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন তিনি। মঙ্গলবার কিশোরীর বাবাকে ভবানীভবনেও যেতে বলেছেন। আইজি (প্রেসিডেন্সি রেঞ্জ) কঙ্করপ্রসাদ বাড়ুই আশ্বাস দিয়ে বলেন, ‘‘এই ঘটনার সঙ্গে যাঁরা জড়িত, সকলকে গ্রেফতার করা হবে। ফাঁসির সাজা যাতে দেওয়া হয়, সেই চেষ্টা করব। একটু আগে মুখ্যমন্ত্রী ফোন করেছিলেন। কথা দিয়েছেন, এই মামলার সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁদের কাউকে ছাড়া হবে না। যা ব্যবস্থা গ্রহণ করার করব। সব ধরনের সাহায্য করতে বদ্ধপরিকর।’’ তার পরে তিনি আরও বলেন, ‘‘আপনারা সহযোগিতা করুন। আজকের মধ্যে দেহের ময়নাতদন্ত যাতে হয়ে যায়, তা দেখছি। দরকারে আমি নিজে হাসপাতালে গিয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে ভিডিয়োগ্রাফি করে ময়নাতদন্ত করাব। আমি যা বলি, তা-ই করি। সব সময় পাশে রয়েছি। দোষীরা কেউ ছাড়া পাবে না।’’

সিট-তদন্ত

এই ঘটনায় বারুইপুর থানায় মোট তিনটি মামলা রুজু হয়েছে। এক, নাবালিকার খুনের মামলা, দুই, পুলিশের উপর হামলা, তিন, পিটিয়ে মারার ঘটনায় মামলা। তদন্তের জন্য ছয় সদস্যের সিট গঠন করা হয়েছে। তাতে রয়েছেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, এসডিপিও, বারুইপুর থানার আইসি। পুলিশকর্তার আশ্বাসমতো রাতেই ময়নাতদন্ত শেষ হয়েছে নাবালিকার। কাঁটাপুকুর মর্গ থেকে দেহ বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়েছে। ধৃতকে সোমবার বারুইপুর আদালতে হাজির করানো হবে।

মমতাকে বাধাদানের অভিযোগ

কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের দাবি, কিশোরীর পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কালীঘাটপন্থী এক তৃণমূল সদস্যের ফেসবুক লাইভে মমতা অভিযোগ করেন, তিনি একাই বারুইপুরে গিয়ে মৃতার পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। তার পর থেকে তাঁকে কার্যত নজরবন্দি করে রাখা হয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁর। বিধায়ক কুণাল ঘোষ সমাজমাধ্যমে একটি পোস্ট দিয়ে দাবি করেন, নেত্রী মমতা বারুইপুরে যেতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে ‘আটকাতে’ তাঁর বাড়ির সামনে বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। সোমবারও তা থাকবে বলে দাবি কুণালের। মমতার বাড়ির সামনে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের ছবি সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে কটাক্ষ করেন সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েন, মহুয়া মৈত্রেরা। সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় আঙুল তুলেছেন রাজ্যের বিজেপি সরকারের দিকে। তাঁর কটাক্ষ, মহিলা সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসেছিল বিজেপি। এই ধরনের ঘটনা তাদের ‘শূন্য প্রতিশ্রুতি’ নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

Advertisement
আরও পড়ুন