টিভির পর্দায় চোখ অশোকের মায়ের। ছবি: নির্মাল্য প্রামাণিক ।
শুক্রবার রাতেই ফোন করে ছেলে জানিয়েছিল, “মা, আমি রাজ্যের মন্ত্রী হচ্ছি। কাল শপথ নেব।” ঘুম উড়ে গিয়েছিল বৃদ্ধা অহল্যা কীর্তনিয়ার। সারারাত অতীতের একের পর এক অভাব, লড়াই, অপমান আর সংগ্রামের কথা ফিরে এসেছে তাঁর স্মৃতিতে।
শনিবার দুপুরে বনগাঁ শহরের রামনগর রোডের বাড়িতে টিভির সামনে বসেছিলেন তিনি। ব্রিগেড মঞ্চে রাজ্যপাল যখন ছেলে অশোক কীর্তনিয়াকে শপথবাক্য পাঠ করাচ্ছেন, তখন টিভির পর্দায় হাত রেখে চোখের জল মুছছিলেন বৃদ্ধা মা। আবেগে কাঁপা গলায় বললেন, “কত কষ্ট করে দুই ছেলেকে মানুষ করেছি। খেতমজুরের কাজ করেছি। বাড়িতে ছাগল পুষেছি। ঝড়ে পড়া আম কুড়িয়ে ঝুড়িতে করে বিক্রি করেছি। অনেক দিন না খেয়ে থেকেছি। এমনও হয়েছে অশোক খালি পেটে পরীক্ষা দিতে গিয়েছে। আজ মনে হচ্ছে, সব কষ্ট সার্থক হয়েছে।”
স্মৃতির গভীরে ডুব দিয়ে অহল্যা বলে চলেন, “ছোটবেলায় একবার অশোককে মেরেছিলাম। রাগ করে পুকুরে ঝাঁপ দিয়ে লুকিয়ে ছিল। অনেক খোঁজাখুঁজির পর ওকে তুলে এনেছিলাম। এখনও যদি দেখি মানুষের জন্য ঠিকমতো কাজ করছে না, তাহলে আবারও দু’ঘা কষিয়ে দেব!” মায়ের মন্তব্য শুনে ছেলের প্রতিক্রিয়া, “মা এখনও অন্যায় করলে আমাকে বকেন, মারেনও। মায়ের এই শাসন, এই শিক্ষাই আমাকে আজকের জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে।”
বনগাঁর পাইকপাড়া এলাকায় অশোকদের আদি বাড়ি। মন্ত্রী হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই এলাকায় আবেগের বিস্ফোরণ ঘটে। শৈশবের বন্ধু, স্কুলের সহপাঠীরা কেউ আনন্দে কেঁদেছেন, কেউ মিষ্টি বিলিয়েছেন।
সহপাঠী বাপি বিশ্বাস বলেন, “অভাব কাকে বলে, আমরা চোখের সামনে দেখেছি। সংসারের টানাপোড়েনে অশোককে ভ্যান চালাতে হয়েছে। লোকের দোকানে কাজ করেছে। কিন্তু কখনও হাল ছাড়েনি। আজ ও মন্ত্রী হয়েছে, এটা শুধু ওর সাফল্য নয়, এলাকার গর্ব।” প্রতিবেশী চিত্তরঞ্জন মল্লিকের কথায়, “অনেক লড়াই করে ছেলেটা বড় হয়েছে।”
শপথ নেওয়ার পরে নিজের রাজনৈতিক জীবনের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ দিনের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন অশোক। বলেন, “ঈশ্বর সুযোগ দিয়েছেন, আমি বনগাঁকে সোনার বনগাঁ করব। এমন কাজ করতে চাই, যাতে একশো বছর পরেও মানুষ সে কথা মনে রাখেন। বনগাঁর মানুষ যেন প্রাণ খুলে বাঁচতে পারেন, সেই পরিবেশ গড়ে তুলব। এখানে কোনও দুষ্কৃতীরাজ চলবে না— না বিজেপির, না তৃণমূলের।”
শনিবার সকাল থেকেই বনগাঁ শহর কার্যত উৎসবের চেহারা নেয়। শহরের বিভিন্ন মোড়ে জায়ান্ট স্ক্রিন বসানো হয় শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান দেখানোর জন্য। হাজার হাজার মানুষ সেখানে ভিড় করেন। গেরুয়া আবির মেখে বাইক মিছিল বেরোয় শহরের নানা প্রান্তে। লাড্ডু বিতরণ করা হয়। বাজি ফাটানো হয়। বহু জায়গায় অশোক কীর্তনিয়ার ছবি দিয়ে শুভেচ্ছা ব্যানার টাঙানো হয়েছে।
বিকেলে অশোক বনগাঁয় ফিরতেই জনসমুদ্র নেমে আসে রাস্তায়। সিকদারপল্লি এলাকা থেকে যশোর রোড ধরে খোলা গাড়িতে বিশাল মিছিল করে তাঁকে বাড়ি পৌঁছে দেন কর্মী-সমর্থকেরা। অশোকের স্ত্রী মৌমিতার কথায়, “মন্ত্রীর স্ত্রী হিসেবে সমাজের প্রতি আমারও দায়িত্ব অনেক বেড়ে গেল।”
১৯৬২ সালের পরে এই প্রথম বনগাঁ শহরের কোনও বাসিন্দা পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন। ১৯৬২ সালে ভোটে জিতে জীবনরতন ধর স্বাস্থ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন বিধানচন্দ্র রায়ের মন্ত্রিসভায়।
খেতমজুরের ঘরের ছেলে আজ রাজ্যের পূর্ণমন্ত্রী। মায়ের চোখের জল, প্রতিবেশীর গর্ব, সহপাঠীর কান্না আর হাজার হাজার মানুষের প্রত্যাশা— সব মিলিয়ে শনিবার শুধু একটি রাজনৈতিক শপথের দিন ছিল না, বনগাঁর ইতিহাসে এক আবেগঘন অধ্যায় হয়ে রইল।