—প্রতীকী চিত্র।
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়ার শুনানি-পর্ব শেষ হতেই উত্তর ২৪ পরগনা জেলাকে ঘিরে সামনে এল উদ্বেগজনক চিত্র। নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা গিয়েছে, বহু আবেদনকারী শুনানিতে অনুপস্থিত ছিলেন।
জেলায় প্রায় ১ লক্ষ ২৭ হাজার মানুষের নাম সংশয়ের তালিকায় আছে। এঁদের মধ্যে শুনানি অনুপস্থিত এবং উপস্থিত থাকলেও নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত নথি জমা দিতে না পারা মানুষজন আছেন। প্রশাসনের একটি সূত্র জানাচ্ছে, প্রয়োজনীয় নথি জমা না পাড়ায় তা জেলা নির্বাচন আধিকারিকের কাছে পাঠাতে পারেননি ব্লক প্রশাসনের কর্তারা।
সীমান্তবর্তী এই জেলায় বিপুল সংখ্যক অনুপস্থিতির ঘটনায় প্রশাসনিক মহল থেকে রাজনৈতিক অঙ্গন—সব মহলেই শুরু হয়েছে আলোচনা।
জেলা প্রশাসনের একাধিক সূত্রের দাবি, যাঁদের কাছে বৈধ নথি ছিল, তাঁরা অধিকাংশই শুনানিতে উপস্থিত হয়েছেন। কিন্তু যাঁদের প্রয়োজনীয় কাগজপত্রে ঘাটতি ছিল বা নথি নিয়ে সংশয় ছিল, তাঁদের অনেকে হাজির হননি। জেলার এক ব্লক প্রশাসনের কর্তার কথায়, “যাঁরা শুনানিতে যাননি, তাঁদের অনেকেরই এনুমারেশন ফর্ম পাওয়ার কথা ছিল না। বহু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে, বুথ লেভেল অফিসার এলাকায় গিয়ে আবেদনকারীকে খুঁজে না পেলেও অন্য কেউ আত্মীয় পরিচয়ে ফর্ম সংগ্রহ করেছেন। রাজনৈতিক দলের নেতারাও ফর্ম নিয়েছেন। পরে কড়াকড়ি শুরু হতেই তাঁরা আর সামনে আসেননি।”
আরও গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে প্রশাসনিক স্তরে। এক ব্লক কর্তার দাবি, “এমন ঘটনাও চিহ্নিত হয়েছে, যেখানে বাস্তবে ওই ব্যক্তি এলাকায় বসবাসই করেন না। সীমান্তের ওপারে থাকেন, অথচ এখানে ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য এনুমারেশন ফর্ম তোলা হয়েছিল।” যদিও এই অভিযোগ এখনও পূর্ণাঙ্গ ভাবে যাচাই করা হয়নি, তবে বিপুল অনুপস্থিতির সঙ্গে এই তথ্যকে মিলিয়ে দেখছে প্রশাসন।
উত্তর ২৪ পরগনা দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্তঘেঁষা জেলা হিসেবে বিশেষ নজরে থাকে। অতীতে একাধিক বার অভিযোগ উঠেছে—বাংলাদেশি নাগরিকেরা এপারে আত্মীয়স্বজন বা পরিচিত ব্যক্তিকে অভিভাবক দেখিয়ে ভোটার তালিকায় নাম তুলেছেন। কখনও শ্বশুর-শাশুড়িকে মা-বাবা পরিচয় দেওয়া হয়েছে, কখনও বা ভাড়া বাড়ির মালিককে পিতৃপরিচয় হিসেবে দেখানো হয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, এ ধরনের নাম অন্তর্ভুক্তির চেষ্টাও এ বার ধরা পড়ে থাকতে পারে। যাঁদের নথি যাচাই নিয়ে সংশয় ছিল, তাঁদের বড় অংশই শুনানিতে অনুপস্থিত থেকেছেন বলে অনুমান করা হচ্ছে।
এ ছাড়া, জেলায় ভুয়ো নথি তৈরি ও সরবরাহের একটি চক্র বহু দিন ধরেই সক্রিয়—এমন অভিযোগ নতুন নয়। টাকার বিনিময়ে ভুয়ো ঠিকানার প্রমাণ বা পরিচয়পত্র সংগ্রহ করে ভোটার তালিকায় নাম তোলার অভিযোগ অতীতেও প্রকাশ্যে এসেছে। এ বার কমিশনের কড়াকড়ি ও নথি যাচাইয়ের কঠোরতার কারণে সে ধরনের আবেদনকারীদের একাংশ শুনানিতে আসতে সাহস পাননি বলে মনে করছেন প্রশাসনের আধিকারিকদের একাংশ।
তবে প্রশাসনের একাংশ সতর্ক করে দিচ্ছেন, অনুপস্থিত মানেই ভুয়ো—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছনো ঠিক নয়। কর্মসূত্রে ভিন্ রাজ্যে থাকা, অসুস্থতা, নোটিস না পাওয়া বা শুনানির তারিখ সম্পর্কে অজ্ঞতা—এমন কারণেও অনেকে হাজির না হয়ে থাকতে পারেন। ফলে চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশের আগে সমস্ত বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
এখন প্রশ্ন, এই ১ লক্ষ ২৭ হাজার আবেদনের ভবিষ্যৎ কী? কমিশন সূত্রে ইঙ্গিত, যাঁরা শুনানিতে হাজির হননি এবং প্রয়োজনীয় নথি জমা দেননি, তাঁদের আবেদন খারিজ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় বড়সড় পরিবর্তন দেখা যেতে পারে। যদিও বিধি অনুযায়ী আপিলের সুযোগ থাকবে কি না এবং থাকলে কী ভাবে—সে সব বিষয় কমিশনের আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির উপরে নির্ভর করবে।