West Bengal Assembly Election 2026

স্থানীয় না কি বহিরাগত প্রতিনিধি শাসকদলের, চোরা স্রোত খড়দহে

বিটি রোড ও কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে সংলগ্ন ‘কুলীন’ বিধানসভা বলে পরিচিত খড়দহে শাসকদলের প্রার্থী কে? রাজ্যে ভোট ঘোষণা হতেই সেই জল্পনা এখন তুঙ্গে। তা আরও জোরদার হয়েছে, বিদায়ী বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় এ বার দক্ষিণ কলকাতার কোনও কেন্দ্রের প্রার্থী হতে পারেন খবর চাউর হতেই।

শান্তনু ঘোষ
শেষ আপডেট: ১৬ মার্চ ২০২৬ ০৯:৪৭

—প্রতীকী চিত্র।

সিংহাসনের দাবিদার কে? এ বারেও কোনও বহিরাগত, না কি ভূমিপুত্র? না কি অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব?

বিটি রোড ও কল্যাণী এক্সপ্রেসওয়ে সংলগ্ন ‘কুলীন’ বিধানসভা বলে পরিচিত খড়দহে শাসকদলের প্রার্থী কে? রাজ্যে ভোট ঘোষণা হতেই সেই জল্পনা এখন তুঙ্গে। তা আরও জোরদার হয়েছে, বিদায়ী বিধায়ক শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় এ বার দক্ষিণ কলকাতার কোনও কেন্দ্রের প্রার্থী হতে পারেন খবর চাউর হতেই। সূত্রের খবর, খড়দহের আসন ফাঁকা হচ্ছে বলে এক প্রকার ধরে নিয়েই রাজনীতির শীর্ষ নেতৃত্বের আলোয় আলোকিত অরাজনৈতিক লোকজনও নিজেদের মতো অঙ্ক কষতে শুরু করেছেন। যদিও ‘অঙ্ক-দৌড়’-এর এই প্রতিযোগিতায় কালীঘাট, না কি ক্যামাক স্ট্রিট— কার সাজেশনে অঙ্ক মিলবে, সেটাই বড় বিষয়। শাসকদলের এক শীর্ষ নেতৃত্বের কথায়, ‘‘আর তো দিন কয়েকের অপেক্ষা, তার পরেই স্পষ্ট হবে।’’

অপেক্ষার পারদ যত চড়ছে, খড়দহে শাসকদলের অন্দরের বড়, মাঝারি থেকে ছোট নেতাদের উত্তেজনা ততই বাড়ছে। কারণ, চরম গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে বিদ্ধ এই বিধানসভায় কার বা কাদের গোষ্ঠীর ঘনিষ্ঠ শেষ ছক্কা হাঁকাবেন, তা স্পষ্ট নয়। বর‌ং, খড়দহের আকাশে-বাতাসে ভাসছে একাধিক নাম। তাতেই স্থানীয় নেতৃত্বের একাংশের সংশয়, এ বারওবহিরাগত কেউ খড়দহের প্রার্থী হবেন না তো? এক প্রবীণ নেতার কথায়, ‘‘বহিরাগত হলে সেই অভিভাবকহীন হতে হবে।’’

ইতিহাস বলছে, বাম আমল থেকেই খড়দহে মূলত বহিরাগতেরা বিধায়ক হয়েছেন। ব্যতিক্রম শুধু সিপিএমের সাধনকুমার চক্রবর্তী। ১৯৬৭ থেকে ’৭১ সাল পর্যন্ত বিধায়ক ছিলেন ওই ভূমিপুত্র। তার পরে বাম আমলের অর্থমন্ত্রী অসীম দাশগুপ্ত এবং পরিবর্তনের রাজ্যে তৃণমূলের অর্থমন্ত্রী অমিত মিত্র, সকলেই ছিলেন খড়দহের বহিরাগত বিধায়ক। ২০২১ সালে অবশ্য শাসকদল প্রার্থী করেছিল পুরপ্রধান কাজল সিংহকে। নির্বাচনে জিতলেও ফল ঘোষণার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। এর পরে উপনির্বাচনে প্রার্থী হন আদ্যোপান্ত দক্ষিণ কলকাতার নেতা বলে পরিচিত শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়।

কিন্তু এ বার কে? স্থানীয় সূত্রের খবর, বেশ কয়েক মাস ধরেই শাসকদলের এক শীর্ষ নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত, অরাজনৈতিক এক জনের নাম ঘোরাফেরা করছে। আবার ছাত্র রাজনীতি করে উঠে আসা, কিন্তু এখন প্রত্যক্ষ ভাবে রাজনীতিতে না-থাকা আরও এক জনের নামও আচমকাই ভাসছে ওই প্রতিযোগিতায়। শোনা যাচ্ছে প্রাক্তন এক স্থানীয় নেতৃত্বের আত্মীয়ের নামও। আর এই সব কিছু ঘিরে তীব্র সংশয়ের বাতাবরণে স্থানীয় নেতা-কর্মীরাও প্রত্যেকেই নিজের মতো করে দলের উপরের স্তরে বিভিন্ন সমীকরণের বার্তা পৌঁছে দিতে শুরু করেছেন।

সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত স্থানীয় দুই নেতৃত্বের ঘনিষ্ঠেরা সম্প্রতি সমাজমাধ্যমে তাঁদের ‘দাদা’-কে প্রার্থী করার দাবি তুলছেন। জল্পনা ও সংশয়ের দোলাচলে থাকা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শাসকদলের স্থানীয় স্তরের অনেক নেতাই বলছেন, ‘‘এ বার হয়তো রাজনৈতিক সন্ন্যাস নেওয়ার সময় এসেছে।’’ রাজনৈতিক মহল সূত্রের খবর, বিভিন্ন সমীকরণ ও গোষ্ঠী ‘কাঁটা’র কথা বিবেচনা করে অরাজনৈতিক কাউকে প্রার্থী করার ঝুঁকি হয়তো শেষ মুহূর্তে না-ও নিতে পারেন শাসকদলের শীর্ষ নেতৃত্ব। সে ক্ষেত্রে পাশ্ববর্তী কোনও বিধায়কের জায়গা বদলে তাঁকে কিংবা পড়শি কোনও নেতাকে খড়দহে নিয়ে আসা হয় কিনা, সেটিও জোরদার চর্চায়।

তবে বিরোধীরা বলছেন, ‘‘গোটা খড়দহ জুড়ে ওঁদের বড়-ছোট মিলিয়ে অন্তত ২০টা গোষ্ঠী রয়েছে। আগে নিজেদের সেই কোন্দল সামলাক। না হলেই তো চোরকাঁটায় নিজেরা নিজেদের খোঁচাবে।’’ গোষ্ঠী কোন্দল যে খড়দহে ক্রমশ প্রকট হয়েছে, তার প্রমাণ মেলে লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলে। ২০২১ সালে বিধানসভায় কাজল প্রায় ২৮ হাজার এবং উপনির্বাচনে শোভনদেব প্রায় ৯২ হাজার ভোটে জয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু ২০২৪-এর লোকসভায় খড়দহ বিধানসভায় শাসকদলের লিড ছিল মাত্র ১১ হাজার মতো। তার মধ্যে পুরসভা এলাকার ২২টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১১টিতে জিতে ১১০০ মতো ভোটে এগিয়ে ছিল তৃণমূল। চারটি পঞ্চায়েতের মধ্যে একটিতে শাসক দল হেরেছিল।

পছন্দের প্রার্থী না হলে, এ বারও গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের চোরাস্রোত খড়দহে বইবে কিনা, সেটাই বড় প্রশ্ন।

আরও পড়ুন