Abhishek Banerjee in Baruipur

২০২৬ সালে ২০২১ সালের চেয়ে একটি আসন হলেও বেশি পাবে তৃণমূল! ‘কর্মভূমি’ থেকে ঘোষণা ‘সেনাপতি’ অভিষেকের

দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে জনসভা করে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করেছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। জানিয়ে দিয়েছেন, এই জেলায় শাসকদলের লক্ষ্য ৩১-এ ৩১ এবং অন্তত আসনপ্রতি ৫০ হাজারের ব্যবধান।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ০২ জানুয়ারি ২০২৬ ২০:২১
বারুইপুরের মঞ্চে জোড় হাতে মাথা নিচু করে জনগণকে প্রণাম অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের।

বারুইপুরের মঞ্চে জোড় হাতে মাথা নিচু করে জনগণকে প্রণাম অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের। ছবি: সংগৃহীত।

২০২১ সালের চেয়ে ২০২৬ সালে একটি হলেও বেশি আসন জিতবে তৃণমূল। অর্থাৎ, ২৯৪টির মধ্যে অন্তত ২১৪টি আসন পাবে তারা। শুক্রবার বারুইপুরের জনসভা থেকে ঘোষণা করে দিলেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। পাশাপাশিই জানালেন, এই লক্ষ্যে পৌঁছোনোর জন্য যত পরিশ্রম করা দরকার, তিনি করবেন। যেখানে যাওয়ার দরকার, যাবেন। প্রসঙ্গত, অভিষেক বলেছেন, ২০২১ সালে তৃণমূল ২১৪টি আসন পেয়েছিল। আদতে সেই সংখ্যা ছিল ২১৩। পরে বিভিন্ন উপনির্বাচনে জিতে এবং বিজেপি থেকে বিধায়কদের যোগদান করিয়ে তৃণমূলের মোট আসনসংখ্যা আপাতত ২২৬।

Advertisement

প্রসঙ্গত , ২০২৪ সালের লোকসভা ভোটের আগেও এংমনই ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন অভিষেক। বলেছিলেন, তৃণমূল ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে যত আসন পেয়েছিল,স তার চেয়ে একটি হলেও বেশি আসন পাবে। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে তৃণমূল পেয়েছিল ২২টি আসন। ২০২৪ সালে তারা পায় ২৯টি আসন।

শুক্রবার বারুইপুরের ফুলতলা সাগরসঙ্ঘের মাঠে অভিষেক জনসভার করেন। ওই জনসভা থেকেই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরু করলেন ডায়মন্ড হারবারের সাংসদ। এর পর এমনই আরও সভা তিনি করবেন রাজ্যের বাকি জেলাগুলিতে। গোটা জানুয়ারি মাস ধরে অভিষেকের কর্মসূচি রয়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনা দিয়ে কেন প্রচার শুরু করলেন? মঞ্চেই সেই কৌতূহলের জবাব দিয়েছেন অভিষেক। দক্ষিণ ২৪ পরগনাকে নিজের ‘কর্মভূমি’ বলে উল্লেখ করেছেন। জানিয়েছেন, তিনি চান, সাফল্যের বাড়তি আসনটি এই জেলা থেকেই আসুক। বলেছেন, ‘‘আমার জন্মভূমি কালীঘাট। কর্মভূমি দক্ষিণ ২৪ পরগনা।’’ বক্তৃতার শেষে হাঁটু গেড়ে বসে মঞ্চের জমিতে মাথা ঠেকিয়ে জনতাকে প্রণামও করেছেন অভিষেক।

ভাঙড়ও চাই!

২০২৬-এর লক্ষ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ বলেন, ‘‘আমি দলের কর্মী-সমর্থক এবং বাংলার মানুষকে কথা দিয়েছিলাম, তৃণমূলের আসনসংখ্যা এবং ভোটশতাংশ ২০২১-এর নিরিখে ২০২৬-এ বাড়বে। ২০২১-এ তৃণমূল জিতেছিল ২১৪টি আসন। এ বার একটা হলেও আমাদের আসন বাড়বে।’’ উল্লেখ্য, দক্ষিণ ২৪ পরগনা বরাবরই তৃণমূলের শক্ত ঘাঁটি। গত বিধানসভা নির্বাচনে এই জেলায় ভাল ফল করলেও ভাঙড়ে জিততে পারেনি তৃণমূল। সেখানে নতুন দল আইএসএফ জিতেছিল। এ বার সেই খামতি পুষিয়ে দিতে চান অভিষেক। সভাস্থলে উপস্থিত দর্শকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘‘আপনাদের কথা দিতে হবে, সেই একটা আসন যেন দক্ষিণ ২৪ পরগনা থেকে আসে। এ বার ভাঙড়ও তৃণমূলকে জিততে হবে। এই জেলায় ৩১-এ ৩১ করতে হবে। তার জন্য যত পরিশ্রম দরকার করতে হবে, সঙ্ঘবদ্ধ ভাবে লড়তে হবে। আমাকে যেখানে যেতে বলবেন, আমি যাব। আপনারা এই জেলার দায়িত্ব নিন। আমি বাকি বাংলা বুঝে নেব।’’ এই জেলায় তৃণমূলের জয়ের ব্যবধান ৫০ হাজারের কম যেন না-হয়, দলের লক্ষ্য বেঁধে দিয়েছেন অভিষেক।

কর্মভূমির আশীর্বাদ

দক্ষিণ ২৪ পরগনাকে দিয়ে ভোটের প্রচার শুরু করা প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে অভিষেক বলেন, ‘‘আমরা কোনও শুভ কাজে গেলে আগে মা-বাবার আশীর্বাদ নিই। কালীঘাট যদি আমার জন্মভূমি হয়, দক্ষিণ ২৪ পরগনা আমার কর্মভূমি। এই মাটিতেই যেন আমার মৃত্যু হয়। এখানকার মানুষের আশীর্বাদ নিয়ে তাই আমি লড়াই শুরু করলাম।’’ পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতির পালাবদলে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভূমিকা অপরিসীম বলে মনে করেন অভিষেক। তাঁর কথায়, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এখন পর্যন্ত এ রাজ্যে তিন বার ক্ষমতায় এসেছেন। প্রতিটি জয়েই দক্ষিণ ২৪ পরগনার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৮ সালে যখন সিপিএম ক্ষমতার শীর্ষে ছিল, তখনও এই জেলাতেই পরিবর্তনের চাকা ঘুরতে শুরু করেছিল।’’ অভিষেক বলতে চেয়েছেন ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটের কথা। সেই ভোটে দক্ষিণ ২৪ পরগনা এবং পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পরিষদ দখল করেছিল তৃণমূল। পূর্ব মেদিনীপুরে ‘ফ্যাক্টর’ হয়েছিল নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলন। ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত ভোটে ওই ফলাফলের পর ২০০৯ সালে লোকসভা ভোটে বামেদের পর্যূদস্ত করেছিল কংগ্রেস-তৃণমূলের জোট। তার দু’বছর পরে সেই জোটই ক্ষমতাচ্যুত করেছিল সিপিএমকে। যদিও বছর খানেকের মধ্যেই কংগ্রেস জোট ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিল। তার পর থেকে তৃণমূল একক ক্ষমতাতেই পশ্চিমবঙ্গ দখলে রেখেছে। আর কংগ্রেস ক্রমশ ‘অপ্রাসঙ্গিক’ হয়ে পড়েছে।

এসআইআরের পাল্টা এফআইআর!

রাজ্যে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) দ্বিতীয় পর্যায় চলছে। খসড়া তালিকা প্রকাশের পর এখন শুনানিকেন্দ্রে ভোটারদের নথি যাচাই করছে কমিশন। অসুস্থ এবং বয়স্ক মানুষেরাও রেহাই পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ। অনেকে বলছেন, এই পর্বে অভিষেকের ভোটের প্রচার শুরু এবং জেলায় জেলায় ঘুরে জনসভা তাৎপর্যপূর্ণ। প্রত্যাশিত ভাবেই শুক্রবারও অভিষেকের নিশানায় ছিল নির্বাচন কমিশন। কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে কটাক্ষ করে তিনি বলেন, ‘‘এরা এনেছে এসআইআর। আর মানুষ গণতান্ত্রিক ভাবে ভোটের মাধ্যমে করবে এদের বিরুদ্ধে এফআইআর।’’ বারুইপুরে র‌্যাম্পের ধাঁচে তৈরি মঞ্চে আলাদা করে তিন জনকে (মেটিয়াবুরুজের মনিরুল মোল্লা, মায়া দাস এবং কাকদ্বীপের হরেকৃষ্ণ গিরি) তুলেছিলেন অভিষেক। দাবি, এসআইআর-এর তালিকায় তাঁদের ‘মৃত’ বলে দেগে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের র‌্যাম্পে হাঁটিয়ে অভিষেকের কটাক্ষ, ‘‘দেখুন, ভূতেদের র‌্যাম্পে হাঁটাচ্ছি! এঁদের হাঁটানোর জন্যই এই র‌্যাম্প তৈরি করিয়েছি।’’ এসআইআরের আতঙ্কে গত কয়েক সপ্তাহে রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে যে সমস্ত মৃত্যুর খবর এসেছে, তাঁদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন অভিষেক। বলেছেন, ‘‘গত কয়েক মাসে এসআইআরের কারণে ৮৫ জন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। তার মধ্যে ৫৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। কেউ বিএলও, কেউ সাধারণ ভোটার। আনম্যাপ্‌ড দেখাচ্ছে! বাংলার মানচিত্র থেকেই ওদের আনম্যাপ্‌ করে দেওয়ার সময় এসে গিয়েছে।’’ সাধারণ মানুষকে শুনানির নোটিস না ধরিয়ে শত্রুতা থাকলে বিরোধী নেতাদের নোটিস ধরাক কমিশন, চান অভিষেক। তাঁর কথায়, ‘‘শত্রুতা থাকলে আমাদের নোটিস দিন। সাধারণ মানুষকে অকারণে নোটিস পাঠাচ্ছেন কেন? দু’মাসে ৫৬টা তরতাজা প্রাণ চলে গিয়েছে।’’

জ্ঞানেশ সংঘাত

এসআইআর নিয়ে অভিযোগ জানাতে কিছু দিন আগে দিল্লিতে নির্বাচন কমিশনের দফতরে গিয়েছিলেন অভিষেক-সহ তৃণমূলের প্রতিনিধিরা। সেখানে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সঙ্গে বাদানুবাদের কথা তিনি আগেই জানিয়েছিলেন। শুক্রবার ফের সেই প্রসঙ্গ তোলেন অভিষেক। বলেন, ‘‘আমার সঙ্গে আঙুল তুলে কথা বলছিলেন জ্ঞানেশ কুমার। বাঙালি কী, দিল্লিতে গিয়ে বুঝিয়ে দিয়ে এসেছি। এখন আমি গিয়েছি। এর পরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যাবেন।’’

শুভেন্দুদের তোপ

মঞ্চে দু’টি ভিডিয়ো শুনিয়েছেন অভিষেক। একটিতে বিজেপি সাংসদ অনন্ত মহারাজ এবং অন্যটিতে রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কণ্ঠ শোনা গিয়েছে বলে তাঁর দাবি। অনন্তের ভিডিয়োতে তাঁকে দেশের প্রধানমন্ত্রী এবং রাষ্ট্রপতিকে বাংলাদেশি, পাকিস্তানি বলতে শোনা গিয়েছে। শুভেন্দুর ভিডিয়োতে বক্তাকে বলতে শোনা যায়, ‘‘এর থেকে তো ইউনূসের সরকার ভাল চলছে।’’ বাংলাদেশে দীপু দাসের নৃশংস হত্যার প্রসঙ্গ তুলে অভিষেকের তোপ, ‘‘যাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশে হিন্দুদের মারা হচ্ছে, বিজেপি নেতা তাঁকে সার্টিফিকেট দিচ্ছেন। এঁরাই আবার নিজেদের হিন্দুদের রক্ষাকর্তা বলে দাবি করেন।’’

চিকেন প্যাটিস-যুক্তি

কলকাতায় ব্রিগেড ময়দানে গীতাপাঠের অনুষ্ঠানে চিকেন প্যাটিস বিক্রির অভিযোগে মারধর করা হয়েছিল এক যুবককে। গীতার শ্লোক উল্লেখ করে শুক্রবার অভিষেক বুঝিয়েছেন, চিকেন প্যাটিস বিক্রিতে দোষ নেই। তাঁর কথায়, ‘‘গীতায় শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং বলেছেন, কুকুর হোক, গরু হোক, মানুষ হোক, সকলের মধ্যে আমি বিরাজমান। ঈশ্বর বিরাজমান। ব্রিগেডের সেই হামলাকারীরা জামিন পাওয়ার পর বিজেপি তাদের মালা পরিয়ে বরণ করেছে। কে কী খাবে, কী বিক্রি করবে, কী পরবে, সেটা দিল্লির দালালেরা ঠিক করে দেবে?’’

জল-বায়ু-চাকরি

বিজেপিকে আক্রমণ করতে গিয়ে ইনদওরে পুরসভার পানীয় জলে বিষক্রিয়া এবং দিল্লির দূষণের প্রসঙ্গ টেনেছেন অভিষেক। বলেছেন, ‘‘মধ্যপ্রদেশে সামান্য জল খেয়ে ১১ জন মারা গিয়েছেন। এই বিজেপির আমলে দিল্লির বাতাস দূষিত হয়ে গিয়েছে। এই সরকার জল দিতে পারে না, বায়ু দিতে পারে না, চাকরিও দিতে পারে না। বিজেপি তো বলেছিল দু’কোটি চাকরি দেবে। গত কয়েক বছরে একটা বিধানসভায় পাঁচ হাজার চাকরিও দিতে পেরেছে? প্রমাণ দেখাতে পারলে আমি রাজনীতি ছেড়ে দেব। এরা কেবল আমাদের সংস্কৃতিকে বাংলাদেশি বলে দাগিয়ে দেয়। ডবল ইঞ্জিন সরকারের আমলে সোনার ত্রিপুরা হয়নি, সোনার অসম হয়নি, সোনার বিহার হয়নি, সোনার বাংলা হবে কী ভাবে?’’

‘বাংলা-বিরোধী’ তোপ

২০২৬-এর ভোটে তৃণমূলের আনুষ্ঠানিক স্লোগান— ‘যতই করো হামলা, আবার জিতবে বাংলা’। বিজেপিশাসিত রাজ্যে বাংলাভাষীদের উপর বাংলাদেশি সন্দেহে আক্রমণ, হেনস্থার প্রসঙ্গ তুলেছেন অভিষেক। দাবি, মহারাষ্ট্রে বাংলায় কথা বলার অপরাধে বালুরঘাটের এক বিজেপির বুথ সভাপতিকে হেনস্থা করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় মন্ত্রী তথা বালুরঘাটের সাংসদ সুকান্ত মজুমদারের কাছে গিয়েও তাঁর পরিবার কোনও সাহায্য পায়নি। শেষ পর্যন্ত তৃণমূল সেই পরিবারের পাশে থেকেছে। বিজেপিকে কটাক্ষ করে অভিষেক বলেন, ‘‘নিজেদের বুথ সভাপতিকে যে বিজেপি রক্ষা করতে পারে না, তারা বাংলার মানুষকে কী ভাবে রক্ষা করবে? এরা শুধু কাড়তে জানে, দিতে জানে না।’’ পশ্চিমবঙ্গকে বঞ্চনার পরিসংখ্যান দিয়ে অভিষেক দাবি করেন, গত সাত বছরে বাংলা থেকে ৬ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা বিজেপি তুলে নিয়ে গিয়েছে। হাই কোর্ট, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরেও ১০০ দিনের প্রকল্প চালু করেনি। তাঁর কথায়, ‘‘তৃণমূল জিতলে দু’মুঠো ভাত। বিজেপি এলে ধর্মে ধর্মে আঘাত, সংঘাত। সিদ্ধান্ত বাংলার মানুষকেই নিতে হবে।’’ ভোটে বিজেপিকে জবাব দেওয়ার জন্য দক্ষিণ ২৪ পরগনার মানুষকে আহ্বান জানিয়েছেন অভিষেক।

Advertisement
আরও পড়ুন