বিজেপির কর্মী সম্মেলনে অমিত শাহ। কলকাতায়। —নিজস্ব চিত্র।
বিহারের পরে পশ্চিমবঙ্গ জয়ের লক্ষ্যে বিজেপির সাংগঠনিক হেঁশেলের হাল ধরেছেন তিনি। সেই লক্ষ্যে তাঁর অঙ্কের দ্বিতীয় পর্যায় এ বার দলের কাছে ব্যাখ্যা করলেন অমিত শাহ। কলকাতা ও শহরতলি এলাকায় বিধানসভা আসন জয়ের লক্ষ্য বেঁধে দিলেন। সেই অভীষ্ট পূরণে দলের কর্মীদের প্রতি শাহের দাওয়াই, এক দিকে অনুপ্রবেশের ‘বিপদ’ শহুরে মানুষের কাছে তুলে ধরা এবং তার পাশাপাশি সাংগঠনিক ভাবে বাড়ি বাড়ি পৌঁছনো।
রাজ্য সফরের শেষ দিনে বিধাননগরের একটি হোটেলে বঙ্গ বিজেপির সাংসদ ও বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠক এবং পরে সায়েন্স সিটি প্রেক্ষাগৃহে দলের কলকাতা বিভাগের মণ্ডল স্তর পর্যন্ত কর্মীদের নিয়ে সম্মেলনে বেশ কিছু পরামর্শ দিয়েছেন শাহ। রাজ্যে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে সরকার বদলের বিষয়ে গোড়া থেকেই আত্মবিশ্বাস দেখাচ্ছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সূত্রের খবর, কলকাতা বিভাগের কর্মী সম্মেলনেও তিনি বলেছেন, জয়ের উপযুক্ত মাটি তৈরি আছে। সম্মেলনে ছিলেন কলকাতা উত্তর, দক্ষিণ, যাদবপুর এবং দমদম— এই চারটি লোকসভা এলাকার বিজেপি নেতা-কর্মীরা। শাহের মতে, মূল কলকাতা ও তার সংলগ্ন এই চার লোকসভা এলাকার ২৮টি বিধানসভা কেন্দ্রের মধ্যে ২০টিতে জিততে হবে বিজেপিকে এবং সেটা করে দেখানো সম্ভব!
ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় খসড়া ভোটার তালিকায় মৃত, স্থানান্তরিত এবং অনুপস্থিত মিলিয়ে বেশি নাম বাদ গিয়েছে কলকাতা উত্তর ও দক্ষিণ এবং দুই ২৪ পরগনায়। দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বাদ গিয়েছে সর্বাধিক ৮ লক্ষ ১৮ হাজার ৪৩২ ভোটারের নাম। উত্তর ২৪ পরগনায় বাদ এখনও পর্যন্ত ৭ লক্ষ ৯২ হাজার ১৩৩। কলকাতা উত্তরে এই সংখ্যা তিন লক্ষ ৯০ হাজার এবং কলকাতা দক্ষিণে দু’লক্ষ ১৬ হাজার। বিজেপির একটি সূত্রের দাবি, মৃত ও স্থানান্তরিত ভোটার বাদ গেলে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের খাতা থেকে বিয়োগ হবে সব চেয়ে বেশি। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামাঞ্চলে এমনিতেই শাসক তৃণমূলের প্রভাব বেশি, ফলও তাদের পক্ষে ভাল। কলকাতা ও লাগোয়া শহরাঞ্চলে প্রতিষ্ঠান-বিরোধিতার প্রবণতা বেশি, এসআইআর-এ নাম বাদ যাওয়া শাসক দলকে আরও বিপাকে ফেলতে পারে। এই অঙ্ক মাথায় রেখেই শাহ ঘুঁটি সাজাতে চাইছেন বলে ওই বিজেপি শিবিরের একাংশের মত। তবে শাহ যে চার লোকসভা এলাকার দিকে নজর দিয়েছেন, গত লোকসভা নির্বাচনের নিরিখে দেখলে তার মধ্যে তিনটি লোকসভা অঞ্চলের ২১টি বিধানসভা আসনে তৃণমূলই এগিয়ে ছিল। বিজেপি এগিয়ে কলকাতা উত্তরের দুই বিধানসভা কেন্দ্র শ্যামপুকুর ও জোড়াসাঁকোয়। আর কলকাতা পুর-এলাকায় তৃণমূল পিছিয়ে ৫১টি ওয়ার্ডে।
সূত্রের খবর, কলকাতা বিভাগের বিজেপি নেতা-কর্মীদের সামনে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বুধবার ব্যাখ্যা করেছেন, অনুপ্রবেশ কেবল সীমান্ত লাগোয়া এলাকার সমস্যা বলে মনে করলে হবে না। এই সমস্যায় রাশ টানা না-হলে জনবিন্যাসের বদল ঘটেই চলবে এবং শহরেও এসে পড়বে ‘বিপদ’। এই সঙ্কটের কথা শহরের মানুষকে বোঝাতে হবে, সতর্ক করতে হবে। কলকাতার সম্মেলনে প্রায় সাড়ে চার হাজার কর্মী উপস্থিত ছিলেন। শাহের পরামর্শ, তাঁরা প্রত্যেকে এক জন করে নতুন ব্যক্তির কাছে পৌঁছে কর্মী তৈরি করতে পারলে সংখ্যাটা দাঁড়াবে প্রায় ৯ হাজার। তার পরে তাঁরা প্রত্যেকে আবার পাঁচটি করে বাড়ির দায়িত্ব নিলে কলকাতা মহানগরে অন্তত ৪৫ হাজার বাড়িতে সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা সম্ভব।
তবে অনুপ্রবেশের ‘বিপদ’ নিয়ে শাহ বারবার সতর্ক করার কথা বললেও অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করার নামে বিভিন্ন রাজ্যে বাঙালি তথা বাংলাভাযী মানুষের উপরে যে হেনস্থা চলছে, সেই প্রসঙ্গে কোনও কথা বলেননি। আলাপচারিতার আসরে রাজ্য বিজেপির কেউ এই নিয়ে শাহকে প্রশ্ন করার ‘সাহস’ও দেখাননি বলে সূত্রের খবর। রাজ্য বিজেপির এক প্রথম সারির নেতার কথায়, ‘‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চলবেই। তবে তারই মধ্যে নানা রাজ্যে যে ঘটনা ঘটছে, তাতে এ রাজ্যের বিজেপির কোনও ভূমিকা না-থাকলেও আমাদের কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে! এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই এগোতে হবে।’’
বিজেপি নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ফের স্পষ্ট করে দিয়েছেন, কেন্দ্রীয় সংস্থার ভরসায় ভোট লড়ার আশা করলে চলবে না। সূত্রের খবর, তৃণমূলের শীর্ষ স্তরের কোনও নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না সংক্রান্ত অনুযোগের মুখে শাহ বলে দিয়েছেন, ‘আপনারা আজ বললে কাল কাউকে গ্রেফতার করে নেওয়া যায়। কিন্তু তিনি যখন ১৫ দিন পর জামিনে ছাড়া পেয়ে যাবেন, তখন যে রাজনৈতিক ভাবে মুখ পুড়বে, সেই দায় কে নেবে’?
বিধাননগরের একটি হোটেলে দলের সাংসদ-বিধায়কদের সঙ্গে বৈঠকে বিশেষত বিধায়কদের এলাকায় সময় দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন শাহ। তাঁর পরামর্শ, সংগঠনকে ব্যবহার করুন। বিধায়কেরা প্রতি দিন নিজেদের কার্যালয় খুলে বসুন, এলাকায় কাজ করুন। কলকাতায় এসে মুখ দেখিয়ে টিকিট মিলবে না!