West Bengal Elections 2026

স্বস্তির আসনেও অনিশ্চিত তৃণমূল

বৈশাখে দেবখালের চেহারা দেখলে বোঝা যাবে না বর্ষার সে কী ভয়াল আকার নেয়। রায়নার মুণ্ডেশ্বরীতে গিয়ে মিশেছে এই দেবখাল।

সৌমেন দত্ত
শেষ আপডেট: ২৭ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০২
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

‘নিশ্চিন্ত আর থাকা গেল না রে তোপসে’। সত্যজিৎ রায়ের ‘সোনার কেল্লা’ ছবিতে মুকুলের খোঁজে আসা ফেলুদার এই সংলাপ অবিস্মরণীয় হয়ে গিয়েছে। ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধনের (এসআইআর) পরে তৃণমূলের অন্দরে উঁকি মারলে এখন শোনা যাচ্ছে এই সংলাপ।

বৈশাখে দেবখালের চেহারা দেখলে বোঝা যাবে না বর্ষার সে কী ভয়াল আকার নেয়। রায়নার মুণ্ডেশ্বরীতে গিয়ে মিশেছে এই দেবখাল। সেখানে পরপর দু’তিনটি গ্রামে বাড়িগুলির অবস্থান রাস্তা থেকে কয়েক ফুট উঁচুতে। সেখানে বসে জল মাপেন সকলে। সে কথা মনে করিয়ে দিয়ে রায়নার সেই দেবখালের পাড়ে বসে পুরনো এক আদি তৃণমূল কর্মী ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে বলছিলেলেন, “ভোটার থেকে দলের পুরনো কর্মী, সবাই এখন উঁচুতে বসে ভোটের জল মাপছেন।”

সরল নির্বাচনী পাটিগণিত বলছে, লোকসভায় ভোটপ্রাপ্তির নিরিখে তৃণমূল নিশ্চিন্ত থাকতে পারে মেমারি, জামালপুর, রায়না আসনে। তবে এসআইআর-পরবর্তী আবহ এবং দলের অন্দরের চিত্র রাজ্যের শাসক দলকে নিশ্চিন্তে থাকতে দিচ্ছে কই। রায়নায় চূড়ান্ত তালিকায় ২৩,৩১২ জনের নাম বাদ গিয়েছে। যার মধ্যে অযোগ্য ১১২৪৮ জন। বিধানসভা ভোটে তৃণমূল জিতেছিল ১৮,২০৫ ভোটে। তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল ৮ শতাংশ। লোকসভা ভোটে ব্যবধান বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ৪৩,৫৬৫। বিজেপির দাবি, ভোট-বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে— রায়না ১ ব্লকের সাতটি পঞ্চায়েত এলাকা থেকে লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল প্রায় ৩০ হাজার ভোটে ‘লিড’ পেয়েছিল। হিজলনাতেই ব্যবধান ছিল প্রায় ১৩ হাজার ভোটের। এই পরিসংখ্যান দেখিয়ে বিজেপি প্রার্থী সুভাষ পাত্রের খোঁচা, “ভুয়ো ভোটারের তাণ্ডব বোঝাই যাচ্ছে। ভোটার তালিকা বলছে, এ বার আর ভূতের তাণ্ডব দেখা যাবে না।” আবার রায়না ২ ব্লকে আটটি পঞ্চায়েতের মধ্যে অন্তত পাঁচটিতে ‘হাড্ডাহাড্ডি’ লড়াই হয়েছে। একটিতে আবার বিজেপি এগিয়ে ছিল।

দামোদর-মুণ্ডেশ্বরী নদীর ধারে এখনও দুলছে রামনবমীর ধ্বজা। রায়না থেকে জামালপুর যাওয়ার পথে একটি রাস্তা গিয়েছে আরামবাগ অভিমুখে। আর একটি তারকেশ্বরের দিকে। শনিবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের জামালপুরের সভায় গাড়িতে এসেছিলেন বিজেপি কর্মী-সমর্থকেরা। দামোদরের বাঁধের নীচে সারি দিয়ে রাখা ছিল ম্যাটাডর। এক চালক বলছিলেন, “ মনে রাখতে হবে, ২০১৬-এ তৃণমূল কিন্তু এই জামালপুরে হেরেছিল। এ বার অনেক ভোটারের নাম বাদ গিয়েছে। কাজেই ছাপ্পা তৃণমূল দিতে পারবে না। পুরনো তৃণমূল কর্মীরা বসে রয়েছেন। একটু চাপ দিলে বিজেপিতে জোয়ার আসবে।” বিধানসভায় জামালপুর আসনটি তৃণমূল জিতেছিল ১৭,৯৭১ ভোটে। লোকসভায় এগিয়েছিল ৩৬,৩৩৮ ভোটে। এসআইআরের পরে ১৯,৪৪৮ জনের নাম বাদ গিয়েছে। এর মধ্যেই চকদিঘি পঞ্চায়েতের প্রাক্তন তৃণমূলের প্রধান গৌরসুন্দর মণ্ডল বিজেপিতে যোগ দিয়েছেন। তৃণমূলের একাধিক সূত্র দাবি করছে, দলের অনেক পুরনো কর্মী বসে গিয়েছেন। এই প্রেক্ষিত বর্ণনা করে বিজেপি প্রার্থী অরুণ হালদারের আশা, “দামোদর-মুণ্ডেশ্বরী পাড়ে থাকা গ্রামগুলিতে সন্ত্রাস আটকে গেলেই বিজেপির ভোটবাক্সে জোয়ার আসবে।”

তবে আশার আলো থাকলেও গেরুয়া শিবিরে আশঙ্কার মেঘও নেহাত কম নয়। রায়না-জামালপুরে বিজেপি নেতাদের প্রত্যাশা মিটবে কিনা, তা নিয়ে দলের অন্দরেও প্রশ্ন রয়েছে। বিজেপি কর্মীরা মনে করছেন, ভোটার বাদ গিয়েছে ছিকই। ভুয়ো ভোটারদের বুথে দেখতে পাওয়া যাবে না, এটাও ঠিক। কিন্তু যোগ্য ভোটারদের বুথ পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার মতো সংগঠন বিজেপির নেই। তৃণমূলে দ্বন্দ্ব রয়েছে। কিন্তু বিজেপির অন্দরে মনোমালিন্য তার থেকেও অনেক বেশি। রায়না, জামালপুরে অনেক পুরনো নেতাকে বিজেপি প্রার্থীর সঙ্গে দেখা যাচ্ছে না। একই অবস্থা মেমারিরও। শনিবার দলের প্রাক্তন সভাপতি সুকান্ত মজুমদারের সভায় প্রকাশ্যেই দলে সমন্বয়ের অভাব ফুটে উঠেছে। সব জায়গায় বিজেপির সবাইকে দেখা যাচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মেমারিতে এসআইআরের পরে ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে ২১১৭৩ জনের নাম। যার মধ্যে অযোগ্য ৫৫৩২ জন। এই সংখ্যার থেকে বেশি ভোটে বিধানসভা ও লোকসভায় তৃণমূলের জয় এসেছিল। মেমারির তৃণমূলের প্রার্থী, দলের জেলা যুব সভাপতি রাসবিহারী হালদার বলছিলেন, “যাঁরা উঁচুতে বসে জল মাপছেন, তাঁরাও আমাদের ভোট দেবেন। দামোদর-মুণ্ডেশ্বরী সংস্কারের সময়ে বাঁধ উঁচু হয়েছে, স্লুস গেট তৈরি হয়েছে জল আটকানোর জন্য। এসআইআরে যতই নাম বাদ দিক না কেন, আমাদেরও বাঁধ রয়েছে। তা যথেষ্ট পোক্ত।’’

আরও পড়ুন