শুনানির নোটিস হাতে সস্ত্রীক বিএলও। —নিজস্ব ছবি।
স্কুলশিক্ষক এবং বিএলও স্বামী খাওয়া-দাওয়া সেরে কাজে বেরিয়েছিলেন। দুপুরে ভাতঘুম দিচ্ছিলেন স্ত্রী। নিশ্চিন্ত দুপুরে হঠাৎ ছন্দপতন। হন্তদন্ত হয়ে বাড়ি ফিরলেন কর্তা। বাড়িতে ঢুকেই স্ত্রীর হাতে এসআইআর শুনানির নোটিস ধরালেন তিনি। সঙ্গে নিজেও নিজেকে একটি নোটিস দিলেন। হতভম্ব স্ত্রী খানিক ক্ষণ অনিমেষে চেয়ে রইলেন স্বামীর দিকে। গম্ভীর মুখে স্বামী জানালেন, কম অবাক তিনিও হননি। কিন্তু এটাই সত্যি! এ বার সস্ত্রীক বিএলওকে এসআইআর শুনানিতে ডাক নির্বাচন কমিশনের। ঘটনাস্থল পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া শহর।
পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রামের ভোমরকোল অবৈতনিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন দেবশঙ্কর চট্টোপাধ্যায়। ওই এলাকার ১৬৫ নম্বর বুথের বিএলও হিসাবে এসআইআর প্রক্রিয়ার দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তিনি। দেবশঙ্করের পৈতৃক ভিটে কোড়োলা গ্রামে। তবে অনেক দিন হল তিনি কাটোয়া শহরের ১০ নম্বর ওয়ার্ডের চৌরঙ্গী এলাকার বাসিন্দা। সেখানেই থাকেন স্ত্রী অনিন্দিতা চট্টোপাধ্যায় এবং তাঁদের একমাত্র সন্তান। এখন স্বামী-স্ত্রীর ডাক পড়েছে এসআইআর শুনানিতে।
নোটিস হাতে অনিন্দিতার প্রথম প্রশ্ন ‘তাৎপর্যপূর্ণ।’ তিনি বলেন, ‘‘নোটিসেই লেখা রয়েছে, কোনও প্রশ্ন থাকলে বিএলও-কে জিজ্ঞাসা করতে হবে। আমার স্বামীই এই বুথের বিএলও। নোটিস তো তিনিও পেয়েছেন।’’ বিএলও স্বামী বলেন, ‘‘নির্বাচন কমিশনের নির্দিষ্ট অ্যাপে নোটিস এসেছে। তাই নিয়ম মেনে শুনানিতে হাজির থাকতে হবে দু’জনকেই। আর পাঁচ জন ভোটারের মতোই আমাদেরও লাইনে দাঁড়াতে হবে।’’
গোলমালটা হল কোথায়? বিএলও দেবশঙ্কর জানান, তাঁর বাবার নাম পুলকেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নামের বানান সঠিক ছিল। কিন্তু এ বার ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ (যুক্তিগত গরমিল)-র কারণে পদবির বানান ভুল দেখানো হয়েছে। সেই কারণে তিনি শুনানির নোটিস পেয়েছেন। অন্য দিকে, স্ত্রীর বাপের বাড়ি নদিয়ার নাকাশিপাড়া থানার মাঝেরগ্রামে। তাঁর বাবার নাম অনিল চট্টোপাধ্যায়। সেই ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’-র কারণে বাবা-মেয়ের বয়সের পার্থক্য হয়েছে ৫০ বছর। তাই তাঁকেও নোটিস দিয়েছে কমিশন।
দেবশঙ্কর জানান, তিনি যে বুথের দায়িত্বে, সেখানে ভোটারের সংখ্যা ৭১২ জন। এর আগে ৭ জনের শুনানি হয়েছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে ৬২ জনের নামে শুনানির নোটিস গিয়েছে। তার মধ্যেই তাঁর এবং স্ত্রীর নাম রয়েছে। তাঁর কথায়, ‘‘এ সবই এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা)-এর কারণে তৈরি হওয়া ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি।’ কিন্তু আমি নির্বাচন কমিশনের নিয়ম মেনে কাজ করতে বাধ্য। এখানে আমার নিজের পরিবার বলে আলাদা কিছু নয়। সবাই সমান। অন্যদের নোটিস ধরাতে গেলে যেমন প্রশ্নের মুখে পড়ছি, স্ত্রীর ক্ষেত্রেও তেমনই হয়েছে। আমার একটাই জবাব, নির্বাচন কমিশন যেমন নির্দেশ দিয়েছে, আমি তেমনটাই করেছি।” পাশ থেকে অনিন্দিতা বলেন, “প্রথমে অবাক হয়েছিলাম। কিন্তু এটা তো আমার স্বামীর দায়িত্বের কাজ। তাই স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই শুনানির লাইনে দাঁড়াব।”
তবে এই প্রথম নয়, বিভিন্ন জায়গায় বিএলও-র নামে শুনানির নোটিস আসছে। কাটোয়ার মহকুমা শাসক অনির্বাণ বসু বলেন, ‘‘বিএলও হলেও নির্বাচন কমিশনের নিয়ম মেনেই তাঁকে কাজ করতে হয়। তাই নিজের পরিবারের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম প্রযোজ্য।”