দোকানে অনুষ্কা। নিজস্ব চিত্র
বাবার আকস্মিক মৃত্যু এক মুহূর্তে ওলটপালট করে দিয়েছিল সংসার। সেই ধাক্কা সামলাতে না সামলাতেই দুর্ঘটনায় গুরুতর জখম হন মা। তখনই বুঝেছিলেন, সংসারের পাশে দাঁড়াতে হবে। হাল ধরতে হবে। সেই উপলব্ধিই বর্ধমানের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী অনুষ্কা গায়েনের চালিকাশক্তি।
শহরের গোলাপবাগ মোড় এলাকার বাসিন্দা অনুষ্কা ভিটা মহেন্দ্র পাবলিক ইনস্টিটিউশনের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী। বাণিজ্য বিভাগের এই ছাত্রীর নিত্যসঙ্গী এখন কানের দুল, চুড়ি, মাথার ক্লিপ-সহ নানা সাজসজ্জার সামগ্রী। এই ব্যবসাই হাসি ফোটাচ্ছে পরিবারের মুখে। ২০২০ সালে পানাগড়ের কাছে পথ দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় অনুষ্কার বাবা দিবেন্দু গায়েনের। পেশায় তিনি বিদ্যুৎ বিভাগের ঠিকাদার ছিলেন। শ্রমিকদের মজুরি মেটানোর সময় একটি গাড়ির ধাক্কায় প্রাণ হারান তিনি। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে পরিবার। এর কিছু দিনের মধ্যেই বাড়িতে পড়ে গিয়ে আহত হন অনুষ্কার মা সোমা গায়েন। তাঁর কোমরে বড়সড় অস্ত্রোপচার করতে হয়। স্বাস্থ্যসাথী প্রকল্পে অস্ত্রোপচারের খরচের বড় অংশ মিটলেও ওষুধ ও অন্য প্রয়োজনে প্রায় ৩০ হাজার টাকা জোগাড় করতে হয়েছিল। সেই সময় নিজের জমানো ৩০ হাজার টাকা দেন অনুষ্কা। ২০২৫ সাল থেকে অনলাইনে বিভিন্ন সাজসজ্জার সামগ্রী বিক্রি করে ওই টাকা জমিয়েছিলেন তিনি। । সংসারের প্রয়োজন বুঝে এই বছর ফেব্রুয়ারি থেকে অনলাইনের পাশাপাশি রাস্তায় বসেও ব্যবসা শুরু করেছেন। এখন প্রায় প্রতিদিনই বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম গেটের কাছে, রমনারবাগানের উল্টো দিকের অংশে ছোট্ট পসরা সাজিয়ে বসেন অনুষ্কা। কানের দুল, চুড়ি, মাথার ক্লিপ-সহ নানা সাজসজ্জার সামগ্রী কিনতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী থেকে শুরু করে পথচলতি বহু মানুষ ভিড় জমান। অনুষ্কার কথায়, ‘‘উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার আগে নিয়মিত স্কুলে যাওয়ার প্রয়োজন কমেছে। সেই সময়টা ব্যবসায় কাজে লাগাচ্ছি। বিকেলে বাড়ি ফিরে রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করি।’’
জানা যায়, সংসারের আয় বলতে দাদুর পেনশন। কিন্তু অসুখ-বিসুখ বা সংসারের অন্য খরচের জন্য তাঁর রোজগারই ভরসা। তবে সব সময় সমান রোজগার হয় না। পুজো, উৎসব বা অনুষ্ঠানের আগে বিক্রি ভাল হয়। আবার কানের দুল বা ছোটখাট গয়নার দাম কলেজ ছাত্রীদের নাগালে হওয়ায় টুকটাক বিক্রিও বছরভর চলে।
অনুষ্কা বলেন, ‘‘কলেজে ভর্তি হতে চাই। ব্যবসাটাও আরও বাড়িয়ে পরিবারের পাশে দাঁড়াতে চাই।’’ নিজেদের থেকে বয়সে ছোট মেয়েটাকে দেখে অণুপ্রাণীত হয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু পড়ুয়াও। অনুষ্কার লড়াই যেন কয়লা থেকে হীরে হয়ে ওঠার গল্প।