Ancient Manuscript

প্রাচীন পুঁথি-পাণ্ডুলিপির খোঁজে সমীক্ষা জেলায়

প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, শুধু বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়েই রয়েছে সাড়ে তিন হাজারের বেশি পুঁথি।

নিজস্ব সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬ ০৭:১৫
—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

—প্রতিনিধিত্বমূলক ছবি।

আজও তুলোট কাগজে বা তালপাতার পুঁথিতে লুকিয়ে আছে বর্ধমান-সহ সংলগ্ন এলাকার অজানা ইতিহাস। লোক জ্ঞান, দর্শন ও প্রাচীন সাহিত্য-সংস্কৃতির সেই অমূল্য সম্পদ উদ্ধার করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে উদ্যোগী হয়েছে রাজ্যের নতুন সরকার। সেই লক্ষ্যে পূর্ব বর্ধমান জেলায় সমীক্ষা শুরু করেছে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর। এখনও পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার হাজার প্রাচীন পুঁথির খোঁজ মিলেছে, দাবি প্রশাসনের।

কেন্দ্র সরকারের ‘জ্ঞান ভারতম্ মিশন’ প্রকল্পের অধীনে এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বিপুল ও প্রাচীন পুঁথি, নথি এবং পাণ্ডুলিপির সম্ভার চিহ্নিত করে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে সংরক্ষণ ও ডিজিটাইজ় করা। নতুন সরকার গঠনের পরে রাজ্যের তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর প্রতিটি জেলাশাসককে দ্রুত সমীক্ষা চালানোর নির্দেশ দেয়। সেই অনুযায়ী জুনের শুরু থেকেই পুঁথি অনুসন্ধানের কাজ শুরু হয়।

প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, শুধু বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়েই রয়েছে সাড়ে তিন হাজারের বেশি পুঁথি। এ ছাড়াও, বর্ধমান ২ ব্লকের বড়শুল, খণ্ডঘোষ, মঙ্গলকোটের ক্ষীরগ্রাম-সহ জেলার বিভিন্ন পুরনো গ্রন্থাগারে সংস্কৃত, তামিল এবং খরোষ্ঠী লিপির বহু পুঁথির সন্ধান মিলেছে। সব মিলিয়ে জেলায় এখনও পর্যন্ত প্রায় সাড়ে চার হাজার পুঁথি চিহ্নিত করা হয়েছে। যার অধিকাংশেরই পাঠোদ্ধার এখনও সম্ভব হয়নি, দাবি।

বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারিক কাঞ্চন কামিল্যা বলেন, “১০০ থেকে ২৫০ বছরের পুরনো পুঁথিগুলি অত্যন্ত যত্নে সংরক্ষণ করা হয়েছে। নিজের উদ্যোগে সেগুলি ডিজিটাইজ়ও করেছি। অধিকাংশ পুঁথিই রাজাদের আমলের। রাজবাটী থেকে সেগুলি গোলাপবাগে নিয়ে আসা হয়েছে।” কাব্য, ব্যাকরণ, মহাভারত, রামায়ণ, ন্যায়শাস্ত্র-সহ বিভিন্ন বিষয়ের পুঁথি সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে, জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, রাঢ়বাংলার ইতিহাস ও সংস্কৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল বর্ধমান। বিশেষ করে চৈতন্য পার্ষদদের চারণভূমি হিসেবে কাটোয়ার বিভিন্ন গ্রামের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে। সেখানকার বহু গ্রামে এখনও মূল্যবান পুঁথি ছড়িয়ে আছে। ‘কাটোয়ার ইতিহাস ও সংস্কৃতি’র সম্পাদক তুষার পণ্ডিত বলেন, “চৈতন্য পরবর্তী সময়ের বহু পুঁথি সংস্কৃত ও তামিল ভাষায় লেখা। সেগুলির সংরক্ষণ জরুরি। কৃষ্ণদাস কবিরাজের লেখা পুঁথিও আছে কেতুগ্রামের ঝামটপুরে।”

প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, প্রতিটি পুঁথির নাম, ভাষা, বিষয়বস্তু, বয়স, সংরক্ষণের বর্তমান অবস্থা-সহ বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। জেলাস্তরের সমীক্ষা শেষ হলে একটি রিপোর্ট রাজ্য সরকারের কাছে পাঠানো হবে। পরে সেই তথ্য যাবে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে। সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক সংগ্রহশালার সঙ্গে ব্যক্তিগত সংগ্রহে থাকা পুঁথিকেও সমীক্ষার আওতায় আনা হচ্ছে। বড়শুলের হিমাদ্রিশেখর দের বলেন, “আমার কাছে থাকা প্রায় ২৫০ বছরের পুরনো পুঁথি আছে। এগুলির পাঠোদ্ধার হলে বহু অজানা তথ্য সামনে আসবে।” বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ধমান রাজাদের অধীনে এক সময় দক্ষিণবঙ্গের বিস্তীর্ণ অঞ্চল ছিল। পাশাপাশি চৈতন্য পরবর্তী বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল বর্ধমান। ফলে জেলার এই প্রাচীন পুঁথি শুধু সাহিত্য বা ধর্মীয় ইতিহাস নয়, বাংলার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক ইতিহাসেরও বহু অজানা অধ্যায় সামনে এনে দিতে পারে। জেলা প্রশাসনের দাবি, কোনও ব্যক্তি বা পরিবারের কাছে যদি মূল্যবান পুঁথি বা ঐতিহাসিক নথি থেকে থাকে, প্রশাসনকে জানালে তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর তার সংরক্ষণের ব্যবস্থা করবে। তবে পুঁথিগুলি সরকারকে জমা দিতে হবে না। শুধুমাত্র তার প্রতিলিপি বা ছবি সংগ্রহ করা হবে।

আরও পড়ুন