শমীকের ঠিকানা বদল! গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
রাজ্যে রাজনীতির পারদ তুঙ্গে। তৃণমূল-বিজেপি সম্পর্ক ‘অহিনকুল’। এমন সময়ে বিধাননগরের তৃণমূল নেতা অহির পাড়ায় ঢুকে পড়ছেন বিজেপির (পড়ুন নকুলের) রাজ্য সভাপতি! দু’জনেই বিধাননগরের বহু বছরের বাসিন্দা। দু’জনেই এত দিন একই সেক্টরে থাকতেন। কিন্তু এ বার তাঁরা একই ব্লকে থাকতে শুরু করবেন। কারণ, বিজেপির রাজ্য সভাপতি তথা রাজ্যসভা সাংসদ শমীক ভট্টাচার্যের ঠিকানা বদল হচ্ছে।
শমীক এখনও পর্যন্ত সেক্টর টু-এর যে বাড়িতে রয়েছেন, সেটি তাঁর পৈতৃক বাড়ি। দোতলা বাড়িটি সম্পন্ন গৃহস্থের পক্ষে হাত-পা ছড়িয়ে থাকার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু দেশের শাসকদল তথা রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলের রাজ্য সভাপতির জন্য সে বাড়ি যথেষ্ট নয়। বিজেপির রাজ্য সভাপতি বা সাংসদ হওয়ার অনেক আগে থেকেই শমীকের বাড়িতে রোজ কর্মী-সমর্থক এবং সংবাদমাধ্যমের আনাগোনা লেগে থাকত। ২০২৫ সালের শুরুর দিকে তিনি সাংসদ হন। সে বছরেরই জুলাই মাসে দলের রাজ্য সভাপতি পদে বসেন। রাতারাতি তাঁর বাড়িতে ভিড়ভাট্টা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। রাজ্য বিজেপির নানা স্তরের পদাধিকারী, দিল্লির প্রতিনিধি, সরকারি কর্তা, কর্মী-সমর্থক, সংবাদমাধ্যম— রোজ উদয়াস্ত ভিড়ের চাপে স্থান সঙ্কুলান হচ্ছে না। নির্বাচনের আগে শমীকের জন্য কেন্দ্রীয় নিরাপত্তার বন্দোবস্ত হলে রক্ষীদের থাকার ব্যবস্থা করার উপায়ও বাড়িটিতে নেই। সে সব মাথায় রেখে কয়েক মাস আগে থেকেই রাজ্য সভাপতির জন্য একটি বিকল্প ঠিকানা বেছে নেওয়ার চেষ্টা শুরু করেছিল দল।
অবশেষে পছন্দসই বাড়ি খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। বাড়িটি ইতিমধ্যে ভাড়াও করে নেওয়া হয়েছে। কিছু আসবাবপত্র আনা, বসার জায়গা সাজিয়ে তোলা ইত্যাদি বন্দোবস্ত চলছে। চলতি মাসেই সে বাড়িতে স্থানান্তরিত হতে চলেছেন শমীক। জেলায় জেলায় ‘পরিবর্তন যাত্রা’ চলবে ১০ মার্চ পর্যন্ত। তার পরে ১৪ মার্চ ব্রিগেডে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সমাবেশের মধ্যে দিয়ে কর্মসূচির সমাপ্তি। সে সব মিটলে শমীক নতুন ঠিকানার বাসিন্দা হচ্ছেন বলে বিজেপি সূত্রের খবর।
শমীকের এই নতুন বাড়িও সেক্টর টু-তেই। কিন্তু বাড়িটি যে ব্লকে, সেখানে থাকেন বিধাননগরের প্রাক্তন মেয়র তথা বর্তমান চেয়ারম্যান সব্যসাচী দত্ত-ও। পাড়ায় সব্যসাচীর ডাক নাম ‘অহি’। শমীকের নতুন বাড়ি আর অহির বাড়ির মাঝে দু’টি গলির ফারাক। ঘটনাচক্রে, ‘অহিনকুল’ সম্পর্ক নিয়ে পরস্পরের বিরুদ্ধে যুযুধান দু’টি দলের দুই নেতা ভরা ভোট-মরসুমে একই পাড়ায় থাকা শুরু করছেন। ।
শমীকের এই নতুন ঠিকানা তিনতলা। তিনটি তলেই একই রকমের বন্দোবস্ত। প্রত্যেক তলায় তিনটি করে প্রমাণ মাপের ঘর, একটি করে বড় হল আর একটি করে ছোট ঘর। বাড়িটির একতলা সাংগঠনিক এবং রাজনৈতিক কাজের জন্য ব্যবহার করা হবে। একতলার ছোট ঘরটিতে একটি অফিসও তৈরি হচ্ছে। বড় হলটিকে দলের বড় বৈঠক এবং সাংবাদিক বৈঠকের জন্য ব্যবহার করা হবে। বাকি তিনটি ঘর ব্যবহার করা হবে সাক্ষাৎপ্রার্থীদের বসার জন্য বা ছোটখাটো বৈঠকের জন্য।
দোতলায় শমীকের থাকার বন্দোবস্ত। তাঁর আপ্ত সহায়ক বা ঘনিষ্ঠতম বৃত্তে যাঁরা, প্রয়োজনে তাঁরাও থাকতে পারবেন, এমন ব্যবস্থাই রাখা হচ্ছে দোতলায়। তিনতলা ফাঁকা রাখা হচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনীর জন্য। শমীক এখনও পর্যন্ত কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা নেননি। কিন্তু দলের তরফে তাঁর উপরে চাপ বাড়ানো হচ্ছে। দিল্লি থেকে একাধিক বার তাঁর কাছে নিরাপত্তা নেওয়ার বার্তাও পৌঁছেছে বলে বিজেপি সূত্রের খবর। শেষ পর্যন্ত দলের নির্দেশ মেনে শমীককে নিরাপত্তা নিতে হলে সেই বাহিনী বাড়িটির তিনতলায় থাকবে।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি থাকাকালীন দিলীপ ঘোষের জন্য কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা এসেছিল। তিনি এখনও তা পান। সুকান্ত মজুমদারও কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা পেয়েছিলেন রাজ্য সভাপতি হওয়ার পরেই। সুকান্ত এখন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। ফলে নিরাপত্তা আরও বেড়েছে। এঁদের দু’জনের জন্যও রাজ্য সভাপতি থাকাকালীন দলকে আলাদা বাড়ি খুঁজতে হয়েছিল। কারণ, নিরাপত্তা বাহিনীর থাকার ব্যবস্থা করতেই বাড়ির অনেকটা জায়গা চলে যায়। দিলীপ পরে নিজের বাংলোয় স্থানান্তরিত হয়েছেন। কিন্তু সুকান্ত নিউটাউনে দলের দেওয়া বাড়িতেই এখনও থাকেন। ভোটের মুখে সব্যসাচীর পাড়ায় শমীকের আগমন ‘অহিনকুল’ সম্পর্ক আরও চড়া করবে, না কি পড়শিসুলভ সৌজন্যের নজির গড়বে, তা নিয়ে পাড়ায় কৌতূহল তৈরি হয়েছে।