মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ফাইল চিত্র।
ফাইল সই এবং নতুন ঘোষণা হচ্ছে একের পর এক। অন্য দিকে দেখা যাচ্ছে বুলডোজ়ারও। গড়ার তৎপরতা চলছে, চলছে ভাঙার কাজও। ভরসা দেওয়া হচ্ছে, পাশাপাশি দেখানো হচ্ছে ভয়ও।
রাজ্যে প্রথম বার বিজেপি সরকার আসার পরে তাদের নীতিগত অভিমুখ সংক্ষেপে এমনই। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে বিজেপির প্রথম মন্ত্রিসভা শপথ নিয়েছিল গত ৯ মে। যে কোনও নতুন সরকারের জন্যই প্রথম কয়েক মাস মধুচন্দ্রিমার সময় ধরা হয়। বিরোধীরাও এই সময়টায় বিরোধিতা করেন মেপে। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি এখনও এই পর্ব অতিক্রম করেনি। তবে দু’মাসের কাছাকাছি সময়ে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শিবিরের বড় অংশই বুঝে ফেলতে পারছে, এই সরকার কোন পথে এগোতে চায়।
সাধারণ ভাবে ভাগ করলে, বিজেপি সরকারের কাজের ধারা দু’রকম। প্রথমত, সাধারণের স্বার্থে কাজ। যার মধ্যে আছে দুর্নীতি দমনে কড়া ব্যবস্থা নেওয়া, পুরনো অপরাধ ও গুন্ডামি রুখতে কড়া আইন আনা, পুরনো অভিযোগের তদন্ত করে দ্রুত ধরপাকড়ের মতো পদক্ষেপ। এতে যেমন সাধারণ জনতার আস্থা অর্জনের চেষ্টা আছে, একই সঙ্গে শিল্প ও বণিক মহলকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় বার্তা দেওয়া হচ্ছে। তারই পাশাপাশি এক লপ্তে অনেকটা মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) মেটানো এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে বেতন বা ভাতা বাড়ানোর ঘোষণা করে কর্মী মহলকে নতুন সরকারের কাজে উৎসাহিত করার চেষ্টা হচ্ছে।
দ্বিতীয় ভাগে আছে বিজেপির নিজস্ব স্বার্থে কর্মসূচি। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বর্ণিত ‘হিন্দু হোমল্যান্ড’ হাতে আসার পরে তার জল-হাওয়া সে ভাবেই গড়ে নেওয়া এখন বিজেপির লক্ষ্য। তাদের ঘোষিত কর্মসূচি মেনেই অভিন্ন দেওয়ানি বিধি আসছে। এর পরে ‘লাভ জিহাদ’, ‘ল্যান্ড জিহাদ’ রুখতে আইনি বন্দোবস্ত আসবে এই তালিকায়। রাস্তার নাম বদল করে ‘মোগল-পাঠানে’র চিহ্ন মোছা হবে। ইতিহাস বইয়ে হাত পড়বে কি না, তা নিয়েও সংশয়ে আছেন অনেকে। মুখে সকলের সরকার বললেও নতুন সরকার যে হিন্দুদের প্রতি বেশিই সদয়, এই মাস দুয়েকেই তাতে কোনও সংশয় নেই। আইএসএফের বিধায়ক নওসাদ সিদ্দিকী যাকে অন্য দিক থেকে বলছেন, ‘‘এই সরকার মুসলিমদের টাইট দিয়ে রাখতে চায়!’’ নতুন সরকার আসার পরে ইদুজ্জোহা এবং মহরম উদ্যাপনের চেহারা দেখলেই বাংলার পরিবর্তিত পরিস্থিতি মালুম হয়।
বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বের মত, রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের অপশাসনের বিরুদ্ধে জনতার রায় এসেছে। বিশেষত, গত পাঁচ বছরে সাধারণ, বুনিয়াদি পরিষেবার কাজও ঠিকমতো হয়নি। ফলে, বিজেপির সরকার স্বাভাবিক কিছু কাজকর্ম করলেই মানুষের সমর্থন আপাতত পাওয়া যাবে। সেই লক্ষ্যেই রাজ্যে শিল্পের পরিবেশ ফেরানো এবং কর্মসংস্থান তৈরির দিকে বিশেষ নজর দিতে চাইছে শাসক শিবির। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের কথায়, ‘‘ইস্তাহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করা শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে শিল্প ফেরানো, কাজের ব্যবস্থা করতেই হবে। কয়েকটা বড় সংস্থা এখানে কাজ শুরু করলে সাধারণ ভাবে মানুষের বেতন কাঠামো বদলে যাবে। শহরে জমির ঊর্ধ্বসীমা তুলে দেওয়া, বন্ধ কারখানার জমি ব্যবহার-সহ নানা পথ খুঁজে এগোতে হবে। উন্নয়নের গন্তব্যে পশ্চিমবঙ্গকে নিয়ে যাওয়াই আমাদের সকলের লক্ষ্য।’’
এই লক্ষ্যে শিল্পে উৎসাহ দান (ইনসেনটিভ এবং জিসিসি) নীতি, নতুন জমি নীতি কয়েক মাসের মধ্যে তৈরি করতে চায় রাজ্য সরকার। বিনিয়োগের প্রস্তাব ঝাড়াই-বাছাইয়ের জন্য শিল্পমন্ত্রী ও সচিবদের নিয়ে গড়ে দেওয়া হয়েছে কমিটি। বিভিন্ন সরকারি দফতরে কাজের অডিট করিয়ে তহবিলের চুরি বন্ধ করে, সেই টাকা উন্নয়নের পরিকল্পনায় লাগানোর ভাবনাও রয়েছে সরকার। তবে এই গোটা প্রক্রিয়ার মধ্যেই মাথায় রাখতে হচ্ছে, তৃণমূল সরকারের ছেড়ে যাওয়া পর্যন্ত (২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের সংশোধিত বাজেট অনুযায়ী) রাজ্যে পুঞ্জীভূত ঋণের পরিমাণ প্রায় ৭.৬২ লক্ষ কোটি টাকা। চলতি অর্থবর্ষে ঋণের মোট পরিমাণ ৮.১৫ লক্ষ কোটি টাকা দাঁড়াতে পারে বলে ধরা হয়েছে। তবে এই রাজ্য সরকারের বড় স্বস্তির কারণ, কেন্দ্রে একই দলের সহযোগী সরকার থাকা। অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত যেমন ব্যাখ্যা দিয়েছেন, ‘‘এত দিন মনে হত, পশ্চিমবঙ্গ যেন ভারতের অংশ নয়! কেন্দ্রের টাকা যেন নিষিদ্ধ তহবিল! এই অল্প দিনে আমরা এমন কিছু কেন্দ্রীয় প্রকল্পের সন্ধান পেয়েছি, যার অস্তিত্বই জানা ছিল না। এখন যৌথ ভাবে, পরস্পরের সহায়তায় আমরা চলব।’’ তবে নতুন সরকারের লক্ষ্য যেমন অনেক এবং স্পষ্ট, তেমনই সেগুলো একই সঙ্গে এত দ্রুত রূপায়ণের চেষ্টার জেরে শেষ পর্যন্ত কোনও ফাঁক না থেকে যায়, সে চিন্তাও রয়েছে দলে।
রাজনৈতিক শিবিরের একাংশ অবশ্য মনে করছে, নতুন সরকারের কাছে বণিক এবং মধ্যবিত্ত মানুষই বেশি গুরুত্ব পাবে বলে প্রাথমিক ইঙ্গিত মিলছে। পথবিক্রেতা থেকে শুরু করে গরিব মানুষের উপরে উচ্ছেদ অভিযান সেই ধারণাকেই জোরালো করছে। সে ক্ষেত্রে প্রান্তিক মানুষের পাশে থেকে রাজনৈতিক পরিসর তৈরির সুযোগও থাকছে বাম-সহ বিরোধীদের।
সাধারণের স্বার্থ এবং বিজেপির স্বার্থের সংঘাতের আশঙ্কা অবশ্য দেখছেন না শাসক দলের রাজ্য সভাপতি। শমীকের মন্তব্য, ‘‘আমাদের কোনও গোপন কর্মসূচি নেই, লুকোছাপা নেই। আমরা কোনও বিভাজনও করছি না। বরং, রাজনৈতিক অস্পৃশ্যতার সংস্কৃতি তুলে দিতে চাইছি। বিরোধিতা অবশ্যই থাকবে, অস্পৃশ্যতা কেন!’’
শাসক শিবিরের অন্দরের ইঙ্গিত, আগামী পাঁচ নয়, তিন বছরের লক্ষ্যমাত্রা ধরে কাজে এগোতে চাইছে গেরুয়া সরকার। আর মুখ্যমন্ত্রী বলছেন, ‘‘যে কাজের জন্য মানুষ আমাদের নির্বাচিত করেছেন, তা-ই করছি। করে যাব।’’