— প্রতীকী চিত্র।
রাজ্যে অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণির (ওবিসি) জন্য সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এ বার পরিবর্তন আনতে চলেছে বিজেপি সরকার।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমলে ওবিসি সংরক্ষণকে ঘিরে বিতর্ক হয়েছিল বিস্তর। জাল শংসাপত্র বিলির অভিযোগের প্রেক্ষিতে কড়া নির্দেশ দিয়েছিল আদালত, ওবিসি-প্রশ্নে তৃণমূল সরকারের বিধিও বাতিল হয়েছিল। বিধানসভা ভোটের প্রচারে সেই বিতর্ককে হাতিয়ার করেছিল বিজেপি। সরব ছিলেন বিভিন্ন দলের সংখ্যালঘু নেতারাও। এ বার বিধানসভায় সংশোধনী বিল এনে তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের করে যাওয়া ওবিসি তালিকা বাতিল করতে চলেছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। বাড়ানো হচ্ছে অনগ্রসর শ্রেণি কমিশনের কাজের পরিধিও।
চলতি বাজেট অধিবেশনের প্রথম পর্বের শেষ দিনে, সোমবার ওবিসি সংক্রান্ত জোড়া বিল বিধানসভায় পেশ করার কথা অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষের। তার মধ্যে একটি বিল— ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (আদার দ্যান এসসি অ্যান্ড এসটি) (রিজ়ার্ভেশন অফ ভেকেন্সিস ইন সার্ভিসেস অ্যান্ড পোস্ট্স) (অ্যামেন্ডমেন্ট বিল), ২০২৬’, আনা হচ্ছে তৃণমূল জমানার ২০১২ সালের আইন সংশোধনের লক্ষ্যে। সেই সঙ্গেই পেশ হতে চলেছে ‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল কমিশন ফর ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল, ২০২৬’। এই কমিশনের বিষয়ে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে প্রণীত ১৯৯৩ সালের মূল আইন সংশোধন করা হচ্ছে এ বার।
কী থাকছে নতুন বিলে? ওবিসি সংরক্ষণের জন্য ‘ক্যাটিগরি এ’-র আওতায় ৬৫টি এবং ‘ক্যাটিগরি বি’-তে ৭৮টি জনগোষ্ঠীর তালিকা ছিল তৃণমূল আমলের আইনে। সেই তালিকা সংবলিত তফসিলটিই (শিডিউল ১) বাদ দিয়ে দেওয়া হচ্ছে নতুন বিলে। ওবিসি-র আওতায় হিন্দুদের নানা গোষ্ঠীকে বঞ্চিত করে মুসলিমদের কেন ‘বাড়তি সুবিধা’ দেওয়া হচ্ছে, সেই প্রশ্ন আগেই তুলেছিল বিজেপি। এ বার ওই তালিকার আইনি স্বীকৃতি বাতিলের পথে যাচ্ছে তাদের সরকার। আর তার পাশাপাশি, দ্বিতীয় আইনে সংশোধনী এনে ওবিসি তালিকায় কোনও গোষ্ঠীর নাম বেশি বা কম অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকলে তা নিয়ে নাগরিকদের আপত্তি জানানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে অনগ্রসর কমিশনে। নাগরিকের আবেদন বা আপত্তি যাচাই করে কমিশন যা মতামত দেবে, তা-ই সরকারের মানার কথা বলা রয়েছে সংশোধনী বিলে।
রাজ্যের এক আধিকারিকের মতে, ‘‘ওবিসি তালিকা এবং শংসাপত্র নিয়ে ভূরি ভূরি অভিযোগ ছিল। এক সময়ে ‘দুয়ারে সরকার’ শিবিরে গিয়ে আবেদনের ভিত্তিতে শংসাপত্র দিয়ে দেওয়া হত। এখন থেকে গোটা প্রক্রিয়া হবে অনগ্রসর শ্রেণি কল্যাণ কমিশন এবং রাজ্য সরকারের সমন্বয়ের ভিত্তিতে। নাগরিকদের মতামত বা আপত্তি-আর্জি বিবেচনা করবে কমিশন।’’
রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশনের রিপোর্ট সামনে আসার পরে রাজ্যে ওবিসি সংরক্ষণ চালু করেছিল বামফ্রন্ট সরকার। অনগ্রসরতার নিরিখে ‘ক্যাটিগরি এ’ এবং ‘ক্যাটিগরি বি’, এই দুই ভাগের জন্য যথাক্রমে ১০% ও ৭% সংরক্ষণ ধার্য করা হয়েছিল। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের মন্ত্রিসভার দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী যোগেশচন্দ্র বর্মণ ২০১০ সালে সেই মর্মে বিল পেশ করেছিলেন। রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরে তৃণমূলের সরকার ২০১২ সালে ওই আইন সংশোধন করেছিল। তখন তফসিল-১’এর মধ্যে ‘ক্যাটিগরি এ’ হিসেবে সংরক্ষণের জন্য ৬৫টি এবং ‘ক্যাটিগরি বি’-তে ৭৮টি জনগোষ্ঠীর তালিকা জুড়ে দেওয়া হয়। তফসিলি জাতি থেকে ধর্মান্তরিত খ্রিস্টানদেরও ‘ক্যাটিগরি বি’-র আওতায় রাখা হয়েছিল। বাম জমানার আইনে তফসিল-১’এ রাখা হয়েছিল সংরক্ষণের নীতির বাইরে কারা থাকবেন, তার তালিকা। আর তফসিল-২’এ ছিল বিভিন্ন পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সংরক্ষণ কী ভাবে কার্যকর হবে, তার নমুনা বোঝাতে ১০০টি শূন্য পদের ‘রস্টার’। তৃণমূল সরকার আইন সংশোধনের সময়ে বাম আমলের তফসিল-১ ও ২’কে যথাক্রমে তফসিল-২ ও ৩’এ নিয়ে গিয়েছিল। এ বার বিজেপি সরকারের বিলে বাম জমানার তফসিল-১ (অর্থাৎ তৃণমূল সরকারের আইনের তফসিল-২) ফের বহাল হচ্ছে তফসিল-১ হিসেবেই। আর তৃণমূল সরকারের করে যাওয়া সর্বশেষ আইনের তফসিল-১ ও ৩ তুলে দেওয়া হচ্ছে।
নতুন বিলে ২০১২ সালের আইন সংশোধন করতে চেয়ে বলা হয়েছে, অনগ্রসর কমিশনের সঙ্গে পরামর্শ করে রাজ্য সরকার ওবিসি-র জন্য সংরক্ষিত পদের শতাংশ হার ঠিক করবে। সময় অন্তর সংরক্ষণের অনুপাতে পদের শতাংশ বাড়ানো হতে পারে, তবে সার্বিক ভাবে ৫০%-এর বেশি হবে না। কমিশনের সঙ্গে আলোচনা করেই রাজ্য সরকার ওবিসি নাগরিকদের বিভিন্ন শ্রেণিতে (ক্যাটিগরি) ভাগ করতে পারবে তাদের অনগ্রসরতার নিরিখে। সেই মতো পদে সংরক্ষণ হবে এক একটা শ্রেণির জন্য।
অনগ্রসর শ্রেণি কমিশন সংক্রান্ত ১৯৯৩ সালের আইন সংশোধন করার বিলে বলা হয়েছে, ওবিসি তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য নাগরিকেরা আবেদন করতে পারবেন। কমিশন সুপারিশ করবে সরকারকে। কোনও অংশের অতি-অন্তর্ভুক্তি বা কম অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে অভিযোগ জানানো যাবে। এই ক্ষেত্রে কমিশনের সুপারিশই মানবে সরকার। কমিশনের সদস্যদের মেয়াদ তিন বছরই রাখা হচ্ছে। তবে সদস্য-সচিবের (যিনি রাজ্য সরকারে কর্মরত) মেয়াদ কত দিন থাকবে, সেই বিষয়ে রাজ্য সরকারই সিদ্ধান্ত নেবে।
ওবিসি সংক্রান্ত ২০১২ সালের আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে সরকারের তরফে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, সংশ্লিষ্ট আইনের ‘যথাযথ প্রয়োগে’র জন্য এই পদক্ষেপ। আর দ্বিতীয় বিলে সরকারের ব্যাখ্যা, কমিশনের কার্যকরী ভূমিকা পালনের জায়গা তৈরি করতেই আইনে সংশোধনী আনা হচ্ছে। তবে বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়, আইএসএফের নওসাদ সিদ্দিকী বা কংগ্রেসের মোতাব শেখ-সহ বিরোধীদের সকলেরই দাবি, এই ধরনের বিল খতিয়ে দেখে বিধানসভায় বিতর্কের আগে আরও সময় দেওয়া জরুরি।