অয়ন শীল। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
পুরসভার নিয়োগ পরীক্ষায় কোনও প্রার্থী ফাঁকা ওএমআর শিট (উত্তরপত্র) জমা দিয়ে এলে তা ভরে দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। নেপথ্যে ছিল, নিয়োগ দুর্নীতিকাণ্ডে অভিযুক্ত অয়ন শীলের সংস্থা এবিএস ইনফোজোন। ওএমআর শিট (উত্তরপত্র) জাল করে নম্বর কারচুপির ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিলেন অয়ন শীলই— চার্জশিটে এমনই দাবি সিবিআইয়ের। কোথায়, কী ভাবে ফাঁকা ওএমআর শিট (উত্তরপত্র) পূরণ করা হত, চার্জশিটে তা বিস্তারিত জানিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা। সেই ওএমআর পরে মুখবন্ধ খামে পুরসভাগুলিতে পাঠিয়ে দেওয়া হত বলেও দাবি করেছে সিবিআই।
প্রশ্নপত্র তৈরি থেকে ওএমআরের মূল্যায়ন-সহ একাধিক কাজের বরাত পেয়েছিল অয়নের সংস্থা। তবে পরীক্ষার পর ওএমআর শিটগুলি অভিযুক্ত সংস্থাকে আনুষ্ঠানিক ভাবে হস্তান্তরের কোনও প্রমাণ বা মূল্যায়নের পর পুরসভাগুলিতে ওএমআর শিট ফেরত দেওয়ারও কোনও প্রমাণ পায়নি সিবিআই। একই সঙ্গে ওএমআর শিট নষ্ট করার প্রমাণও পায়নি সিবিআই।
যদিও, সিবিআই তল্লাশি চালিয়ে বরাহনগর, হালিশহর, টিটাগড়, কামারহাটি, উত্তর দমদম, রানাঘাট, বীরনগর-সহ আটটি পুরসভার নিয়োগ পরীক্ষার প্রার্থীদের ওএমআর শিট (উত্তরপত্র) উদ্ধার করে। বাজেয়াপ্ত করা ওএমআর গুলি থেকে একাধিক অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে বলে দাবি সিবিআইয়ের। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার সূত্রে খবর, প্রার্থী যে কটি প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন, তার তুলনায় প্রাপ্ত নম্বর বেশি। বহু ওএমআর-এ প্রার্থীর স্বাক্ষর নেই। পরিদর্শকের স্বাক্ষর নেই বা স্বাক্ষর নকল করা হয়েছে।
কী ভাবে হত দুর্নীতি
তদন্তকারীদের সূত্রে জানা গিয়েছে, লিখিত পরীক্ষার পরে ওএমআর শিট এবিএস ইনফোজোনের দফতরে নিয়ে আসা হত। অয়নের নির্দেশে ‘তালিকা’ ধরে বিশেষ বিশেষ প্রার্থীদের ওএমআর আলাদা করা হত। এই প্রার্থিতালিকা তৈরির জন্য পেনসিলে লেখা ‘নোট’ ব্যবহার করা হত। যদি ওই বাছাই তালিকার মধ্যে নাম থাকা কোনও প্রার্থীর ওএমআর ফাঁকা থাকত, তা হলে ওই অফিসে তা পূরণ করে দেওয়া হত।
কিন্তু যদি পরীক্ষার্থী ভুল লিখে ওএমআর জমা করতেন, সে ক্ষেত্রে পুরো ওএমআরটাই বদলে দেওয়ার ব্যাবস্থা ছিল বলে চার্জশিটে দাবি সিবিআইয়ের।
সূত্রের খবর, ফাঁকা ওএমআরে উত্তর পূরণ করে দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল। এর পাশাপাশি পরীক্ষাস্থল, ক্রমিকসংখ্যা, প্রার্থীর জন্মতারিখ, পদ ইত্যাদি তথ্য সব সঠিক ভাবে পূরণ করা হত। অভিযুক্ত এবিএস ইনফোজেন সংস্থায় এই কাজ করার জন্য নির্দিষ্ট লোকও ছিলেন। মূলত চার জন কর্মচারীকে ওএমআর পূরণের কাজে লাগানো হয়েছিল বলে দাবি সিবিআইয়ের। তদন্তকারীদের সূত্রে জানা গিয়েছে, আরও এক কর্মচারী ডেটা এন্ট্রির কাজগুলি তদারকি করতেন। ওই কর্মীদের বয়ান নথিভুক্ত করেছে সিবিআই। তদন্তকারীদের দাবি, পুরসভার নিয়োগ পরীক্ষায় একাধিক ওএমআরে প্রার্থীদের হাতের লেখা একই রকম। তদন্ত চলাকালীন বাজেয়াপ্ত করা একাধিক নথি, এবিএস ইনফোজোনের কর্মীদের হাতের লেখার নমুনা ফরেন্সিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
শুধু লিখিত পরীক্ষাতেই নয়, ইন্টারভিউতেও ওই পরীক্ষার্থীদের বেশি নম্বর দেওয়া হত। এটাও তদন্তকারীরা লক্ষ করেছেন যে, অনেক ক্ষেত্রে ইন্টারভিউয়ে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যক পরীক্ষার্থীর কোটা পূরণের জন্য কিছু পরীক্ষার্থীকে ইচ্ছাকৃত ভাবে পাশ করিয়ে দেওয়া হত।
সিবিআই সূত্রে জানা গিয়েছে, অয়নের সংস্থা এবিএস ইনফোজেন রাজ্যের ২০টি পুরসভায় নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার বরাত পায়। তার মধ্যে ৩টি পুরসভায় কোনও নিয়োগ হয়নি বলে খবর। ১৭টি পুরসভায় অয়নের সংস্থার মাধ্যমে ২৬৪ জন কারিগরি ক্ষেত্রে (টেকনিক্যাল) এবং ১,৫৬৫ জন অন্য ক্ষেত্রের (নন টেকনিক্যাল) বিভিন্ন পদে নিয়োগ করে। ১৭টি পুরসভায় মোট ১,৮২৯ জনকে নিয়োগ করা হয়েছিল। সিবিআইয়ের দাবি, ওই পুরসভাগুলিতে বেশির ভাগ গ্রুপ-ডি পদেই নিয়োগ হয়েছিল। অয়নের সংস্থা কী ভাবে টেন্ডার পেয়েছিল তা-ও খতিয়ে দেখছে সিবিআই। সন্দেহ রয়েছে সেখানেও।
স্কুলে নিয়োগ দুর্নীতি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে অয়নকে প্রথম গ্রেফতার করেছিল ইডি। তাঁর সল্টলেকের অফিসে তল্লাশি চালাতে গিয়ে উদ্ধার করা হয় বেশ কিছু উত্তরপত্র বা ওএমআর শিট। সেখান থেকেই পুরসভার নিয়োগেও দুর্নীতির হদিস পান তদন্তকারীরা। অভিযোগ, পুরসভায় চাকরির নাম করে প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা তুলতেন অয়ন। পুরসভা নিয়োগ দুর্নীতিতে সিবিআইয়ের অয়ন শীলের বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে চার্জশিট দিয়েছে সিবিআই। বর্তমানে প্রেসিডেন্সি সংশোধনাগারে রয়েছেন অয়ন। আলিপুর আদালতে জামিনের আবেদনও করেছেন।