(বাঁ দিক থেকে) নরেন্দ্র মোদী, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।
ব্যবধান ১০ দিনের। গত ১৮ জানুয়ারি সিঙ্গুরে সভা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সেই সভার মঞ্চ বাঁধা হয়েছিল টাটা কারখানার ধূ-ধূ মাঠে। তার ঠিক ১০ দিনের মাথায় বুধবার সিঙ্গুর সফরে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যে সিঙ্গুর মমতার রাজনৈতিক উত্থানের অন্যতম ‘সোপান’। তবে মোদী এবং মমতার এই সফরকে ১০ দিনের ব্যবধানে না-দেখে বরং সিঙ্গুর রাজনীতির দু’দশকের আলোয় দেখতে চাইছেন অনেকে। কারণ, সিঙ্গুর রাজনীতির দু’দশক দেখলে স্পষ্ট আমূল বদলে গিয়েছে সব।
রাজ্য রাজনীতির প্রেক্ষাপট বদলালেও সিঙ্গুর কি বদলেছে? সে দিনের ‘ইচ্ছুক’ চাষি জাইরুল শেখ বলছেন, ‘‘কপাল যা পোড়ার সিঙ্গুরের পুড়েছে। এই এলাকাকে ঘিরে রাজনীতি হয়েছে। বাকি সব বদলে গেলেও সিঙ্গুরের কোনও বদল হয়নি।’’ আর সে দিন জমি দিতে ‘অনিচ্ছুক’ তথা মমতার আন্দোলনের সঙ্গী অমিয় দাসের কথায়, ‘‘সিপিএম অন্যায় করেছিল। মমতা তার প্রতিবাদ করেছিলেন। সে দিনের অবস্থান নিয়ে কোনও অনুতাপ নেই। তবে আমরা চেয়েছিলাম, তিন ফসলি জমি ছেড়ে শিল্প হোক। সেটা হয়নি। সেটা হলে অনেক কিছু হতে পারত।’’
২০০৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনের অব্যবহিত পরেই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য ঘোষণা করেছিলেন রাজ্যে টাটা গোষ্ঠীর বিনিয়োগের কথা। মহাকরণে বুদ্ধদেবের সঙ্গে এসে সাক্ষাৎ করেছিলেন অধুনাপ্রয়াত রতন টাটা। যে পর্বে সিঙ্গুরে ভারী শিল্প স্থাপনের সলতে পাকানো শুরু হয়েছিল, তখন রাজ্য বিধানসভায় বামেদের বিধায়ক সংখ্যা ছিল ২৩৫। প্রধান বিরোধী হলেও তৃণমূলের সংখ্যা ছিল ৩০। দু’দশক পরে ২০২৬ সালে সেই ছবি আমূল বদলে গিয়েছে।
নামমাত্র সংখ্যা নিয়ে তখন প্রধান বিরোধী তৃণমূল এখন রাজ্যের শাসক। সে দিনের ‘প্রতাপশালী’ বামেরা নির্বাচনী রাজনীতিতে লুপ্তপ্রায়। আর সিঙ্গুরের জমি আন্দোলনে মমতাকে ‘সংহতি’ জানানো বিজেপি-ই এখন তৃণমূলের প্রধান প্রতিপক্ষ। ২০০৬-২০২৬— গত দু’দশকে বদলে গিয়েছে রাজ্য রাজনীতির প্রেক্ষাপট। বদলে গিয়েছে সিঙ্গুর রাজনীতির ভাষ্যও।
‘টাটার মাঠে’ সভা করে ‘শিল্প এখানেই হবে’ জাতীয় কোনও ঘোষণা করেননি মোদী। যা আকাঙ্ক্ষার মধ্যে ছিল রাজ্য বিজেপির নেতাদের। সেই আকাঙ্ক্ষা গড়িয়েছিল দলের নিচুতলাতেও। যদিও অনেকের বক্তব্য, রাজ্যের বিজেপি নেতাদের এ হেন আকাঙ্ক্ষা পুরোটাই ছিল কল্পনাপ্রসূত। বাস্তবের সঙ্গে তার কোনও মিল নেই। আর বুধবার মমতা গিয়ে সিঙ্গুর থেকে বাংলার বাড়ি প্রকল্পে আরও ১৬ লক্ষ (মতান্তরে ২০ লক্ষ) মানুষকে টাকা দেওয়ার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করবেন। সেইসঙ্গে রাজনৈতিক সভাও করবেন। মোদী সভা করে রাজ্যে ‘মহা জঙ্গলরাজের’ অভিযোগ তুলেছিলেন। বলেছিলেন, এই পরিস্থিতির অবসান না-হলে রাজ্যে শিল্পায়নের অনুকূল পরিবেশ গড়ে তোলা যাবে না। তৃণমূলের প্রত্যাশা, মমতা ধরে ধরে মোদীর কথার জবাব দেবেন। প্রধানমন্ত্রীর সভার চেয়ে বাড়তি ভিড় প্রদর্শনেও তৎপরতা শুরু করেছে তৃণমূল।
এই দু’দশকে সিঙ্গুরে কার্যত গোকুলে বেড়ে উঠেছে বিজেপি। ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে সিঙ্গুর বিধানসভায় এগিয়ে ছিল পদ্মশিবির। যদিও ২০২১ সালে হরিপাল থেকে বেচারাম মান্নাকে সিঙ্গুরে সরিয়ে এনে সেই ক্ষতে প্রলেপ দিয়েছিলেন মমতা। সারা রাজ্যের মতো বামেরা সেখানে ক্রমশ প্রান্তিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। আরও একটা বিধানসভা ভোট যখন দোরগোড়ায়, তখন সেই সিঙ্গুরই আবার বিজেপি বনাম তৃণমূল, মোদী বনাম দিদি রাজনীতির অক্ষে আবর্তিত হচ্ছে।
জমি অধিগ্রহণ বিরোধী আন্দোলন মমতা শুরু করেছিলেন সিঙ্গুর থেকেই। প্রথম পর্বে কলকাতার মেট্রো চ্যানেলে ২৬ দিন আমরণ অনশন। তার পর দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে স্তব্ধ করে দিয়ে টানা ধর্না কর্মসূচি। সেই মঞ্চেই মমতাকে সংহতি জানাতে এসেছিলেন বিজেপি নেতা রাজনাথ সিংহ। কংগ্রেস তো বটেই, মমতা পাশে পেয়েছিলেন এসইউসি, পিডিএসের মতো বামদলগুলিকেও। যদিও এখনকার বিজেপি মানতে চাইছে না, সেই সময়ে তারা ‘মমতার পাশে’ ছিল। রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের ব্যাখ্যা, ‘‘আমরা জমি আন্দোলনের পাশে ছিলাম। মমতার পাশে নয়।’’ রাজ্যসভার সাংসদ শমীকের কথায়, ‘‘আমরা নীতিগত ভাবে বহুফসলি জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে। সিপিএম যে কায়দায় জমি নিয়েছিল তারও বিরোধী ছিলাম। তার মানে এই নয় যে, আমরা মমতার পাশে ছিলাম।’’ আবার তৃণমূল সাংসদ তথা আইনজীবী কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাল্টা বক্তব্য, ‘‘সিঙ্গুর আন্দোলনকে শুধু সিঙ্গুর বা পশ্চিমবঙ্গের নিরিখে দেখলে হবে না। সিঙ্গুর আন্দোলন টাটাদের বিরুদ্ধে ছিল না। এই আন্দোলনই ব্রিটিশ আমলের জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত দানবীয় আইনকে বদল করাতে বাধ্য করেছিল। এই আন্দোলনই এখন ভারতের কৃষক আন্দোলনের পথপ্রদর্শক। যে পথে কৃষকেরা বাধ্য করেছেন মোদী সরকারকে তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহার করাতে।’’ সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য তথা হুগলি জেলা সম্পাদক দেবব্রত ঘোষের বক্তব্য, ‘‘অন্তঃসারশূন্য রাজনীতির ফলে সিঙ্গুর, হুগলি জেলা কিছু পায়নি। পশ্চিমবঙ্গ হারিয়েছে সোনালি সম্ভাবনা।’’
দু’দশক আগে বুদ্ধদেব, নিরুপম সেন, শ্যামল চক্রবর্তীরা সিঙ্গুরে সভা করলেই তার পাল্টা সভা করতে যেতেন মমতা, মুকুল রায়, মদন মিত্রেরা। দু’দশক পরে প্রধানমন্ত্রী মোদীর পাল্টা সভা করতে সেই সিঙ্গুরে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা। ভোটের ঠিক আগে আবার শিরোনামে সিঙ্গুর। শিল্প বনাম কৃষি নয়। তৃণমূল বনাম বিজেপি। মোদী বনাম দিদি।