মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
শহরে এসে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দলের যে ‘চার্জশিট’ প্রকাশ করেছিলেন, তা নিয়ে প্রচার চালাচ্ছে বিজেপি। এই আবহে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও শাহের বিরুদ্ধেই চার্জশিট দেওয়া উচিত বলে পাল্টা মন্তব্য করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই সঙ্গে প্রশাসনিক রদবদল, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়ার (এসআইআর) তালিকা, রাজ্যকে কেন্দ্রীয় ‘বঞ্চনা’র মতো নানা চেনা বিষয়েও নির্বাচন কমিশন ও বিজেপিকে নিশানা করেছেন মমতা। পাশাপাশি, নিজেকে ভোটাধিকার রক্ষার ‘পাহারাদার’ হিসাবে তুলে ধরেছেন তিনি।
পশ্চিম মেদিনীপুরে নারায়ণগড়, ডেবরা এবং পূর্ব মেদিনীপুরের পাঁশকুড়ায় সোমবার নির্বাচনী সভা করেছেন মমতা। তাঁর বক্তব্য, “সবাইকে লাইনে দাঁড় করাবে আর নিজেরা লুটেপুটে খাবে। আবার বলছে, তৃণমূলের বিরুদ্ধে চার্জশিট! আমি বলি, প্রথম চার্জশিট মোদী আর শাহের বিরুদ্ধে হওয়া উচিত, যাঁরা দাঙ্গা করে ক্ষমতায় এসছেন।” এই সূত্রেই দেশের বেকারত্ব, পশ্চিমবঙ্গের বকেয়া ‘না-মেটানো’র মতো নানা অভিযোগ তুলে বিজেপির বিরুদ্ধে তৃণমূল যে চার্জশিট দিয়েছে, তা-ও স্মরণে রাখার কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী।
এর সঙ্গেই, ভোটের মুখে কমিশন রাজ্য প্রশাসনে যে রদবদল করছে, তাকেও নিশানা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, “হিন্দু-মুসলমানে ভাগাভাগি। আইপিএস, আইএএস, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ, সিভিল সার্ভিসে ভাগাভাগি। প্রশাসনেও ভাগাভাগি।” কমিশন নিযুক্ত পর্যবেক্ষকদের অনেককে নিয়েই ‘বিজেপি-ঘনিষ্ঠতা’র অভিযোগে ধারাবাহিক ভাবে সরব তৃণমূল। এই সূত্রেই মমতার বক্তব্য, “সবাইকে বাদ দিয়ে দেখছো শুধু বিজেপির কে আত্মীয় আছে, বিজেপির সেই রাজ্যে এমএলএ কে আছে, আরএসএস কে করে, তাদের নিয়ে এসে ভাবছো তৃণমূলকে জব্দ করবে। উল্টো প্রতিক্রিয়া হবে।”
কমিশনকে নিশানা করতে গিয়ে ভোটার তালিকার প্রসঙ্গও টেনেছেন মমতা। তিনি বলেছেন, “বলছে না কি, চারটে তালিকা বার করেছে। একটাও চোখে দেখিনি! এটা বিজেপির ভ্যানিশ ওয়াশিং মেশিনের গেম প্ল্যান। মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে পরে বলবে, ‘গেট আউট অ্যান্ড গেট লস্ট’!” ভোটাধিকার রক্ষায় তাঁর ‘লড়াই’, ট্রাইবুনালে দলীয় আইনি সহায়তার প্রসঙ্গ তুলে মমতার সংযোজন, “যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতিতে যে ৬০ লক্ষ আছেন, তার মধ্যে ৫০% যদি (তালিকায়) উঠে থাকে, তার কৃতিত্ব অবশ্যই আমার কোর্টে যাওয়ার জন্য! আমি গিয়েছিলাম। সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত লড়েছিলাম।” মুখ্যমন্ত্রীর আহ্বান, “মা-বোনেরা ভোটটা দিতে হবে। আমি আপনাদের পাহারাদার।”
এই প্রেক্ষিতে মমতার নির্বাচনী কেন্দ্র ভবানীপুরের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে সেখানকার বিজেপি প্রার্থী বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী নানা অতীত ভোটের পরিসংখ্যান দিয়ে পাল্টা সরব হয়েছেন। হলদিয়ায় বিরোধী নেতা বলেছেন, “এসআইআর-এর পরে ভোটের পাটিগণিতে ভবানীপুর আবার বিজেপির হয়ে গিয়েছে। চুরি, ছাপ্পা, মৃত ভোটারদের ঢুকিয়ে মমতা এত দিন জিততেন। এসআইআর-এর পরে ভবানীপুরে সেটা আর সম্ভব নয়।”
পাশাপাশি, বিজেপিকে ‘বকধার্মিক’ বলার সঙ্গেই বারাণসী ও দিল্লিতে ‘মন্দির ভাঙা’র অভিযোগ তুলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। এর সঙ্গেই ২০১৯-এর লোকসভা ভোটের মুখে শাহের রোড-শো থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি ভাঙার অভিযোগ, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে মোদীর ‘বঙ্কিমদা’ বলার মতো নানা বিতর্ক স্মরণ করিয়ে দিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে দলের ‘বাংলা-বিরোধী’ প্রচার-ভাষ্যেও শাণ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। সেই সূত্রেই তাঁর তোপ, “ওরা বাংলাকে বিক্রি করতে চায়। বাংলাকে বিসর্জন দিতে চায়।” তাঁর সংযোজন, “দিল্লির জঞ্জালদের, লাড্ডুদের জব্দ করতে হবে। নাম কেটেছে ওরা।”
মমতার বক্তব্য নিয়ে রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার পাল্টা বলেছেন, “উনি কী বললেন, তাতে কিছু যায় আসে না। হতাশা থেকে ভুল বকছেন। আর কেন্দ্রীয় বঞ্চনার কথা বলে মুখ্যমন্ত্রী আসলে রাজ্যবাসীকেই বঞ্চনা করে গিয়েছেন।”