Hinduism

আমিষ-নিরামিষ, গ্রহণ-বর্জনে ধুন্ধুমার ‘হিন্দুত্ব’র বিতর্কসভায়

তিনি আমিষভুক শাক্ত হিন্দু। প্রতিপক্ষ প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, কূটনীতিক মণিশঙ্কর আইয়ার নিরামিষভোজী আইয়ার গোষ্ঠীর। কিন্তু আজকাল হিন্দুত্বকে নস‍্যাৎ করতে অনেকে মা কালীকেও স্বেচ্ছাচারিতার প্রতীক ভাবে বলে আর এক প্রতিপক্ষ তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রকে ঠেস দিলেন স্বপন।

ঋজু বসু
শেষ আপডেট: ১২ জানুয়ারি ২০২৬ ০৯:২৯

— প্রতীকী চিত্র।

শুধু সাভারকর নন। অরবিন্দ থেকে অগ্নিযুগের বাঙালি বিপ্লবীরাও আদতে হিন্দুত্বের ধারক, বাহক বলে অস্ত্র শানিয়েছিলেন সুলেখক, প্রাক্তন সাংসদ স্বপন দাশগুপ্ত, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জে সাই দীপক এবং বিজেপি নেতা-সাংসদ সুধাংশু ত্রিবেদীরা মিলে। সেই সঙ্গে হিন্দুত্বকে অপমানই যুগধর্ম বলে আক্ষেপও করলেন স্বপন।

তিনি আমিষভুক শাক্ত হিন্দু। প্রতিপক্ষ প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, কূটনীতিক মণিশঙ্কর আইয়ার নিরামিষভোজী আইয়ার গোষ্ঠীর। কিন্তু আজকাল হিন্দুত্বকে নস‍্যাৎ করতে অনেকে মা কালীকেও স্বেচ্ছাচারিতার প্রতীক ভাবে বলে আর এক প্রতিপক্ষ তৃণমূল সাংসদ মহুয়া মৈত্রকে ঠেস দিলেন স্বপন। খুঁড়ে আনলেন, একদা একটি সিনেমার পোস্টারে মা কালীর সাজে একটি মেয়ের ধূমপানের ছবি নিয়ে মহুয়ার মন্তব্য প্রসঙ্গ। মহুয়া জবাব দিলেন, সুদে-আসলেই। গোরক্ষা বাহিনীর সুহৃদ শিবিরভুক্ত স্বপনকে তাঁর বিলেতের দিনগুলির গোমাংসপ্রীতি স্মরণ করালেন হালকা ভাবে। এবং বললেন, “ক‍্যালকাটা ক্লাবে বসে আমিষ খাওয়া নিয়ে বড়াই করলেও কাছে ময়দানেই চিকেন প‍্যাটিস খেলে আপনার হিন্দু ভাইরা পিটিয়ে ছাতু করে দিত।” রবিবার সন্ধ‍্যায় ক‍্যালকাটা ক্লাবের বাগানে ক‍্যালকাটা ডিবেটিং সার্কলের বিতর্ক সভা এ ভাবেই জমে উঠল। ‘হিন্দুত্বের থেকে সুরক্ষা চায় হিন্দু ধর্ম’ শীর্ষক বিতর্কে এক দিকে গান্ধী, বিবেকানন্দ তো অন‍্য দিকে সাভারকর কার্যত মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন।

উনিশ শতকে হিন্দুত্ব শব্দটা প্রথম লেখেন বাঙালি প্রাবন্ধিক ডেপুটি ম‍্যাজিস্ট্রেট চন্দ্রনাথ বসু। কিন্তু রাজনৈতিক হিন্দুত্বের ছবিটা সাভারকর ক্রমশ স্পষ্ট করেছেন, মানলেন বক্তারা। সঞ্চালক চিকিৎসক কুণাল সরকার সরস ভঙ্গিতে আবার মনে করালেন, সাভারকরপন্থীরা নিরামিষ খেলেও সাভারকর কিন্তু বিলেতে নিরামিষাশী গান্ধীকে চিংড়ি খেতে জোর করেন। মণিশঙ্করের কথায়, “হিন্দুত্ব হিন্দু ধর্মের বিকৃতি।” দীপকের মত, “হিন্দু ধর্মের বিপদ ধর্মনিরপেক্ষতায়।” সুধাংশুর ব‍্যাখ‍্যা, “মার খেয়ে হিন্দু ভাগলে সেকুলারদের সমস‍্যা নেই, হিন্দু জাগলেই সেটা হিন্দুত্ববাদী।”

মোমবাতি জ্বেলে বলতে ওঠেন বাংলার বিজেপি বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পাল। বাংলাদেশে, মুর্শিদাবাদে নিহতদের কথা মনে করিয়ে নিজেকে গর্বিত হিন্দু বললেন তিনি। সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ আশুতোষের প্রশ্ন, “গর্বিত ভারতীয় নন আপনি? আখলাক, পেহলু খানদের মৃত্যু ভুলে গেলেন।” ‘বন্দে মাতরম’ গানে দশ প্রহরণধারিণী-র অংশ বাদ না-দিলেই কি হিন্দুত্ববাদ, প্রশ্ন ছোড়েন সুধাংশুও।

সাভারকর বা অরবিন্দের উদ্ধৃতির সূত্র ধরে ইতিহাসবিদ তথা ইউটিউবে ইতিহাসের ভাষ‍্যকার রুচিকা শর্মা বললেন, “অরবিন্দ সনাতন ধর্মের কথা বললেও তা সর্বজনীন বোধ। হিন্দুত্ব বর্জনের কথা বলে। তা বর্ণবাদী। ভিন্‌ধর্মী, মেয়েরা তাতে ব্রাত্য।” আশুতোষও বললেন, “কাঠুয়ার ঘটনার ধর্ষকদের মুক্তিতে উল্লাসে অবাক হইনি। কারণ, ভিন্‌ধর্মী শত্রু শিবিরের মেয়েদের প্রতি শিবাজীর সম্ভ্রমেও অখুশি হন সাভারকর। সেটা লিখেওছিলেন।”

কয়েক জন স্কুলপড়ুয়া বক্তাদের পর পর প্রশ্ন করেছেন সভায়। তখন সুধাংশুর সঙ্গে মহুয়াদের তরজা চলল স্বাধীনতা সংগ্রামে আরএসএসের নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে। সভায় বিক্ষিপ্ত জয় শ্রীরাম ধ্বনি ওঠে। পরে সামগ্রিক বিতর্ক নিয়ে মন্তব‍্য করতে ওঠেন, সিঙ্গাপুরবাসী অর্থনীতিবিদ-লেখক প্রসেনজিৎ কে বসু এবং ইতিহাসবিদ মৃদুলা মুখোপাধ‍্যায়। হিন্দুত্ববাদী শব্দটি নেতিবাচক চোখে দেখতে চাননি প্রসেনজিৎ। কিন্তু মনীষীদের আত্মসাৎ করতে গেরুয়া-শিবিরের তৎপরতা নিয়ে মৃদুলা বলেন, “এ অনেকটা অন‍্যের ঠাকুরদাকে নিজের বলার মতো। তবে অরবিন্দ বা অন‍্য কেউ নন, ওঁরা শুধু সাভারকরের জন‍্যই ভারত-রত্নের তদ্বির করেছেন।” সুভাষচন্দ্রের বাংলায় তাঁর অনমনীয় ধর্মনিরপেক্ষতা নিয়ে বক্তারা কেউ না-বলায় আক্ষেপ করেন মৃদুলা। শীত-সন্ধ‍্যায় গরম বক্তৃতায় তেতে উঠলেও হাত তুলে সমর্থনে অমীমাংসিত থাকল এ বিতর্ক। সঞ্চালক বললেন, “হিন্দুত্ব নিয়ে তর্ক এখনই অবসানের লক্ষণ নেই।”

আরও পড়ুন