(উপরে) সাত বছর আগের লাউডন স্ট্রিটে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার আইপ্যাক কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় (নীচে)। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
দীর্ঘ দিন পর আবার ‘রণং দেহি’ অবতারে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বৃহস্পতিবার বেলা ১১টা ৫৯ মিনিট থেকে বিকেল ৪টে ২৩ মিনিট পর্যন্ত দফায় দফায় কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডির সঙ্গে সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হলেন তিনি। উপলক্ষ তৃণমূল ও রাজ্য সরকারের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়ি এবং সল্টলেকে আইপ্যাকের দফতরে ইডির হানা। দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা ২৪ মিনিট ধরে মুখ্যমন্ত্রী ইডির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সক্রিয় রইলেন। কখনও নথিপত্র বার করে আনলেন, কখনও সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও ইডিকে তুলোধনা করলেন। যার জল গড়াল হাই কোর্ট পর্যন্ত।
শেক্সপিয়র সরণি থানা থেকে ঢিলছোড়া দূরত্বে ৭, লাউডন স্ট্রিট। বৃহস্পতিবার ভোরে সেই ঠিকানায় প্রতীকের বাড়ি এবং তাঁর আইপ্যাক দফতরে পৃথক ভাবে হানা দেয় ইডি। বেআইনি কয়লা পাচার সংক্রান্ত একটি পুরনো মামলার সূত্রে এই তল্লাশি অভিযান বলে দাবি করা হয়। ইডির তল্লাশি চলাকালীনই কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মা যান প্রতীকের বাড়ি। তার কয়েক মিনিটের মধ্যে সেখানে পৌঁছোন মমতা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি বেরিয়েও আসেন। সঙ্গে একটি সবুজ রঙের ফাইল এবং ল্যাপটপ। সেখান থেকে তিনি সটান যান সল্টলেকের সেক্টর ফাইভে আইপ্যাকের দফতরে। সেখানে তখনও তল্লাশি চলছিল। তার মধ্যেই মমতা উঠে যান ওই বাড়ির ১২ তলায়। কিছু পরেই দেখা যায়, এক নিরাপত্তরক্ষী একাধিক ফাইল এবং নথিপত্র নিয়ে বেরিয়ে আসছেন। তিনি সেগুলি মুখ্যমন্ত্রীর গাড়িতে তুলে দেন। তার পরেও বিকেল পর্যন্ত মমতা সেখানেই ছিলেন। পরে আইপ্যাক দফতর থেকে বেরিয়ে মমতা যান আউট্রাম ঘাটে। সেখানে পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী গঙ্গাসাগর মেলার উদ্বোধন করেন। ইডির অভিযানকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে বিজেপিকে আক্রমণ করেছেন মমতা। তাঁর দাবি, তাঁর দলের ‘নির্বাচনী কৌশল’ অন্যায় ভাবে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর ‘সক্রিয়তার’ বিরুদ্ধে কলকাতা হাই কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইডি। পাল্টা তৃণমূলের তরফেও মামলা দায়ের করা হয়। দু’টি মামলারই শুনানি হওয়ার কথা শুক্রবার।
বৃহস্পতিবার ইডির হানা এবং কেন্দ্রীয় সংস্থার সঙ্গে মমতার সম্মুখসমর সাত বছর আগের একটি ঘটনার স্মৃতি ফিরিয়ে দিয়েছে। ২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি এই লাউডন স্ট্রিটেই হানা দিয়েছিল আর এক কেন্দ্রীয় সংস্থা সিবিআই। নিশানায় ছিল তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের সরকারি বাসভবন। সে বার যা হয়েছিল, এ বারও তা-ই হল। মুখ্যমন্ত্রী নিজে ঘটনাস্থলে পৌঁছে গেলেন। তাঁর রণং দেহি মূর্তি পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের দামামা আরও জোরে বাজিয়ে দিল।
২০১৯ সালে সারদা মামলায় তৎকালীন সিপি রাজীবকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাউডন স্ট্রিটে হানা দিয়েছিল সিবিআই। তাদের পুলিশ কমিশনারের সরকারি বাসভবনে ঢুকতে বাধা দেয় কলকাতা পুলিশ। মমতা নিজে লাউডন স্ট্রিটে গিয়ে সিপিকে নিয়ে চলে আসেন ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে। রাজীবের বাসভবনে কেন্দ্রীয় সংস্থার অভিযানকে রাজ্যের পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘চক্রান্ত’ বলে দাবি করেন মমতা। প্রতিবাদে সেই রাত থেকেই ধর্মতলায় ধর্না শুরু করেছিলেন তিনি। সেখানে যোগ দেন রাজ্য সরকারের অধিকাংশ পদস্থ আধিকারিক। ছিলেন রাজীব নিজেও। রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। শীর্ষ আদালত রাজীবকে ‘রক্ষাকবচ’ দেওয়ার পর ধর্না তোলেন মমতা। সেই ঘটনার কয়েক মাস পরে ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে রাজ্যে ধাক্কা খায় তৃণমূল। ৪২টির মধ্যে ১৮টি আসন ছিনিয়ে নিয়েছিল বিজেপি। ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারিও ঘটনার কেন্দ্রে সেই লাউডন স্ট্রিট এবং মমতার অভিযান। তবে এ বার মমতা প্রতিবাদে ধর্নায় বসেননি। বরং তাঁর দল তৃণমূল মামলা করেছে কলকাতা হাই কোর্টে। সেই মামলায় যুক্ত করা হয়েছে ইডি এবং আইপ্যাককে।
মমতার বিরুদ্ধে তদন্তের কাজে বাধা দেওয়ার অভিযোগ তুলেছে ইডি। তারা কলকাতা হাই কোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণও করেছে। কেন্দ্রীয় সংস্থার বক্তব্য, তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে কয়লা পাচার মামলায় এই তল্লাশি অভিযান চলেছে পশ্চিমবঙ্গ ও দিল্লির ১০টি জায়গায়। তার মধ্যে কলকাতার দু’টি জায়গায় তাদের কাজে বাধা দেওয়া হয়েছে। মমতার বিরুদ্ধে সাংবিধানিক পদের অপব্যবহারের অভিযোগ তুলেছে ইডি। নির্বাচন বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করা হয়েছে। শুক্রবার কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি শুভ্রা ঘোষের এজলাসে এই মামলার শুনানির সম্ভাবনা। আইপ্যাক দফতরে ইডির অভিযান নিয়ে পাল্টা কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে হাই কোর্টে মামলা করেছে তৃণমূল। সেই মামলাটিও শুক্রবার বিচারপতি ঘোষের এজলাসে উঠতে পারে।
আইপ্যাক দফতরে ইডির অভিযানের বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার দুপুর থেকেই রাস্তায় নেমে পড়েছে তৃণমূল। শুক্রবার পথে নামতে চলেছেন স্বয়ং মমতা। তিনি যখন আইপ্যাকের দফতরে, তখনই হাজরা মোড়ে দলবল নিয়ে প্রতিবাদে নেমে পড়েছিলেন স্থানীয় কাউন্সিলর বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়। তার পর দলের তরফে প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। বিকেল ৪টে থেকে প্রত্যেক ওয়ার্ডে প্রতিবাদী মিছিলের নির্দেশ দিয়েছিল তৃণমূল। সেই অনুযায়ী, দিকে দিকে তৃণমূল নেতাদের বিক্ষোভ মিছিলে দেখা যায়। শুক্রবার আইপ্যাক অভিযানের বিরুদ্ধে মমতা নেতৃত্বে মিছিল হবে যাদবপুরের ৮বি বাসস্ট্যান্ড থেকে হাজরা মোড় পর্যন্ত। দুপুর ২টো থেকে মিছিলে হাঁটবেন মুখ্যমন্ত্রী। দক্ষিণ কলকাতা জেলা তৃণমূলের সভাপতি রাসবিহারীর বিধায়ক দেবাশিস কুমার জানিয়েছেন, এইটবি থেকে যাদবপুর থানা হয়ে প্রিন্স আনোয়ার শাহ রোড ধরবে মিছিল। সেখান থেকে টালিগঞ্জ ফাঁড়ি হয়ে হাজরা মোড়ে পৌঁছোবেন মমতারা। তৃণমূলের একাধিক শীর্ষ নেতৃত্বকে মিছিলের প্রথম সারিতে দেখা যাবে শুক্রবার।
ইডির বিরুদ্ধে মমতার প্রধান অভিযোগ, রাজনৈতিক অভিসন্ধিতে তাঁর দলের নির্বাচনী কৌশল ‘চুরি’ করেছে কেন্দ্রীয় সংস্থা। তা অপরাধ। ইডির অভিযান চলাকালীনই সল্টলেকে আইপ্যাকের দফতর থেকে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মমতা বলেন, ‘‘ভোটের কাজ চলছে। ওরা স্ট্র্যাটেজি ছিনতাই করেছে। সব তথ্য ট্রান্সফার করেছে। দফতর থেকে সব কাগজ নেওয়ার চেষ্টা করেছে। সব টেবিল ফাঁকা। সেই নথি আবার তৈরি করার প্রয়োজন পড়লে অনেক সময় লাগত। তত দিনে ভোট পেরিয়ে যেত। এই কাজ কি ঠিক হল? আমি মনে করি এটা অপরাধ।’’ বিজেপিকে নিশানা করে এর পর তিনি বলেন, ‘‘বিজেপির মতো এত বড় ডাকাত দেখিনি।’’ ইডির উদ্দেশে মমতা বলেন, ‘‘আমরা নথিভুক্ত রাজনৈতিক দল। আমরা কর দিই। অডিট হয়। প্রয়োজন থাকলে ইডি আয়কর দফতর থেকে কাগজ নিতে পারত। বিজেপি সবচেয়ে বড় অপরাধী। চোরেদের দল। ওরা বিজেপি-কে নোটিস পাঠায় না। ভোট এলে আয়কর দফতর আমাদের নোটিস পাঠায়। আমাদের সঙ্গে চিটিং করলে, জুয়া খেললে মেনে নেব না। আমি যদি বিজেপির পার্টি অফিসে হানা দেওয়াই? সেটা ঠিক হবে?’’ সরাসরি কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহকেও আক্রমণ করেন মমতা। ইডি তাঁর মন্ত্রকের অধীনেই রয়েছে। মমতা বলেন, ‘‘কৌশল লুট করছে। ডেটা, ভোটার, বাংলা লুট করছে। ভাষা লুট করে। শূন্যতে আসবে (বিজেপি)। প্রধানমন্ত্রী, আপনার উচিত কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে নিয়ন্ত্রণ করা। ওরা আমাদের অর্থনৈতিক কাগজ, হার্ডডিস্ক, কৌশল চুরি করেছে।আমি সৌজন্য দেখাই। সহ্য করি। এটা দুর্বলতা নয়। সব লুট করলে, ছিনতাই করলে হজম করব না।’’
বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে বৃহস্পতিবার মালদহে ছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে জনসভাও করেছেন। পরিযায়ী শ্রমিকদের সুবিধা-অসুবিধার কথা শুনেছেন। কিন্তু আইপ্যাকের দফতর এবং প্রতীকের বাড়িতে ইডির হানা নিয়ে সেখানে একটি শব্দও খরচ করেননি তিনি। সকাল থেকে আইপ্যাক নিয়ে কলকাতায় মমতা যেমন সরব, জেলায় অভিষেক সেই নীতি নিলেন না। বরং মালদহের সভায় কংগ্রেসকে আক্রমণ করেছেন তিনি। মালদহ উত্তরের সাংসদ ঈশা খান চৌধুরীর নাম করে অভিষেক প্রশ্ন করেন, পরিযায়ী শ্রমিকদের জন্য কী কাজ করেছেন ঈশা? বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলিতে পশ্চিমবঙ্গের পরিযায়ী শ্রমিকদের হেনস্থার প্রসঙ্গ তোলেন অভিষেক। অভিযোগ, বাংলায় কথা বললেই ‘বাংলাদেশি’ তকমা দেওয়া হচ্ছে এবং এ রাজ্যের শ্রমিকদের আক্রমণ করা হচ্ছে। অভিষেকের দাবি, এই তালিকায় সম্প্রতি কংগ্রেসশাসিত তেলঙ্গানা, কর্নাটকও নাম লিখিয়েছে। সেখানও পশ্চিমবঙ্গের শ্রমিকেরা আক্রান্ত হচ্ছেন। উল্লেখ্য, সম্প্রতি তৃণমূল ছেড়ে কংগ্রেসে যোগ দিয়েছেন মালদহের গনি পরিবারের সদস্য মৌসম বেনজির নূর। তাঁর প্রসঙ্গও উত্থাপন করেননি অভিষেক। তবে নাম না-করে হুমায়ুন কবীরকে কটাক্ষ করেছেন।
আইপ্যাক কর্ণধার প্রতীকের বাড়িতে তল্লাশির ঘটনায় শেক্সপিয়র সরণি থানায় অভিযোগ দায়ের হয়েছে ইডির বিরুদ্ধে। লালবাজার আনুষ্ঠানিক ভাবে কিছু না বললেও কলকাতা পুলিশ সূত্রে খবর, স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ করেছে তারা। পুলিশ কেন অভিযোগ করল? সকালেই কেন্দ্রীয় বাহিনীর আধিকারিকদের নিয়ে ইডি লাউডন স্ট্রিটে পৌঁছে গিয়েছিল। সূত্রের দাবি, সাধারণত এই ধরনের অভিযানের সময়ে স্থানীয় পুলিশকে তা জানানো হয়। অভিযানের বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনও তথ্য না জানানো হলেও সাধারণ কিছু তথ্য জানানো হয়ে থাকে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে পুলিশকে কিছু না জানিয়েই ইডির অভিযান চলে লাউডন স্ট্রিটে। পরে পুলিশকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করলে তখনও তাঁদেরও বাধা দেওয়া হয়। সেই কারণে পুলিশের তরফে স্বতঃপ্রণোদিত পদক্ষেপ করা হয়েছে কেন্দ্রীয় সংস্থার বিরুদ্ধে।
বৃহস্পতিবার বিকেলের পর সল্টলেকের সেক্টর ফাইভে আইপ্যাক দফতর থেকে বেরোতে গিয়ে বিক্ষোভের মুখে পড়ে ইডি। তাদের গাড়ি ঘিরে বিক্ষোভ দেখানো হয়। তৃণমূলের কর্মী-সমর্থকেরা ইডির উদ্দেশে ‘গো ব্যাক’ এবং ‘বিজেপির দালাল’ বলে স্লোগান দেন। ওঠে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিও। তবে গাড়ি আটকানো হয়নি। বিক্ষোভ এবং স্লোগানের মধ্যেই কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তায় আইপ্যাক-এর দফতর ছেড়েছেন ইডির আধিকারিকেরা। সল্টলেকের এই দফতরে দুপুর থেকে দীর্ঘ ক্ষণ ছিলেন মমতা। প্রতীকের বাড়িতে ইডির তল্লাশি শেষ হওয়ার পরে তিনি সল্টলেকে আসেন। তার পরেই মুখ্যমন্ত্রী সেখান থেকে বেরোন। তবে মমতা বেরিয়ে গেলেও তৃণমূলের অন্য নেতা-কর্মীরা আইপ্যাক-এর দফতরের বাইরেই থেকে গিয়েছিলেন। আরও পরে তল্লাশি সম্পন্ন করে ইডি বেরোলে তাঁরা বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। ছিলেন দমকলমন্ত্রী সুজিত বসু, বিধাননগরের মেয়র কৃষ্ণা চক্রবর্তী এবং সব্যসাচী দত্ত।
বৃহস্পতিবার সল্টলেকের একটি হোটেলে বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নড্ডার নেতৃত্বে রাজ্য বিজেপির বৈঠক চলছিল। আচমকা সেখানে হাজির হন এক আইপিএস অফিসার। সুমিত কুমার নামের ওই অফিসার মমতার নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। রয়েছেন রাজ্য পুলিশের ডিআইজি (নিরাপত্তা) পদে। কেন হঠাৎ তিনি নড্ডার বৈঠকস্থলে এলেন? প্রশ্নের উত্তরে বলেন, ‘‘একজনকে খুঁজতে এসেছিলাম।’’ বলেই হোটেল থেকে বেরিয়ে যান সুমিত। তাঁর আগমন এবং প্রস্থান ছিল রহস্যে ঘেরা। সংক্ষিপ্ত উত্তর এ বিষয়ে কৌতূহল আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। শুরু হয়েছে নতুন জল্পনা।
ইডি-মমতার দ্বৈরথ নিয়ে খুব বেশি ‘উচ্ছ্বাস’ বা ‘হতাশা’ দেখাচ্ছে না বিজেপি। প্রথম থেকেই তাদের প্রতিক্রিয়া মাপা। প্রতীকের বাড়ি বা আইপ্যাক দফতর থেকে মুখ্যমন্ত্রী নানা নথি নিয়ে গিয়েছেন বলে তিনি নিজে দাবি করা সত্ত্বেও বিজেপি নেতৃত্ব অবিচলিত। তাঁদের ব্যাখ্যা, দলের মনোবল ধরে রাখতে মমতা ‘নথি সরানোর’ ছবি তৈরি করেছেন। গুরুত্বপূর্ণ কোনও নথি তিনি নিয়ে যেতে পারেননি। তেমন হলে প্রকাশ্যে মমতা সে কথা জানাতেন না। বিজেপিরই একাংশের বক্তব্য, তৃণমূল তথা রাজ্য সরকারেরর পরামর্শদাতা সংস্থার দফতরে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা হানা দিল আর মুখ্যমন্ত্রী কিছু করলেন না, এই বার্তা ছড়িয়ে গেলে মমতার ‘রাজনৈতিক ক্ষতি’ হত। রাজ্য জুড়ে তৃণমূল কর্মীদেরও মনোবল ভেঙে যেত। তাই মুখ্যমন্ত্রী অতি সক্রিয়তায় এমন একটা ভাষ্য তৈরি করেছেন, যেন ইডি ‘তেমন কিছু’ করতে পারেনি। দলের রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের কথায়, ‘‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর ভাবমূর্তির কফিনে নিজেই শেষ পেরেক পুঁতে দিলেন! তিনি যা করছেন, তাকে অনৈতিক না বলাই ভাল। এটা সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত এবং ফৌজদারি অপরাধ। সরকারি সংস্থার তদন্তের কাজে মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি বাধা দিয়েছেন। ইডির হাত থেকে মুখ্যমন্ত্রী ফাইল নিয়ে, হার্ড ডিস্ক নিয়ে বেরিয়ে গিয়েছেন। দুর্নীতিতে লিপ্ত থাকার কথা নিজেই প্রমাণ করে দিয়েছেন।’’
লাউডন স্ট্রিট ও সল্টলেকে ইডির অভিযান এবং মমতার রণং দেহি মূর্তি নিয়ে কিছুটা সাবধানি সিপিএম। মুখ্যমন্ত্রী সরকারি কাজে বাধা দিলেও ইডি কেন তাঁকে বাধা দিল না, প্রশ্ন তুলেছেন দলের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। তাঁর কথায়, ‘‘সরকারি কাজে মুখ্যমন্ত্রী বাধা দিলেন। ইডি তাঁকে বাধা দিল না। উনি গেলেন, ফাইল বার করে গাড়িতে তুললেন। সেই গাড়ি তৃণমূলের নামে নথিভুক্ত। কেন ইডি বাধা দিল না? মুখ্যমন্ত্রীর এই বেআইনি কাজের অংশীদার কলকাতার ও বিধাননগরের পুলিশ কমিশনার এবং রাজ্য পুলিশের ডিজি-ও।’’ কংগ্রেসের তরফে আবার আইনি প্রশ্ন তোলা হয়েছে। প্রাক্তন সাংসদ অধীর চৌধুরী বলেন, ‘‘আইপ্যাক চাইলে আইনি সহায়তা নিতে পারত। সেখানে মুখ্যমন্ত্রীর ‘ইন্টারেস্ট’ কী? রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হয়ে থাকলে আইনি পথে লড়াই না করে তিনি কেন নিজে এগিয়ে এসে বেআইনি কাজ করলেন?’’