আইপ্যাকের দফতর এবং ওই সংস্থার কর্ণধার প্রতীক জৈনের বাড়িতে হানা ইডির। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
রাজ্য সরকারের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের সল্টলেকের সেক্টর ফাইভের দফতরে বৃহস্পতিবার সকালে হানা দিল ইডি। দিল্লি থেকে ওই অভিযানের জন্য বিশেষ দল এসেছে বলে তদন্তকারী সংস্থা সূত্রের খবর। ইডি-র আধিকারিকেরা আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়িতেও গিয়েছেন। সেখানেও তল্লাশি চলছে। ইডি সূত্রের খবর, কয়লাপাচার কাণ্ডে দিল্লিতে নথিভুক্ত এক পুরনো মামলার জন্যই এই অভিযান। ওই মামলায় বেশকিছু লেনদেনের সূত্রে আইপ্যাকের নাম এসেছে বলে ইডি সূত্রের খবর।
একই মামলার সূত্রে ইডি-র অন্য একটি দল যায় বড়বাজারের পোস্তায় এক ব্যবসায়ীর বাড়িতে।
কেন্দ্রীয় বাহিনীকে সঙ্গে নিয়েই ইডি ওই অভিযান শুরু করেছে। আচমকা ওই অভিযানে আইপ্যাকের পুরো টিমই খানিকটা হতচকিত হয়ে পড়েছিল। ভোরে যখন অভিযান শুরু হয়, তখন স্বাভাবিক ভাবেই আইপ্যাকের দফতরে বিশেষ কেউ ছিলেন না। ছিলেন নাইট ডিউটিতে কর্মরত কয়েক জন। তাঁদের সামনেই অভিযান শুরু হয়। সেক্টর ফাইভের একটি বহুতলের ১২ তলায় আইপ্যাকের দফতর। ওই তলাটি ‘সিল’ করে দেয় কেন্দ্রীয় বাহিনী। ফলে ওই দফতরে ঢোকা বা বেরোনো আপাতত বন্ধ। বেলা গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সংস্থার পদস্থ আধিকারিকেরা যে যাঁর বাড়ি থেকে ‘জ়ুম কল’-এ নিজেদের মধ্যে বৈঠক করেছেন। বৈঠক করা হয়েছে জেলায় জেলায় থাকা আইপ্যাকের সদস্যদের সঙ্গেও।
রাজ্য সরকারের পরামর্শদাতা সংস্থার দফতরে এবং তার কর্ণধারের বাড়িতে ইডি-র অভিযানের খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে তৎপরতা বেড়েছে। জরুরি ভিত্তিতে বৃহস্পতিবার দুপুরে একটি সাংবাদিক বৈঠক ডেকেছেন সিপিএম রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। মনে করা হচ্ছে, ওই সাংবাদিক বৈঠক আইপ্যাকের দফতরে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার অভিযান সংক্রান্ত।
পাশাপাশি, রাজ্যের শাসক শিবিরেও জল্পনা এবং আলোচনা শুরু হয়েছে। আলোচনা শুরু হয়েছে রাজ্য প্রশাসনের অন্দরেও। আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক রাজ্য রাজনীতি এবং প্রশাসনে ‘প্রভাবশালী’ বলেই পরিচিত। একাধিক বার তিনি নবান্নে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের রূপায়ণের বিষয়ে শাসকদল এবং সরকারের মধ্যে সেতুবন্ধনও করে আইপ্যাক। এক দিকে যেমন প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকদের সঙ্গে আইপ্যাকের নিয়মিত যোগাযোগ, তেমনই শাসকদলের অন্যতম শীর্ষনেতা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর দফতরের সঙ্গেও আইপ্যাকের টিম নিবিড় সম্পর্ক এবং যোগাযোগের ভিত্তিতে কাজ করে। বস্তত, বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের প্রার্থী কারা হবেন বা কারা বাদ যাবেন, সে বিষয়েও আইপ্যাকের ভূমিকা যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। পুরো প্রক্রিয়ার সঙ্গেই তারা ওতপ্রোত ভাবে জড়িত।
অভিষেক আপাতত ভোটের প্রচারে রয়েছেন মালদহে। বৃহস্পতিবার মালদহে তাঁর বিস্তারিত কর্মসূচি রয়েছে। আইপ্যাকের দফতরে তল্লাশি অভিযান নিয়ে তিনি বা মমতা কিছু বলেন কি না, সে দিকেও নজর রাখছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহল। সাধারণত অভিষেক নির্বাচনী সফরে জেলায় জেলায় গেলেও রাতে কলকাতায় ফিরে আসেন। পরদিন তিনি আবার পরবর্তী গন্তব্যে যান। কিন্তু বুধবার রাতে তিনি কলকাতায় ফেরেননি। দুই দিনাজপুরে কর্মসূচির পরে থেকে গিয়েছেন মালদহে। আর বৃহস্পতিবার ভোরেই ইডি তাদের অভিযান শুরু করেছে।
আপাতদৃষ্টিতে আইপ্যাকের দফতর এবং প্রতীকের বাড়িতে অভিযান ‘দুর্নীতি’ সংক্রান্ত মামলার বিষয়ে হলেও এর ‘রাজনৈতিক তাৎপর্য’ অসীম। বস্তুতপক্ষে, এর রাজনৈতিক তাৎপর্যই আসল। বলা বাহুল্য যে, এই ঘটনায় রাজ্যের প্রধান বিরোধীদল বিজেপি নির্বাচনের আগে খানিকটা ‘অক্সিজেন’ পাবে। রাজ্য বিজেপির একটি অংশের ‘আক্ষেপ’ ছিল যে, কেন্দ্রীয় সরকার অনেক বাজনা বাজালেও তারা ‘কাজের কাজ’ কিছু করে না। অভিষেককে ১২ বার ইডি এবং সিবিআই তলব করলেও তাঁকে কেন গ্রেফতার করা হয়নি, সেই প্রশ্ন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের গত সপ্তাহের কলকাতা সফরের সময়েও উঠেছিল। ঘটনাচক্রে, শাহ দিল্লি ফিরে যাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যেই পুরনো একটি মামলার সূত্রে ইডি-র এই অভিযান।
ঘটনাচক্র এ-ও যে, বৃহস্পতিবারই কলকাতায় আসছেন বিজেপির সর্বভারতীয় সভাপতি জেপি নড্ডা। তাঁর সঙ্গে বিজেপির রাজ্য নেতাদের বৈঠক হওয়ার কথা।
আইপ্যাকের দফতর এবং প্রতীকের বাড়িতে ইডি-র অভিযান কত ক্ষণ বা কত ঘণ্টা চলে, তার উপর সতর্ক নজর রেখেছে শাসক এবং বিরোধী শিবির। পরিস্থিতি বুঝে যে যার প্রতিক্রিয়া জানাবে। কিন্তু ইডি-র এই অভিযান যে রাজনাীতির ময়দান আবার উত্তেজক করে দিয়েছে, তা নিয়ে কোনও শিবিরেরই সন্দেহ নেই।