Mamata Banerjee

এসআইআর-বিরোধী লড়াইয়ে ধর্মতলায় ধর্নার ‘ব্রহ্মাস্ত্র’ প্রয়োগ মমতার! মঞ্চে, জমায়েতে ফিরে এল সিঙ্গুর নিয়ে অনশনের কাল

এর আগে কোনও বারই ধর্মতলায় মমতার ধর্না এক দিনে শেষ হয়নি। শুক্রবার মমতা জানিয়ে দিয়েছেন, শনিবার ফের সকাল ১০টা থেকে কর্মসূচি শুরু হবে। এর আগের দু’বারও মমতা মঞ্চে পর্দা টাঙিয়ে রাত্রি কাটিয়েছিলেন মেট্রো চ্যানেলে। এ বারেও তার অন্যথা হল না।

Advertisement
আনন্দবাজার ডট কম সংবাদদাতা
শেষ আপডেট: ০৬ মার্চ ২০২৬ ২৩:১০
(বাঁ দিকে) সিঙ্গুর আন্দোলনের অনশন মঞ্চে ধর্মতলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এসআইআরের প্রতিবাদে ধর্মতলার ধর্নামঞ্চে মুখ্যমন্ত্রী (ডান দিকে)।

(বাঁ দিকে) সিঙ্গুর আন্দোলনের অনশন মঞ্চে ধর্মতলায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এসআইআরের প্রতিবাদে ধর্মতলার ধর্নামঞ্চে মুখ্যমন্ত্রী (ডান দিকে)। —নিজস্ব চিত্র।

প্রায়ই তিনি বলেন, ‘আন্দোলনেই আমার জন্ম।’ দীর্ঘ চার দশক ধরে পক্ষে বা বিপক্ষে দু’দিক থেকেই তাঁর আন্দোলনের নানা ধারা দেখেছেন পশ্চিমবঙ্গবাসী। সেই তিনি, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এসআইআর যুদ্ধে তাঁর আন্দোলনের ব্রহ্মাস্ত্রটি প্রয়োগ করে দিলেন। ব্রহ্মাস্ত্রের নাম ধর্না। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, ধর্মতলায় ধর্না।

Advertisement

দু’দশক আগে সিঙ্গুরের জমি আন্দোলনের সময়ে এই ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলেই ২৬ দিন অনশন করেছিলেন মমতা। শুক্রবার চলমান এসআইআর-পদ্ধতি বিরোধী আন্দোলনে সেই প্রসঙ্গ ফিরে এল মঞ্চে এবং জমায়েতেও। জয় গোস্বামী থেকে কবীর সুমনেরা সিঙ্গুর আন্দোলনের সময় থেকেই ছিলেন মমতার পাশে। শুক্রবারের মঞ্চেও হাজির ছিলেন কবি এবং সঙ্গীতকার-গায়ক। দু’জনের কথাতেই ফিরে ফিরে এল সিঙ্গুরের দিনগুলি।

উঠল সেই পর্ব থেকে আমৃত্যু মমতার সঙ্গে থাকা অধুনা প্রয়াত মহাশ্বেতা দেবী বা গায়ক প্রতুল মুখোপাধ্যায়ের নামও। আর জমায়েতে দু’দশকের ব্যবধানে দুই ধর্নায় সেতুবন্ধন করলেন সিঙ্গুর থেকে আসা বছর ৫৫-র দিগন্ত সাঁতরাও। যিনি তখন ছিলেন মধ্য-তিরিশের যুবক। তাঁর কথায়, ‘‘সে দিন জমির জন্য দিদির পাশে ছিলাম। আজ ভোটাধিকারের জন্য আছি। অনেকে দিদির হাত ছেড়েছে। আমি ছাড়িনি। ছাড়বও না।’’

শুক্রবার ধর্না শুরুর সময়ে মেট্রো চ্যানেলে ঠাসা জমায়েত থাকলেও, বিকাল ৫টার পর থেকে সেই ভিড় কিছুটা পাতলা হতে শুরু করে। তবে শুক্রবারের জমায়েতে তরুণ ও মহিলাদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।

পরিসংখ্যান বলছে, এর আগে দু’বার ধর্মতলায় ধর্না করেছিলেন মমতা। দু’বারই পৌঁছেছিলেন ইপ্সিত লক্ষ্যে। সিঙ্গুর আন্দোলনে তাঁর রাজনৈতিক এবং আইনি জয় সর্বজনবিদিত। পরবর্তীতে মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে ২০১৯ সালে তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের বাড়িতে সিবিআই হানার প্রতিবাদে ধর্নায় বসেছিলেন তিনি। সেই মামলাতে একটা সময়ের পর থেকে রাজীবকে সেই অর্থে কোনও ঝক্কি পোহাতে হয়নি। এ বার এসআইআর আন্দোলনে সেই ধর্মতলাতেই ধর্নার ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করলেন তৃণমূলনেত্রী। সিঙ্গুরের সময়ে মমতা যখন অনশন করেছিলেন, তখন তিনি ছিলেন পুরোদস্তুর বিরোধী নেত্রী। রাজীবের বেলায় মুখ্যমন্ত্রী তথা পুলিশমন্ত্রী হিসাবে বাহিনীর পাশে দাঁড়াতে ধর্নায় বসেছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিল ‘রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের’ আখ্যান তুলে ধরার কৌশলও।

এ বার মুখ্যমন্ত্রী হয়েও মমতা নিজেকে ‘বিরোধী নেত্রী’ হিসাবেই উপস্থাপিত করতে চাইছেন এবং তিনি সে চেষ্টায় সফল বলেই অনেকে মনে করছেন। তাঁর মূল নির্বাচনী প্রতিপক্ষ বিজেপির সঙ্গে তিনি জুড়ে নিয়েছেন নির্বাচন কমিশনকেও। আরও একটি মিল রয়েছে বাকি দু’টি ধর্নার সঙ্গে এ বারের ধর্নার। এর আগে কোনও বারই এক দিনে ধর্না শেষ হয়নি। শুক্রবার মমতা জানিয়ে দিয়েছেন, শনিবার ফের সকাল ১০টা থেকে কর্মসূচি শুরু হবে। এর আগের দু’বারও মমতা মঞ্চে পর্দা টাঙিয়ে রাত্রি কাটিয়েছিলেন মেট্রো চ্যানেলে। এ বারেও তার অন্যথা হল না।

কিন্তু কেন মমতাকে ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করতে হল? অনেকের মতে, ভোটারদের নাম কাটা, আসনওয়াড়ি হিসাব, সংখ্যালঘু ভোটের নানাবিধ সমীকরণ এমন ভাবে আবির্ভূত হয়েছে, তাতে তৃণমূলের উদ্বেগের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। যদিও ধর্নামঞ্চের প্রথম দিনের বক্তৃতায় তৃণমূলের সেনাপতি অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় ফের এক বার দাবি করেছেন, ‘‘এক বছর আগে যা বলেছিলাম, আজও তা-ই বলছি। এ বার তৃণমূলের ভোট এবং আসন দুই-ই বাড়বে। বিজেপি-কে ৫০-এর নীচে নামাতে হবে। যা দেখছি, তাতে ৪০-এর নীচে নেমে গেলেও অবাক হব না।’’

শুক্রবারের মঞ্চ থেকে শুরু করে মঞ্চের নীচের জমায়েত, দু’জায়গাতেই ছিল নানা রঙের উপস্থিতি। সভার বাঁধা সুর এসআইআর থেকে ক্ষণিক বিক্ষিপ্ত হয়েছিল কয়েক জন পার্শ্বশিক্ষকের তুলে ধরা প্ল্যকার্ডে। সেটুকু বাদ দিলে খোলা রাস্তায় সবটাই ছিল সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণে। ছিলেন তৃণমূলের রাজ্যসভাগামী মুখেরাও।

মেনকার মনে সংবিধান

বৃহস্পতিবার তৃণমূলের প্রার্থী হিসাবে রাজ্যসভা ভোটে মনোনয়ন জমা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের সংবিধান বিষয়ক আইনজীবী মেনকা গুরুস্বামী। ঘোষিত সমকামী হিসাবে তিনিই প্রথম দেশে সংসদের উচ্চকক্ষে যাচ্ছেন। মেনকা হাজির ছিলেন মঞ্চে। বক্তৃতায় বলেন, ‘‘আমার মনের মধ্যে রয়েছে সংবিধান। যে সংবিধান বলে ধর্ম-বর্ণ-লিঙ্গ নির্বিশেষে আমরা সকলে সমান। আর দুই, দেশের সব প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকের ভোটদানের অধিকার আছে। আজকে বাংলার ৬০ লক্ষ মানুষের নাম বিবেচনাধীন! আমরা এ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে লড়ব।’’ ‘জয় বাংলা, জয় সংবিধান’ বলে নিজের বক্তৃতা শেষ করেন মেনকা।

২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি রাজীব কুমার-সহ পুলিশকর্তাদের নিয়ে ধর্নায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি রাজীব কুমার-সহ পুলিশকর্তাদের নিয়ে ধর্নায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

রাজীবের বৃত্ত সম্পূর্ণ

মেনকার মতো প্রাক্তন পুলিশ কর্তা রাজীব কুমারও বৃহস্পতিবার তৃণমূলের হয়ে রাজ্যসভায় মনোনয়ন জমা দিয়েছেন। তবে ধর্মতলার ধর্নামঞ্চে একটি বৃত্ত সম্পূর্ণ করলেন তিনি। সাত বছর আগে তাঁর জন্য ধর্নায় বসেছিলেন মমতা। শুক্রবার মমতার জন্য ধর্নামঞ্চে আগাগোড়া থাকলেন রাজীব। সাত বছরের ব্যবধানের ভিন্ন পরিচয়ে ধর্মতলার ধর্নায় হাজির হলেন সদ্যপ্রাক্তন দুঁদে আইপিএস রাজীব।

নতুন স্লোগান অভিষেকের

বিজেপি-কে সামাজিক বয়কটের ডাক দিলেন অভিষেক। নতুন স্লোগানও বাঁধলেন— বয়কট বিজেপি। তাঁর কথায়, ‘‘আগের বার ভোটে কিছু সংগঠন স্লোগান তুলেছিল ‘নো ভোট টু বিজেপি’। এ বার বলতে হবে বয়কট বিজেপি। এদের সামাজিক ভাবে বয়কট করতে হবে। বুঝিয়ে দিতে হবে বাংলা এবং বাঙালির শক্তি।’’

কল্যাণের আঙুল-হুঁশিয়ারি

ধর্নামঞ্চে শুক্রবার তৃণমূলের প্রথম বক্তা ছিলেন শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানেই নেত্রী হিসাবে মমতার উচ্চতা তুলে ধরে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে হুঙ্কার দেন কল্যাণ। তৃণমূল সাংসদ বলেন, ‘‘একা, কেবল একা। কোনও ব্র্যান্ড নিয়ে নয়, কোনও ন্যাশনাল পার্টির ব্র্যান্ড নিয়ে নয়। কেবল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলে এত নেতা তৈরি হয়েছেন, এত কর্মী তৈরি হয়েছেন। সেই মানুষটা যখন চিফ ইলেকশন কমিশনারের কাছে গেল, আমি তো সে দিন ছিলাম, কী দুর্ব্যবহার মমতাদির সঙ্গে করেছেন, আপনারা কল্পনা করতে পারবেন না। আঙুল তুলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কথা বলছেন।” এই কথার রেশ টেনেই হুঁশিয়ারি দেন, “আরে আঙুল তুলে তুমি কাকে কথা বলছ? তুমি যদি চিফ ইলেকশন কমিশনার না-হতে, আঙুলটা তোমার কেটে বাদ দিয়ে আসতাম।”

মতুয়া জমায়েত

২০১৯ সাল থেকে উত্তর ২৪ পরগনা এবং নদিয়ার মতুয়া অধ্যুষিত এলাকা বিজেপির দখলে। শেষ লোকসভাতেও সেই ধারা অব্যাহত ছিল। এসআইআরের ফলে বহু মতুয়ার নামও বাদ গিয়েছে অথবা বিবেচনাধীন। শুক্রবারের জমায়েতে হাজির মতুয়াদের উদ্দেশে বিজেপি-কে হারানোর বার্তা দেন সাংসদ মহুয়া মৈত্র-সহ তৃণমূল নেতারা। বাদ্যযন্ত্র সহযোগেই জমায়েতে এসেছিলেন মতুয়া সমাজের লোকজন। ঢাক-ঢোলের আওয়াজ পেয়ে মঞ্চ থেকে মমতাই মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাসকে নির্দেশ দেন তাঁদের বসানোর বন্দোবস্ত করতে।

পার্শ্ব-বিক্ষোভ

ধর্মতলায় মমতার ধর্নামঞ্চে শুক্রবার বিক্ষোভ দেখালেন কয়েক জন পার্শ্বশিক্ষক। বেতন বৃদ্ধির দাবিতে হাতের প্ল্যাকার্ড তুলে ধরেন তাঁরা। মুখ্যমন্ত্রী মঞ্চ থেকে বলেন, ‘‘রাজনীতি করবেন না।’’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহের সামনে গিয়ে এ সব করার কথাও বলেন তিনি। বলেন, ‘‘শান্ত হয়ে থাকতে পারলে থাকবেন। রাজনীতি করবেন না। বিজেপির কথায় এ সব করবেন না। এই জায়গা খোলামেলা বলে ভাববেন না, যা কিছু করা যাবে। প্রধানমন্ত্রী মোদী আর শাহকে দেখান। ভ্যানিশ কুমারকে দেখান।’’ তার পরেই তিনি পুলিশের উদ্দেশে বলেন, ‘‘ওদের আস্তে আস্তে অন্য জায়গায় বসিয়ে দিন।’’ পুলিশ অবশ্য প্ল্যাকার্ডধারীদের সরিয়ে নিয়ে যায় সভাস্থল থেকে।

ধর্নামঞ্চে করমর্দন রাজীব কুমার এবং কুণাল ঘোষের।

ধর্নামঞ্চে করমর্দন রাজীব কুমার এবং কুণাল ঘোষের। ছবি: সংগৃহীত।

মেলালেন ‘স্যর’ মেলালেন

এসআইআর-কে অনেকেই ‘স্যর’ বলছেন। শুক্রবারের ধর্নামঞ্চে সেই ‘স্যর’ই মিলিয়ে দিলেন দু’জনকে। এক জন রাজ্য পুলিশের সদ্যপ্রাক্তন ডিজি রাজীব কুমার এবং অন্য জন তৃণমূল মুখপাত্র কুণাল ঘোষ। কুণাল রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ। রাজীব কুমার রাজ্যসভায় যেতে চলেছেন। সাংসদ থাকাকালীন কুণালকে গ্রেফতার করেছিলেন বিধাননগরের তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব। আবার রাজীবের বাড়িতে সিবিআই হানার পরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশেই মেঘালয়ের শিলং শহরে রাজীব এবং কুণালকে মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করেছিল সিবিআই। আপাতত সে সব অতীত। দু’জনেই তৃণমূলে। এক জন প্রাক্তন সাংসদ। অন্য জন হবু। দু’জনের দেখা হল। কথা হল কি?

Advertisement
আরও পড়ুন