Dilip Ghosh’s Resurrection

‘পরিণত’ দিলীপকে দেখে ‘লম্বা ইনিংস’-এর পূর্বাভাস বিজেপির অন্দরমহলে, ভিড় বাড়ছে ইকো পার্ক, বাসভবন, পার্টি অফিসে

শাহের বৈঠকে দিলীপকে আমন্ত্রণ জানান কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল। পোড়খাওয়া দিলীপের বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, এ বার সক্রিয়তায় ফেরার সময় এসে গিয়েছে। গত কয়েক বছরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন যে বিজেপি কর্মীরা, তাঁদের মধ্যেও উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে।

Advertisement
ঈশানদেব চট্টোপাধ্যায়
শেষ আপডেট: ০৩ জানুয়ারি ২০২৬ ১২:৩১
দিলীপ ঘোষকে বড় দায়িত্ব দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে দলের অন্দরে নানা তত্ত্ব।

দিলীপ ঘোষকে বড় দায়িত্ব দেওয়া হবে কি না, তা নিয়ে দলের অন্দরে নানা তত্ত্ব। —ফাইল চিত্র।

তিনি দলে থেকেও ছিলেন না। দলের দেওয়া গাড়ি এবং চালক সঙ্গে ছিল। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের দেওয়া নিরাপত্তাও বহাল ছিল। কিন্তু দলের কোনও কর্মসূচিতে তাঁকে ডাকা হচ্ছিল না। পশ্চিমবঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর জনসভাগুলিতেও তাঁকে দেখা যাচ্ছিল না। স্ব-উদ্যোগে ইতিউতি সভা, মিছিল, চা-চক্র করছিলেন। বিজেপির রাজ্য নেতৃত্বের তরফে বলা হচ্ছিল, ‘‘দিলীপ ঘোষ কেন্দ্রীয় নেতা, তাঁর বিষয়ে সিদ্ধান্ত কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব নেবেন।’’ দিলীপ নিজে বলছিলেন, ‘‘দলেই তো রয়েছি। কোথাও যাইনি তো।’’

Advertisement

কিন্তু দলে তাঁর ‘থাকা’ আর ‘পুরোদস্তুর সক্রিয় থাকা’র মধ্যে কতটা ফারাক, তা আবার স্পষ্ট হতে শুরু করেছে ৩১ ডিসেম্বর থেকে। কর্মী-সমর্থকদের উৎসাহের চোটে দিলীপের সুপরিসর বাসভবনেও এখন স্থানাভাব হওয়ার উপক্রম!

প্রশ্ন হল, দিলীপকে কি কোনও ‘বড় দায়িত্ব’ দেওয়া হবে? এখনই তা নিয়ে কেউ মন্তব্যে নারাজ। সন্দিগ্ধুরা বলছেন, তেমনকিছু নয়। তাঁকে শাহ ‘সক্রিয়’ করেছেন বিধানসভা ভোটে একজন জিততে সক্ষম প্রার্থী হিসাবে। তার বেশি কিছু নয়। আবার দলের একাংশের বক্তব্য, দিলীপকে সক্রিয় করা হয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর ‘একাধিপত্য’ খানিকটা কাটছাঁট করতে। বিজেপির অন্দরে ‘জনপ্রিয়’ নেতা বলতে দিলীপ এবং শুভেন্দু। তাঁরা দু’জনেই জনপ্রতিনিধিও বটে। দু’জনেই ভোটে জিতে নিজেদের প্রমাণ করেছেন। ফলে দু’জনের মধ্যে দলের অন্দরে একটা ‘টক্কর’ বরাবরই ছিল। যদিও বিজেপির একাংশ তাকে ‘স্বাস্থ্যকর প্রতিযোগিতা’ হিসাবে ব্যাখ্যা করতে চান। কিন্তু শুভেন্দুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক যে বরাবরই ‘মধুর’, তা দিলীপ তাঁর ঘনিষ্ঠমহলে বলতে কার্পণ্য করেননি। করেনও না।

‘আদি’ নেতা রীতেশ বা ‘নব‍্য’ তাপস-তমোঘ্ন, সকলের সঙ্গেই এখন স্বচ্ছন্দ দিলীপ।

‘আদি’ নেতা রীতেশ বা ‘নব‍্য’ তাপস-তমোঘ্ন, সকলের সঙ্গেই এখন স্বচ্ছন্দ দিলীপ। ছবি: সংগৃহীত।

ঘটনাচক্রে, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আমন্ত্রণে সস্ত্রীক দিলীপ দিঘার জগন্নাথ ধামে যাওয়ার পর শুভেন্দু প্রকাশ্যেই তাঁর সমালোচনা করেছিলেন। তার পর থেকে দলের অন্দরে দিলীপের ‘টিআরপি’ পড়তে শুরু করে। নিজের দলেই ‘ব্রাত্য’ হওয়ার পর থেকে দিলীপকে ঘিরেও ভিড় কমতে শুরু করে। ইকো পার্কের প্রাতর্ভ্রমণে ভিড় কমেছিল। নিউটাউন-স্থিত বাসভবনে লোকজনের আনাগোনা কমেছিল। দিনভর অজস্র ফোন আর হোয়াট্সঅ্যাপ বার্তার ঢলও থেমে গিয়েছিল। ব্যস্ততা কমে এসেছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের শেষ দিন দিলীপের জন্য পরিস্থিতির চাকা আবার ঘুরিয়ে দিয়ে গিয়েছে। চাকা এমন ঘুরেছে যে, বাড়িতে আর স্থান সঙ্কুলান হচ্ছে না। আপাতত দলের কোনও পদে না-থাকা সত্ত্বেও রোজ বেশ কয়েক ঘণ্টা করে দলীয় দফতরে বসে কর্মীদের সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ করতে হচ্ছে দিলীপকে।

গত ২৫ ডিসেম্বর কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগার প্রেক্ষাগৃহে রাজ্য বিজেপির ‘আদি’ নেতা-কর্মীদের যে সম্মেলন হয়েছিল, সেখানে আমন্ত্রণ পেয়েও দিলীপ যাননি। কারণ, সেখানে আমন্ত্রিত ৭০০-৮০০ সাধারণ প্রতিনিধিকে যে ভাবে দলীয় কল সেন্টারের মাধ্যমে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, দিলীপও সে ভাবেই ডাক পেয়েছিলেন। প্রথম সারিতে থাকা অন্য নেতারা যেমন ‘বিশেষ’ আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন, রাজ্য বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি তথা প্রাক্তন সর্বভারতীয় সহ-সভাপতি দিলীপ তেমন ভাবে ডাক পাননি। সে কারণেই যাননি বলে তাঁর ঘনিষ্ঠদের দাবি। কিন্তু শাহের বৈঠকে দিলীপকে আমন্ত্রণ জানান কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষক সুনীল বনসল। পোড়খাওয়া দিলীপের বুঝতে অসুবিধা হয়নি, এ বার সক্রিয়তায় ফেরার সময় এসে গিয়েছে। গত কয়েক বছরে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছিলেন যে বিজেপি কর্মীরা, তাঁদের মধ্যেও উদ্দীপনা তৈরি হয়ে গিয়েছে।

রাজ্য বিজেপির এক প্রাক্তন সহ-সভাপতির কথায়, ‘‘২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ বিজেপিতে কর্মীদের মধ্যে অভূতপূর্ব উদ্দীপনা ছিল। ২০২১ সালে যে প্রবল সন্ত্রাস শুরু হল, তাতে অনেক কর্মী বসে গিয়েছিলেন। দিলীপদাকে সভাপতি পদ থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরে তাঁরা আরওই হাল ছেড়ে দেন। তার পরে গত আট মাস ধরে যা ঘটছিল, তাতে ওই সব কর্মীর সঙ্গে দলের দূরত্ব আরও বাড়ে। দিলীপদার প্রত্যাবর্তনে দলের ওই অংশ আবার উজ্জীবিত।’’

ওই বিজেপি নেতার মতে, ‘‘শুভেন্দু অধিকারী বিজেপিতে আসার আগে পর্যন্ত দিলীপদা-ই তো আমাদের একমাত্র নেতা ছিলেন, যাঁর নাম শুনলেই ভিড় জমে। সেটা দলের কাছে সম্পদ। তাই দিলীপদার পরিস্থিতি দেখে শুধু কর্মী-সমর্থকরা নন, অনেক দক্ষ সংগঠকও মর্মাহত হয়েছিলেন। দিলীপ ঘোষের প্রত্যাবর্তন সেই সংগঠকদেরও সক্রিয় করে তুলবে।’’ দিলীপের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তাই কি শুভেন্দুর সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের সমীকরণ স্থির করেছিল? বিজেপি নেতারা আপাতত মন্তব্য এড়িয়ে যাচ্ছেন।

বস্তুত, দিলীপের ব্যাপারে মন্তব্য নিয়ে বিজেপি নেতারা আপাতত খুব সতর্ক। উচ্ছ্বাস দেখাতে গিয়ে বিতর্ক তৈরি করতে কেউ চান না। যেমন রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলছেন, ‘‘উনি এত দিন রূপরেখা তৈরি করছিলেন। এ বার পুরো মাঠ জুড়ে খেলবেন।’’ রীতেশ তিওয়ারি বলছেন, ‘‘দিলীপ ঘোষ কোথাও যাননি তো! প্রত্যাবর্তনের প্রশ্ন উঠছে কেন!’’ রাজু বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, ‘‘কোন অস্ত্র কোন সময়ে ব্যবহার করা হবে, সে সিদ্ধান্ত তো কমান্ডার নেবেন। মহাভারতে কি অর্জুন তাঁর হাতে থাকা সব ব্রহ্মাস্ত্র, মারণাস্ত্র একসঙ্গে ব্যবহার করেছিলেন? কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব জানেন যে, কখন কোন অস্ত্রকে সামনে আনতে হয়।’’ প্রসঙ্গত, শুভেন্দুর মুখে এখনও দিলীপ প্রসঙ্গে তেমন কোনও উষ্ণ মন্তব্য শোনা যায়নি।

কঠিন সময়েও যাঁরা ছায়াসঙ্গী ছিলেন, তাঁরা জানাচ্ছেন, বৃহস্পতিবার থেকে আচমকা বেড়ে গিয়েছে দিলীপের ব্যস্ততা। কনকনে শীতের ভোরেও ইকো পার্কের প্রাতর্ভ্রমণে ভিড় বেড়েছে। দিনভর ফোন বেজেই চলেছে। নিউটাউনের বাড়িতে গিয়ে দেখা করার আবদার বেড়েছে। গত কয়েক মাসে সাক্ষাৎপ্রার্থীদের বাড়িতেই ডাকছিলেন দিলীপ। কিন্তু গত দু’দিনে দেখা করার আবদার এত বেড়েছে যে, বিধাননগরের দলীয় কার্যালয়ে সকলকে আসতে বলছেন তিনি। সেখানে রাজ্য সভাপতির ঘরের কোনাকুনি উল্টো দিকের একটি ঘরে আপাতত তাঁর ব্যবস্থা হয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে বিজেপি কর্মীরা দেখা করতে আসছেন। পুষ্পস্তবক দিয়ে যাচ্ছেন।

অনেকে বলছেন এই দিলীপ আগের চেয়েও পরিণত। বৃহস্পতিবার রাতে উত্তর কলকাতায় দিলীপের অনুগামী হিসাবে পরিচিত এক বিজেপি কর্মীর বাড়িতে ধর্মীয় অনুষ্ঠান ছিল। রীতেশ, তাপস রায়, তমোঘ্ন ঘোষরা সেখানে গিয়েছিলেন। দিলীপ যখন পৌঁছোন, তাপস তখন বেরোনোর তোড়জোড় করছেন। দিলীপ তাঁকে আরও কিছুক্ষণ থাকতে অনুরোধ করেন। তাপস জানান, তিনি অনেক আগেই এসেছেন। ‘শুভেন্দু-ঘনিষ্ঠ’ হিসাবে পরিচিত তাপসের হাত ধরে দিলীপ বলেন, ‘‘অভিভাবকরা আগেই আসেন।’’ দিলীপের উষ্ণ অনুরোধে বসে পড়েন যান তাপস। তৈরি হয় ‘সুখী পরিবার’-এর ফোটো ফ্রেম। রাজ্য বিজেপিতে কেউ কেউ বলছেন, ‘‘এই দিলীপ আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত, লম্বা ইনিংস খেলবেন।’’

Advertisement
আরও পড়ুন