(বাঁ দিকে) মনিকা সরকার এবং তাঁর স্বামী দীপঙ্কর সরকার (ডান দিকে)। — ফাইল চিত্র।
সমাজমাধ্যমে আলাপ হয়েছিল দু’জনের। ২০২১ সালে। সেখান থেকেই দু’জনের প্রেম। তার পরে বিয়ে। কিন্তু সেই সম্পর্কেরই করুণ পরিণতি হল সন্দেহ এবং অবিশ্বাসের জেরে। রিষড়ার সরকার দম্পতির কন্যার এখন ঠাঁই হয়েছে দিদার বাড়িতে।
শুক্রবার রাতে হুগলির রিষড়ার ভাড়াবাড়িতে মনিকা সরকারকে খুন করে পালিয়ে যান তাঁর স্বামী দীপঙ্কর সরকার। পরে শনিবার দুপুরে বেলগাছিয়া স্টেশনে মেট্রোর লাইনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। স্ত্রীকে খুনের কথা নিজেই ‘ফাঁস’ করেছিলেন দীপঙ্কর। মনিকাকে হত্যার পর তিনি মেসেজ পাঠান শ্যালিকাকে। জানান, মনিকাকে খুনের কথা। দীপঙ্করের শ্যালিকা থাকেন মধ্যপ্রদেশে। তিনিই বাড়িতে ফোন করে জানান ঘটনার কথা।
দীপঙ্কর কর্মসূত্রে থাকতেন দিল্লিতে। মনিকা সেলাইয়ের কাজ করতেন স্থানীয় একটি কারখানায়। সূত্রের খবর, গত শুক্রবারই রিষড়ার বাড়িতে ফেরেন দীপঙ্কর। আর সেই রাতেই স্ত্রীকে খুন করেন তিনি। পুলিশের অনুমান, মনিকার বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক ছিল বলে সন্দেহ করতেন দীপঙ্কর। সেই থেকেই শুক্রবার দু’জনের মধ্যে বাগ্বিতণ্ডা হয়েছিল।
২০২১ সালে ফেসবুকে মনিকার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল দীপঙ্করের। ফেসবুকের সেই পরিচয় থেকেই দু’জনের প্রেম হয়। তার পরে বিয়ে করেন দু’জনে। শুরুতে দাম্পত্য জীবন ভালই কাটছিল তাঁদের। একটি মেয়েও হয় দম্পতির। এর পরে দীপঙ্কর কর্মসূত্রে দিল্লি চলে যান। মাঝে তাঁর বাবা-মা উভয়েই মারা যান। বছরে দু’বার করে রিষড়ার বাড়িতে আসতেন দীপঙ্কর। শুক্রবারও দুপুরে দিল্লি থেকেই ফিরেছিলেন বাড়িতে। বিকেলে শাশুড়িকে ফোনও করেন। তাঁদের বাড়িতে আসতে বলেন। মনিকার বাপেরবাড়িও রিষড়াতেই। জামাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে শুক্রবার সন্ধ্যায় তাঁদের বাড়িতে গিয়েছিলেন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা। কিন্তু বাড়িতে তখন তালা ঝুলছিল।
মনিকার বাবা মণীন্দ্র ওঝা জানান, বাড়িতে তালা দেখে তিনি মেয়েকে ফোন করেছিলেন। তখন মনিকা তাঁকে বলেছিলেন, তাঁরা একটি কাজে বাইরে বেরিয়েছেন। শনিবার সকালে বাবা-মাকে আসতে বলেন। কিন্তু মেয়ের সঙ্গে আর দেখা হয়নি তাঁর। শনিবার সকালে জামাইয়ের বাড়ি পৌঁছে দেখেন, রক্তাক্ত অবস্থায় বিছানায় পড়ে রয়েছেন মেয়ে।
মণীন্দ্র বলেন, “আমার দুই মেয়ে। বড় মেয়ে মনিকা। সকালে বড় জামাই মনিকাকে খুন করে আমার ছোট মেয়েকে ফেসবুকে মেসেজ করে জানায়, খুন করেছে। ছোট মেয়ে মধ্যপ্রদেশে থাকে। ও আমাদের ফোন করে দীপঙ্করের কীর্তির কথা জানায়। আমাদের বুক ফেটে যাচ্ছে। বিকেলে জানতে পারি জামাই মেট্রো রেলে আত্মঘাতী হয়েছে।” মনিকাকে কী কারণে খুন করা হল, তা এখনও বুঝে উঠতে পারছেন না তাঁর মা নমিতা ওঝা। তিনি বলেন, “আমি সে দিন সন্ধ্যায় গিয়ে ওদের দেখা পাইনি। আমার মেয়েকে এমন ভাবে খুন করা হবে, সেটা আমি ভাবতেও পারিনি। জানি না গোটা জীবনটা কী নিয়ে বাঁচব।”
শুক্রবার রাতে রিষড়ার তিন নম্বর নতুন গ্রাম এলাকায় ওই বাড়ডিতে ঠিক কী ঘটেছিল, তা জানতে ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ। চন্দননগর পুলিশের ডিসি অর্ণব বিশ্বাস জানিয়েছেন, প্রাথমিক ভাবে মনে হচ্ছে স্ত্রীকে খুনের পর শাড়ি দিয়ে নিজে ওই ঘরেই আত্মঘাতী হতে চেয়েছিলেন দীপঙ্কর। তবে তা করতে না-পেরে তিনি সেখান থেকে চলে যান। পরে শ্যালিকাকে জানিয়ে আত্মঘাতী হন।
প্রাথমিক ভাবে পুলিশের অনুমান, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক নিয়ে সন্দেহের বশে প্রথমে শ্বাস রোধ করে মনিকাকে খুন করেন দীপঙ্কর। তারপর মৃত্যু নিশ্চিত করতে গলা কেটে ফেলা হয়। তবে খুনের পিছনে অন্য কোনও কারণ আছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখছে পুলিশ।