গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।
কোনও দল সদ্য গঠিত হলে তার অভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান, কর্মসূচি এবং ইস্তাহার তৈরির প্রশ্ন আসে। যে নাটকীয় পরিস্থিতিতে আক্ষরিক অর্থে দু’দিনের মধ্যে অজানা এনসিপিআই-কে রাতারাতি কুড়ি সাংসদের বিজেপির সর্ববৃহৎ শরিক দলে পরিণত করা হল, তাতে এখনই স্বাভাবিক গঠনগত প্রক্রিয়া শেষ বা শুরু হওয়া সম্ভব নয়। এ কথা মেনে নিয়েও রাজনৈতিক শিবির বলছে, একই দলের মধ্যে দু’টি পৃথক মত তৈরি হচ্ছে। আসন্ন বাদল অধিবেশনের আগে তার মীমাংসা না হলে বিভ্রান্তি তৈরি হবে।
দলের একটি অংশ নিজেদের গা থেকে বিজেপি-র গন্ধ ‘মুছতে চাইছেন’ বলে ইঙ্গিত। সূত্রের খবর, বিশেষত তিন সাংসদ আবু তাহের, খলিলুর রহমান এবং ইউসুফ পাঠানের মনোভাব এমনই। সোমবার গভীর রাত পর্যন্ত খলিলুর এবং তাহের দিল্লিতে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেছেন সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। জানিয়েছেন, তাঁরা তিন সংখ্যালঘু সাংসদই এখন যথেষ্ট চাপে রয়েছেন। বিজেপি-র সঙ্গে একই বন্ধনীতে থাকলে নিজেদের রাজনীতি গোল্লায় যাবে তো বটেই, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় তাঁদের নিরাপত্তার প্রশ্নও এ ক্ষেত্রে জড়িত বলে মনে করেন তাঁরা। এ ব্যাপারে আবু তাহেররা সুদীপের মুখাপেক্ষী, যিনি ধর্মনিরপেক্ষ বলেই এতকাল নিজেকে তুলে ধরেছেন।
সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে দাবি করছেন, তিনি এই প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলেন না। শেষ মুহূর্তে সংলগ্ন হয়েছেন কিছু বিশেষ কারণে। শেষ সইটিও তাঁর। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আক্রমণ করা তাঁর বা নতুন দলটির উদ্দেশ্য নয় বলেও তাঁর দাবি। তাঁর কথায়, “আমার স্ত্রী নয়না বন্দ্যোপাধ্যায় কখনও কংগ্রেস করেননি। তিনি দিদিকে দেখেই তৃণমূলে এসে পাঁচ বার বিধায়ক হয়েছেন। তিনি তৃণমূলেই থাকবেন, আমি আপত্তি করিনি। আমি নিজে কখনও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নাম ধরে ডাকিনি, সর্বদাই নেত্রী বলি এবং লিখি।” এর পরেই সুদীপ বলেন, “আমি এখনই বলছি না যে নরেন্দ্র মোদীর নির্দেশিত পথই আমার পথ। ভবিষ্যতে কী হবে তা পরেই বলা যাবে।” তবে তিনি এবং এনসিপিআই-এর সব সাংসদই রাজ্যের ও নিজ নিজ এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সহযোগিতারকথা বলেছেন।
এখনও পর্যন্ত নব্য দলের নেতা হওয়ার সম্ভাবনা যাঁর সবচেয়ে বেশি, সেই কাকলি ঘোষ দস্তিদার অবশ্য কট্টর পথ নিয়ে চলছেন। তিনি স্পষ্ট জানাচ্ছেন, মোদী-শাহের পথই নতুন দলটির পথ। তাঁরা এনডিএ-র পাশেই রয়েছেন। আজও সংসদীয় স্থায়ী কমিটির (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক) বৈঠকের পরে বেরিয়ে এসে কাকলি সাংবাদিকদের বলেছেন, “আমাদের ব্লক সদ্য অন্য একটি দলের সঙ্গে মিশেছে। আমাদের একটু থিতু হতে দিন। আমরা সবাই একসঙ্গে এনডিএ-র হয়ে কাজ করব প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীজি এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহজির নেতৃত্বে। এই মিশে যাওয়ার বিষয়টি তাঁরা খেয়াল রেখেছেন।”
নতুন দলের আরও এক সক্রিয় সাংসদ শতাব্দী রায়ও স্পষ্টতই পুরনো সেতু পুড়িয়েই নতুন দলে যোগ দিয়েছেন। ঘনিষ্ঠ শিবিরে তিনি এই প্রসঙ্গে জানিয়েছেন, এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গেই তাঁদের গাঁটছড়া। এই নিয়ে বিভ্রান্তি বা ভুল বার্তা দেওয়া অর্থহীন।
জুন মালিয়া, মালা রায়, প্রসূন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো সাংসদরা সম্পূর্ণ মৌনব্রতে। দেব অধিকারী সই করে ফিরে গিয়েও মমতাপন্থীবার্তা দিয়েছেন।
তবে শেষ পর্বে সই সংক্রান্ত কাজে আজ দিল্লিতে আসাহুগলির তৃণমূল সাংসদ তথা অভিনেত্রী রচনা বন্দ্যোপাধ্যায় এক দিকে জানিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে ‘বিশ্বাসঘাতকতা’ করা হয়নি। অন্য দিকে তিনি দাবি করেছেন, গত ১৫ বছরে বাংলায় উন্নয়ন হয়নি। ডাবল ইঞ্জিন সরকারের আমলে কাজ ভাল হবে। সেই কারণেই তিনি দল বদলেছেন। রচনা বলেছেন, “গত ১৫ বছরে আমরা কাজ করতে পারিনি। বিভিন্ন ধরনের কাজে বাধা এসেছে। অথচ মানুষ কাজ করার জন্যই আমাদের নির্বাচিত করেছেন। শুভেন্দু অধিকারী ক্ষমতায় আসার পরই কাজ শুরু করেছেন। আমাদের সঙ্গে নিয়ে কাজ করছেন। এমন কাজের গতি আগে কখনও দেখিনি। সেজন্যশুভেন্দ অধিকারীর সঙ্গ দিয়েছি। কেবল অভিনেত্রী হিসেবে তো রাজনীতি করতে চাই না। দিদির ট্যাগ নিয়ে ঘোরার পক্ষে নই। কাজকরার পক্ষে।”