পরিমল ভট্টাচার্যের হাতে আনন্দ পুরস্কার তুলে দিচ্ছেন পার্থ ঘোষ। শনিবার। ছবি: স্বাতী চক্রবর্তী।
উনিশশো আটান্ন সালে সুরেশচন্দ্র-স্মৃতি পুরস্কার পেয়েছিলেন সমরেশ বসু। এবং প্রফুল্লকুমার-স্মৃতি পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়। সে-ই ছিল আজকের ‘আনন্দ পুরস্কার’-এর বীজভূমি। প্রথম পুরস্কৃত হয়েছিলেন এই দুই কথাসাহিত্যিক। আর তার প্রায় সত্তর বছর পর যাঁর হাতে তুলে দেওয়া হল এই পুরস্কার, তিনি তাঁর উপন্যাসের বীজভূমি রচনা করেছেন ভাটপাড়া সংলগ্ন কাঁঠালপাড়া, নৈহাটি, গঙ্গার ওপারের চুঁচুড়া, চন্দননগর অঞ্চল বুকের ভিতরে রেখে।
১৪৩২ বঙ্গাব্দের আনন্দ পুরস্কারে সম্মানিত সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা উপন্যাসের স্রষ্টা পরিমল ভট্টাচার্য বড় হয়েছেন সেই মাটিতেই যেখানে এক সময়ে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর মতো ব্যক্তিত্ব তাঁদের সৃষ্টিশীল জীবন কাটিয়েছেন, কিন্তু সেই অতীতচারণে নয়, স্রষ্টা নিজে আটকে পড়েছিলেন এক দিকে গোঁড়া ক্ষয়িষ্ণু ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি আর অন্য দিকে রুগ্ণ জরাগ্রস্ত চটকল-অধ্যুষিত অঞ্চলের মাঝখানে এবং দেখেছিলেন সেই সব স্থান স্বকীয়তায় প্রাণ পাচ্ছে এক প্রতিভাবান ভূমিসন্তানের কলমে। তিনি সমরেশ বসু।
সমরেশ বসু এমন এক মিথ যার ভিতরে বেঁচে ছিলেন আরও অনেক মানুষ, পুষ্ট হচ্ছিল সাধারণ মানুষের অমলিন স্মৃতি। অতীতের কুখ্যাত ওয়াগন ব্রেকার বৃদ্ধ বয়সে সেই মিথের ভিতর বেঁচে থাকতে-থাকতে মনে করিয়ে দেন, সমরেশ বসু তাঁকে নিয়েই লিখেছিলেন ‘আটাত্তর দিন পরে’ গল্প। নৈহাটি স্টেশনের রিকশাচালকও জানতেন, সমরেশ বসু তাঁর কথাই বলেছেন কোনও ‘কিতাব’-এ। কিংবা নৈহাটি বাজারের মাছওয়ালা তাঁর পাল্লা-বাটখারা দেখিয়ে বলতেন, আমার ওজনে কোনও ফাঁকি হতে পারে না, কারণ এই সব জিনিসপত্র সেই আমলের যে-সময়ে সমরেশ বসু এই বাজারে ডিম বিক্রি করতেন! পরিমল ভট্টাচার্য নিজেও দেখেছেন শেষ বিকেলের আলো গায়ে মেখে কী ভাবে ভিড় রাস্তা দিয়ে আনমনে হেঁটে যাচ্ছে সেই মিথ। প্যারিসের রাস্তায় এমনই এক ভিড়ে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে-কে দেখেছিলেন গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস এবং চিৎকার করে উঠেছিলেন ‘মায়েস্ত্রো’ বলে। সম্রাট শুনেছিলেন সেই ডাক, এবং জবাব দিয়েছিলেন— আদিওস আমিগো, বিদায় বন্ধু। সমরেশ বসুকে দেখে পরিমল ভট্টাচার্য নীরব ছিলেন, কিন্তু ভুলে গিয়েছিলেন তাঁর নিজের গন্তব্য এবং ফিরে এসেছিলেন সেই ক্রেপাসকিউল-ম্যাজিক গায়ে মেখে। সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা-র চিন্তাবিশ্ব কি তখনই দেখতে পেয়েছিল সেই গোধূলি-আলো?
আসলে এমন স্পেস-এর ভিতরেই ভেসে বেড়ায় অসংখ্য কাহিনি, অগণিত মানুষের সংলাপ। ফিকশন-নন ফিকশনের বেড়া মিলিয়ে যায় দার্জিলিঙের কুয়াশায়, পরিমল ভট্টাচার্যের মতো লেখক কেবল খননের কাজটি করে যান, যেমন বলেছিলেন শেমাস হিনি তাঁর কবিতায়, “বিটউইন মাই ফিঙ্গার অ্যান্ড মাই থাম/ দ্য স্কোয়াট পেন রেস্টস।/ আই উইল ডিগ উইথ ইট।” সেই কাজ থেকেই উঠে আসে প্রত্নস্মৃতি, লেখা হয় ডোডোপাখিদের গান, অপুর দেশ, ড্যাঞ্চিনামা কিংবা এই সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা। “আমি আমার সব লেখাতেই কিন্তু একটি স্থানের স্তরে-স্তরে কী ভাবে আকরিকের মতো কাহিনি বিছিয়ে থাকে, তার সন্ধান করে চলেছি,” আনন্দ পুরস্কারের মঞ্চে দাঁড়িয়ে বললেন পরিমল ভট্টাচার্য।‘হুগলি আর সরস্বতী নদীর মাঝে মাছের আকারে ভূমি, অতীতের বন্দরনগরী সাতগাঁ’— এই কাল্পনিক স্পেসটিকে কোনও ভাবেই ঔপনিবেশিক ইতিহাসচর্চার ধারা দিয়ে ধরা সম্ভব নয়; লেখক মনে করিয়ে দেন, “সাতগাঁকে খুঁজে নিতে হবে বাংলা ভাষার ভিতরে, আরবি-পর্তুগিজ়-তুর্কি-ওলন্দাজ শব্দের উৎপত্তির ভিতরে, আলকাতরা-আলপিন-পেরেকের মতো অকিঞ্চিৎকর নিত্য ব্যবহার্য বস্তুর ভিতরে, দুধ কাটিয়ে ছানা তৈরির প্রক্রিয়ার ভিতরে। এই অঞ্চলের নদীগুলো ক্রমাগত খাত বদলে-বদলে দইয়ের ঘোলের মতো জায়গাটাকে ওলটপালট করে দিয়েছে, তাই এখানকার ইতিহাসও সরলরৈখিক নয়। এমন এক স্থানের কাহিনির জন্য তাই প্রয়োজন প্রশস্ত এক ক্যানভাস, প্রয়োজন কথকতার মতো এক কাহিনি থেকে আর-একটিতে চুঁইয়ে-পড়া গল্প বলার ঢং।”
ন্যারেটিভের স্বাপ্নিক চলাচলের প্রায় কোনও কিছুই যে লেখকের মনগড়া নয়, সে-কথার উল্লেখ করে তিনি খুঁড়ে আনলেন স্মৃতি—“ছোটবেলায় দেখেছি আমার মা, জেঠিমা, পিসিমারা ভোরবেলা কোনও সুখস্বপ্ন দেখলে কাউকে না জানিয়ে বাড়ির পাশের গঙ্গায় ডুব দিয়ে নদীকে সেই স্বপ্নটা বলে আসতেন। আমার বইতেও চরিত্রদের জলে-জলে বার্তা বিনিময় করা, কিংবা রন্ধনপ্রণালী বিনিময় করার কথা এসেছে। এঁরা হচ্ছেন আমার মা জেঠিমা পিসিমাদের সইপাতানো গঙ্গাজল।” কাহিনির এই ‘মিথোস’ এখানে অতি গুরুত্বপূর্ণ এক উপাদান। এ এক আশ্চর্য অঞ্চল যেখানে বস্তুগত সংস্কৃতির সঙ্গে জড়িয়ে থাকে উদ্ভাবন। মেট্রোপলিটন বাঙালিয়ানার বাইরে যা এক অন্য রকম আত্মপরিচয়ের সন্ধান দেয়। এখানে বাস্তবের সঙ্গে অনায়াসে মিশে থাকে কল্পনা, আর পরিমল ভট্টাচার্য নিশ্চিত, “এখানে ফিকশন আর নন-ফিকশনের মাঝের দূরত্ব আট কিলোমিটার!” কারণ, কাঁঠালপাড়ায় সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাসভবন থেকে শ্যামনগরের রাহুতার দূরত্ব ছিল আট কিলোমিটার। রাহুতায় থাকতেন ত্রৈলোক্যনাথ মুখোপাধ্যায় এবং নিয়মিত আড্ডা দিতে আসতেন সঞ্জীবচন্দ্রের বাড়ি। “আমি অনুমান করি, সঞ্জীবচন্দ্রর কাছে পালামৌয়ের আদিবাসী রমণীর কথা শুনে আট কিলোমিটার দূরে রাহুতার বাড়িতে ফিরে ত্রৈলোক্যনাথ সেই রমণীদের একজনকেই কুমিরের পেটের ভিতর চালান করে দিয়েছিলেন, যেখানে সে ঝুড়ি পেতে বসে জমিদারগিন্নির এক-গা গয়না পরে বেগুন বিক্রি করছিল!” এমন কল্পনার বিস্তারেই লেখা হয়েছে ‘সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা’ উপন্যাস। বাংলা ভাষা ও কাহিনির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মৌলিক চেতনাধারা, তাদের বিশেষ পাঠকরা এই স্মার্টফোন-কবলিত সময়েও ঠিক বেঁচেবর্তে থাকবে—আশা রাখেন পরিমল ভট্টাচার্য। “আমি যেন তাঁদের প্রত্যাশাকে মর্যাদা দিতে পারি”।
স্রষ্টার কাছে আমাদের প্রত্যাশার শেষ নেই। তাই আনন্দ পুরস্কারের প্রধান অতিথি বিজ্ঞানী পার্থ ঘোষ মনে করিয়ে দেন, সাহিত্যে— উপন্যাস, নাটক, গল্প— আরও বেশি করে উঠে আসা উচিত বিজ্ঞানের কথা, বিজ্ঞানীদের কথা। তিনি মনে করিয়ে দিলেন, “বিজ্ঞান আমাদের বলে দেয় কী করলে ঠিক কী হবে, আর সাহিত্য, দর্শন আমাদের বলে, কী করা উচিত।” এই উচিত-অনুচিতের বিচার কোথা থেকে আসবে? পার্থ ঘোষ বললেন আইনস্টাইনের কথা— সমাজের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন অসামান্য কয়েকজন ব্যক্তির হাত ধরেই গড়ে উঠতে পারে সুস্থ সমাজ। সমাজে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির প্রভাব কী হতে পারে, তা কিন্তু দেখিয়ে দিতে পারে সাহিত্যই। তাই আজও মেরি শেলির লেখা ‘ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইন’ উপন্যাসের প্রাসঙ্গিকতা এতটুকু ক্ষুণ্ণ হয়নি। এই ধারা মেনেই মনে আসতে পারে এইচ জি ওয়েলস-এর দ্য টাইম মেশিন, অলডাস হাক্সলে-র ব্রেভ নিউ ওয়ার্ল্ড, ব্রেশট-এর নাটক ‘লাইফ অব গ্যালিলিয়ো’, আইজ়াক অ্যাসিমভ-এর ‘রোবট সিরিজ়’, মাইকেল ফ্রেন-এর নাটক ‘কোপেনহেগেন’ ইত্যাদি। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে? বিজ্ঞানধর্মী লেখার বড়ই অভাব, মনে করেন পার্থ ঘোষ। রক্তকরবী, মুক্তধারা বা বিশ্বপরিচয়-এর মতো রচনা আজ কোথায়? প্রধান অতিথি মনে করেন, বিজ্ঞানের অনেক বিষয়ই চলে আসতে পারে সাহিত্যের অনন্ত সম্ভাবনাময় স্পেস-এ। যেমন ব্ল্যাক হোল, ডারউইনিজ়ম, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, হাইজ়েনবার্গ-এর ‘আনসার্টেনটি প্রিন্সিপল’ প্রভৃতি। তাঁর মতে, বিজ্ঞানের সামাজিক মূল্যায়ন আরও বেশি করে সাহিত্যসৃষ্টিগুলিতে উঠে এলে মানবসমাজেরই মঙ্গল।
আসলে মননে বৈজ্ঞানিক স্বচ্ছতা না থাকলে সম্ভব নয় সাতগাঁর হাওয়াতাঁতিরা-র মতো একটি বইয়ের সৃজনও। আনন্দ পুরস্কার ১৪৩২ যেন সেই বার্তাই দিয়ে গেল আমাদের।