(বাঁ দিক থেকে) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। —ফাইল চিত্র।
দল ভেঙে গিয়েছে। ফিরহাদ হাকিম, মালা রায়ের মতো একদা অনুগত নেতারাও এখন বিমুখ। তার পরেও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যাঁরা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বৃহস্পতিবার ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। বিদ্রোহী নেতাদের মতো তাঁরও লক্ষ্য অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। কল্যাণের ভাষা বরাবরই চাঁছাছোলো । এ দিনও একই ভাষায় ও ভঙ্গিতে তৃণমূলের আইনজীবী সাংসদ বলেছেন, “ওর (অভিষেক) জন্য আমাদের চোর-চোর স্লোগান শুনতে হচ্ছে। ওর জন্য দলটা শেষ হয়েছে, তার পরেও ঔদ্ধত্য যায়নি।’’ হয় অভিষেক, না হয় তিনি—দলে কাকে চান, মমতাকে বেছে নিতে বলেছেন কল্যাণ।
বুধবার মাঝরাতে ছেলে শীর্ষণ্যকে যে ভাবে ফোন করে অভিষেকের দফতর থেকে বলে দেওয়া হয়েছে যে, বিধায়কদের সই-জাল মামলায় তাঁদের আর আইনজীবী হিসেবে দরকার নেই, তাতেই চটেছেন কল্যাণ। তার পরেই ক্ষোভের মুখ খুলে গিয়েছে। মুখ ফুটে না-বললেও এখনও মমতার বৃত্তে থেকে যাওয়া বেশির ভাগ নেতার মনের কথা এটাই। তৃণমূলের অন্দরে প্রশ্ন, মমতা কি ফের দলনেত্রী হয়ে উঠবেন, না কি পিসিই থেকে যাবেন?
এই প্রশ্নে একদা অভিষেক-ঘনিষ্ঠ এবং ভোটের পরেই বিদ্রোহী হয়ে ওঠা নিলম্বিত মুখপাত্র ঋজু দত্ত বলেন, ‘‘২০২১ সালের পর থেকেই মমতাদির উচিত ছিল অভিষেককে নিয়ন্ত্রণ করা। কিন্তু তিনি ধৃতরাষ্ট্রের মতো চোখে স্নেহের পট্টি বেঁধে ছিলেন। আজও তা-ই আছেন। কল্যাণদার মতো মানুষ যখন বলছেন, তখন মমতাদির বিবেচনা করা উচিত। কিন্তু করবেন না।’’
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত যা ছবি, তাতে ঋজুর কথাই ঠিক বলে মনে হচ্ছে। ভোটে বিপর্যয়ের পর থেকে প্রায় প্রতিদিনই কালীঘাটে মমতার বাড়িতে হাজিরা দিচ্ছিলেন তাঁর কাছের নেতারা। সেই তালিকায় কল্যাণ ছাড়াও আছেন কুণাল ঘোষ, চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য, শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু ক্ষুব্ধ কল্যাণ বৃহস্পতিবার আর কালীঘাটমুখো হননি। মমতাও তাঁকে ফোন করেননি। কল্যাণের দাবি, এ দিন সকাল সাড়ে ন’টা নাগাদ তিনি রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েনকে ফোন করে ঘটনার কথা জানিয়েছিলেন। বলেছিলেন, মমতাকে বিষয়টি জানাতে। কিন্তু ডেরেকও সারা দিনে তাঁকে আর ফোন করেননি। রাতে কল্যাণ বলেন, ‘‘আমি মমতাদির মুখ থেকে শুনতে চাই, তিনি কী চান? দিদি যদি শুধু অভিষেকের উপরেই নির্ভর করে থাকেন, তা হলে তাঁকে ছেড়ে যাওয়া ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।’’
কল্যাণের মতো চাঁছাছোলো ভাষায় না-হলেও স্পষ্ট কথা স্পষ্ট ভাবেই বলে দেন কুণাল। তৃণমূলের এই দুর্দিনেও গলা তুলে তিনি বলছেন, ‘‘মমতার ছবি নিয়ে প্রচার করেছি, তাঁর সঙ্গে বেইমানি করতে পারব না।’’ কিন্তু ভাইপোর প্রশ্নে তিনিও ‘সহনশীল’ নন। দল যদি একই ভুল বারবার করে, তা হলে তিনি মুখ খুলবেন, হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন কুণাল। দলের লোকসভার সাংসদদের বড় অংশের বিজেপি শিবিরে চলে যাওয়াটা তৃণমূলর সংসদীয় নেতৃত্বের ব্যর্থতা বলেও সমালোচনা করেছেন তিনি। অভিষেকই এখনও খাতায়কলমে লোকসভায় তৃণমূলের দলনেতা।
যদিও তাঁকে স্রেফ কর্মী করে দেওয়াই উচিত বলে মনে করছেন তৃণমূলের ছাত্রনেতা কোহিনূর মজুমদার। তাঁর কথায়, ‘‘অভিষেক থাকলে দল করা যায় না। মমতাদির উচিত সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক নামক গালভরা পদটা তুলে দিয়ে অভিষেককে কর্মী বানানো।’’
কিন্তু রক্তের সম্পর্কের ভাইপোর প্রতি এতটা ‘নিষ্ঠুর’ কি হতে পারবেন মমতা? উদ্ধব ঠাকরে থেকে সুপ্রিয়া সুলে—ইতিহাসের নজির সে কথা বলে না। রাজনৈতিক বিশ্লেষক শুভময় মৈত্রের ব্যাখ্যা, ‘‘পারিবারিক সম্পর্কের নিরিখে ক্ষমতা হস্তান্তর নতুন নয়। পরিবারকেন্দ্রিক দলে এটাই দস্তুর। যেমনটা কংগ্রেসের ক্ষেত্রে বিরাজ করছে রাহুল গান্ধীকে ঘিরে। ফলে মমতা চাইলেও হয়তো পারবেন না।’’
স্নেহ অতি বিষম বস্তু!