আরজি কর হাসপাতালে অব্যবস্থার অভিযোগ। —ফাইল চিত্র।
আরজি কর হাসপাতালের ট্রমা কেয়ারে ফের অব্যবস্থার অভিযোগ। চিকিৎসা করাতে এসে হাসপাতালের অব্যবস্থার কারণে এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছে পরিবার। অভিযোগ, শৌচালয়ে যাওয়ার জন্য স্ট্রেচারটুকুও মেলেনি। হাঁটতে গিয়ে অচৈতন্য হয়ে পড়েন বিশ্বজিৎ সামন্ত নামের ওই প্রৌঢ়। তার পরেই তাঁর মৃত্যু হয়।
পরিবারের সদস্যেরা জানিয়েছেন, শ্বাসকষ্টের সমস্যা নিয়ে আরজি করে চিকিৎসার জন্য এসেছিলেন বিশ্বজিৎ। তাঁর নাক থেকে রক্তও পড়ছিল। রাতে প্রাথমিক চিকিৎসায় রক্ত বন্ধ হয়। তিনি কিছুটা সুস্থ বোধ করেন। কিন্তু শৌচালয়ে যাওয়ার পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। অভিযোগ, হাসপাতালের যেখানে প্রৌঢ়ের চিকিৎসা চলছিল, সেখানে কাছাকাছি কোনও শৌচালয় ছিল না। কর্মীদের জিজ্ঞাসা করা হলে বাইরে বা দোতলায় নিয়ে যেতে বলা হয়। দোতলায় ওঠার জন্য স্ট্রেচারও দেওয়া হয়নি। অসুস্থ অবস্থায় হেঁটে হেঁটে দোতলার শৌচালয়ে যেতে গিয়েই প্রৌঢ়ের মৃত্যু হয়েছে, দাবি তাঁর পরিজনদের। এখনও পর্যন্ত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করেননি।
গত শুক্রবার ভোরে আরজি করের এই ট্রমা কেয়ার ভবনের লিফ্টে আটকে মৃত্যু হয়েছে দমদমের বাসিন্দা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের। সেখানেও বিতর্কের কেন্দ্রে ছিল শৌচালয়। তিন বছরের ছেলের চিকিৎসা করানোর জন্য আরজি করে গিয়েছিলেন অরূপ। শিশু শৌচালয়ে যেতে চেয়েছিল। হাতের কাছে শৌচালয় না-থাকায় লিফ্টে উঠতে হয় তাঁদের। অভিযোগ, যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সেই লিফ্ট চলে গিয়েছিল নিয়ন্ত্রণের বাইরে। বেসমেন্টে দীর্ঘ ক্ষণ আটকে থাকেন অরূপেরা। লিফ্টের দরজায় আটকে সিমেন্টের দেওয়ালের সঙ্গে ঘষটে মৃত্যু হয় অরূপের। হাসপাতালের অব্যবস্থা, রক্ষণাবেক্ষণ এবং নজরদারির অভাবকেই এই মৃত্যুর জন্য় দায়ী করা হয়েছে। তার দু’দিনের মধ্যেই ফের অব্য়বস্থায় মৃত্যুর অভিযোগ সেই আরজি করে।
মৃত বিশ্বজিতের স্ত্রী ইলা সামন্ত কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘‘রাতে নিয়ে এসেছিলাম। নাক দিয়ে রক্ত পড়ছিল। চিকিৎসার পর একটু সুস্থ হল। তার পর শৌচালয়ে যেতে চাইল। কিন্তু স্ট্রেচার দেয়নি কেউ। অসুস্থ মানুষ হেঁটে হেঁটে শৌচালয়ে যেতে গিয়ে এই পরিণতি হল। অসুস্থ মানুষকে কী করে বলে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে?’’ মৃতের পুত্র বিশাল সামন্ত বলেন, ‘‘এখানে কাছাকাছি কোনও শৌচালয় নেই। বাইরে থেকে করিয়ে নিয়ে আসতে বলেছিলেন ডাক্তার। কেউ স্ট্রেচার দেননি। শৌচালয়ের জন্য দোতলায় নিয়ে গিয়েছি। কষ্ট করে হেঁটে গিয়েছেন। হঠাৎ পড়ে গেলেন। ডাক্তার দেখে বললেন, উনি আর নেই! কাছাকাছি শৌচালয় থাকলে বা স্ট্রেচার পাওয়া গেলে হয়তো এটা হত না।’’ তাঁর আরও আক্ষেপ, ‘‘অনেক আশা নিয়ে আমরা হাসপাতালে আসি। আরজি করে আসি। কিন্তু এখানে তো সুস্থ মানুষও অসুস্থ হয়ে মারা যাচ্ছেন!’’ হাসপাতাল সূত্রে দাবি, ট্রমা কেয়ার সেন্টারে শৌচালয় রয়েছে। কেন তা সত্ত্বেও রোগীকে নিয়ে বাইরে যেতে বলা হয়? প্রশ্ন উঠছে। মৃতের দেহ আপাতত ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। আপাতত এই ঘটনায় অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করেছে টালা থানার পুলিশ।
আরজি কর হাসপাতালের ট্রমা কেয়ার ভবনে আরও শৌচালয় প্রয়োজন, মেনে নিয়েছেন সুপার সপ্তর্ষি চট্টোপাধ্যায়। তিনি জানিয়েছেন, আরও অন্তত দু’টি শৌচালয় করা যায় কি না, আলোচনা চলছে। হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্য তথা তৃণমূল বিধায়ক অতীন ঘোষ জানিয়েছেন, ট্রমা কেয়ারে শৌচালয় নেই, তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। তবে যা হয়েছে, তা কাম্য নয়। সোমবারই রোগী কল্যাণ সমিতির বৈঠক রয়েছে। সেখানে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে।
২০২৪ সালের অগস্টে এই আরজি করেই রাতের ডিউটিতে কর্তব্যরত মহিলা চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুন করা হয়। সে সময় হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। অভিযোগ, দেড় বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও আরজি কর আছে আরজি করেই! পরিকাঠামোর কোনও উন্নতি হয়নি। আরজি করের সেই নির্যাতিতা চিকিৎসকের মা আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির টিকিটে ভোটে দাঁড়ানোর ইচ্ছাপ্রকাশ করেছেন। তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক চলছে রাজনৈতিক মহলে।