আতঙ্ক: ভূমিকম্পের পরেই ভয়ে অফিসবাড়ি থেকে রাস্তায় নেমে এসেছেন অনেকে। শুক্রবার, গণেশ অ্যাভিনিউয়ে। ছবি: সুমন বল্লভ।
কার্যত চার পাশের এলাকাই ভূকম্পপ্রবণ। মাটির নীচে ছড়িয়ে রয়েছে চ্যুতি এলাকা ‘ইয়োসিন হিঞ্জ’। এ সব বিপদ নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে মহানগর কলকাতা। শুক্রবার দুপুরে বাংলাদেশের সাতক্ষীরায় হওয়া ভূকম্পের জেরে থরথর করে কেঁপে উঠেছে মহানগরী ও লাগোয়া এলাকা। ছড়িয়েছে আতঙ্কও। তার পরেই প্রশ্ন উঠেছে, ভূমিকম্পের হাত থেকে কতটা সুরক্ষিত কলকাতা?
খড়্গপুর আইআইটি-র ভূতত্ত্বের অধ্যাপক তথা বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য শঙ্করকুমার নাথের কথায়, ‘‘কলকাতা ভূকম্পের বিপদ মাথায় নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে। আশপাশে মাটির তলায় একাধিক চ্যুতি এলাকা। উত্তরে ভূকম্পপ্রবণ হিমালয়। দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর। সেখানেও ভূমিকম্প হয়।’’ প্রসঙ্গত, এ দিনও যে ভূমিকম্প হয়েছে, তার উৎপত্তিস্থল ইয়োসিন হিঞ্জ-এর আশপাশে।
বস্তুত, কেন্দ্রীয় ভূবিজ্ঞান মন্ত্রকের তৈরি সর্বশেষ ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকার মানচিত্র অনুযায়ী, পশ্চিমবঙ্গের শিয়রে ভূমিকম্পের বিপদ আছে। সেই মানচিত্রে কলকাতা ‘জ়োন-৪’-এ ঢুকেছে। অর্থাৎ, বিপদের আশঙ্কা বেশ প্রকট। এই পরিস্থিতিতে কলকাতার ভবিতব্য নিয়েও আশঙ্কার মেঘ দানা বাঁধছে।
অনেকেই অবশ্য বলছেন, ভূতাত্ত্বিক গড়ন বদলানো সম্ভব নয়। তাই প্রাকৃতিক বিপদ থেকে বাঁচার উপায় হল প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে সুরক্ষিত নির্মাণ তৈরি। প্রশ্ন ওঠে, সে দিকেও কি আদৌ নজর আছে? উল্লেখ্য, মহানগরে গগনচুম্বী অট্টালিকার সংখ্যা ক্রমশ বাড়ছে। কলকাতার উপকণ্ঠে রাজারহাট-নিউ টাউনেও একের পর এক বহুতল তৈরি হয়েছে।
শহরতলি এলাকাতেও নিত্যদিন গজিয়ে উঠছে বহুতল। তার মধ্যে কতগুলি ভূকম্প-রোধী প্রযুক্তি এবং ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড মেনে তৈরি হয়েছে?
নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত প্রযুক্তিবিদ এবং ব্যবসায়ীদের একাংশ বলছেন, বড় বড় নির্মাণ সংস্থার তৈরি বহুতলগুলি বিধি মেনেই হয়। কিন্তু তার বাইরে বিভিন্ন এলাকায় যে সব ফ্ল্যাট মাথা তোলে, তার কতগুলি যথাযথ বিধি মেনে তৈরি হয়, তা নিয়ে সংশয় আছে। অনেক ক্ষেত্রেই কাগজে-কলমে বা নকশায় যা দেখানো হয়, বাস্তবে তা হয় কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে। এই প্রসঙ্গেই অনেকে গার্ডেনরিচের বেআইনি বহুতল ভেঙে পড়ার কথা মনে করিয়ে দিচ্ছেন। অভিযোগ, খাস কলকাতার বিভিন্ন এলাকাতেই এমন বেআইনি নির্মাণ আছে। শহরতলি এলাকাগুলির তো কথাই নেই। কলকাতা ও হাওড়ার বেআইনি বহুতল ভাঙা নিয়ে কলকাতা হাই কোর্ট একাধিক বার কড়া নির্দেশ দিয়েছে। এই পরিস্থিতিতে ভূমিকম্প বিপদ বাড়াবে কিনা, সেই প্রশ্ন জোরালো হয়ে উঠেছে।
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের অধ্যাপক গুপীনাথ ভান্ডারি বলছেন, ‘‘এ দিনের কম্পনের মাত্রা আরও বেশি হলেই ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা ছিল। নিয়ম অনুযায়ী, যে বিধি মেনে বহুতল নির্মাণ হওয়া উচিত, কলকাতায় সব বাড়ি তা মেনে হয় কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। এ-ও নিয়ম যে, উচ্চতা যত বেশি হবে, সেই বাড়ির ভিতের পাইলিং তত গভীর করতে হবে।’’ এ ছাড়াও, খাস কলকাতায় পুরনো আমলেরও বহু জর্জরিত বাড়ি আছে। জোরালো কম্পন হলে সেগুলিও ভেঙে পড়তে পারে।
ভূূতত্ত্ববিদদের অনেকে বলছেন, বিপদের আশঙ্কা সব চেয়ে বেশি রাজারহাট-নিউ টাউন এলাকায়। ওই তল্লাটে জলাভূমি বুজিয়ে তার উপরে গগনচুম্বী অট্টালিকা হয়েছে। অধ্যাপক নাথের বক্তব্য, ‘‘যদি জোরালো কম্পন হয়, তা হলে বহুতলের তলায় থাকা জল, কাদামাটি গুলে গিয়ে ‘লিকুইডেশন এফেক্ট’ তৈরি করবে। তাতে বহুতল ভেঙে পড়তে পারে অথবা একটি বহুতল আর একটির উপরে হেলেও যেতে পারে।’’